আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম পার্সটুডের এক বিশেষ ও বিস্তারিত প্রতিবেদনে, ইরানের রাষ্ট্রীয় জাতীয় সম্প্রচার সংস্থার বরাতে এই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও স্পর্শকাতর খবরটি বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরা হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে গোটা মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে যে নজিরবিহীন সামরিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা বিরাজ করছে, ইরানের শীর্ষ পর্যায়ের নিরাপত্তা কর্মকর্তার এই দ্ব্যর্থহীন ও আক্রমণাত্মক ঘোষণা সেই অস্থিতিশীল পরিস্থিতিকে আরও বেশি জটিল ও গভীর উদ্বেগজনক করে তুলেছে বলে অভিমত প্রকাশ করছেন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও সমর বিশ্লেষকরা।
জাতীয় সম্প্রচার সংস্থার মাধ্যমে দেশবাসী ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্দেশে দেওয়া এক বিশেষ ও তাৎপর্যপূর্ণ বার্তায় মোহাম্মদ বাকের জোলকাদের চলমান সামরিক অভিযানের মূল লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও প্রকৃতি সম্পর্কে অত্যন্ত সুস্পষ্ট ইঙ্গিত প্রদান করেছেন।
অঞ্চলজুড়ে চলমান সংঘাত ও দৃশ্যমান ধ্বংসযজ্ঞের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে বর্তমানে যে ধোঁয়ার কুণ্ডলী বা বড় বড় স্তম্ভ দেখা যাচ্ছে, তার প্রতিটিই মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো না কোনো সামরিক ঘাঁটি, গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা স্থাপনা অথবা অত্যন্ত সংবেদনশীল আর্থিক কেন্দ্রকে সুনির্দিষ্টভাবে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে নির্ভুল আঘাত হানার অকাট্য প্রমাণ।
তাঁর এই প্রামাণ্য ও জোরালো বক্তব্যের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের কাছে এটা অত্যন্ত পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, ইরানের বর্তমান সামরিক কৌশল ও রণনীতি কেবল কোনো প্রথাগত বা গতানুগতিক প্রতিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
বরং এটি সরাসরি এই অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন আধিপত্য ও তাদের কৌশলগত স্বার্থের ওপর এক প্রকাশ্য, সুপরিকল্পিত এবং ধারাবাহিক আক্রমণ হিসেবে রূপ পরিগ্রহ করেছে। ইরানের এই অভাবনীয় ও কঠোর সামরিক পদক্ষেপের পেছনের গভীর আবেগ, দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদী চেতনার কথা সবিস্তারে উল্লেখ করতে গিয়ে জোলকাদের অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং বেদনাদায়ক কিছু প্রসঙ্গের অবতারণা করেন।
তিনি দেশবাসীর উদ্দেশে বলেন, ইরানি সশস্ত্র বাহিনী ও অকুতোভয় বীর যোদ্ধাদের এই নিরন্তর এবং সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুভিত্তিক মুহুর্মুহু গোলাবর্ষণ কোনো সাধারণ সামরিক মহড়া বা নিছক শক্তি প্রদর্শনের বিষয় নয়।
এটি মূলত বছরের পর বছর ধরে শোষিত, বিদ্রোহী ও স্বাধীনতাকামী ইরানি জাতির পুঞ্জীভূত ক্ষোভের এক ভয়ংকর ও তীক্ষ্ণ চাবুক, যা বর্তমানে বিশ্ব আধিপত্যবাদী ব্যবস্থা বা পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের পিঠে অত্যন্ত সজোরে নিপতিত হচ্ছে।
তিনি তাঁর বক্তব্যে অত্যন্ত আবেগঘন ও শোকাহত ভাষায় স্মরণ করেন মিনাব, লামার্দ এবং দেশের অন্যান্য স্থানে নির্মম ও বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া নিরীহ শিশু এবং সাধারণ নাগরিকদের কথা।
এই নিরপরাধ শিশুদের অকালে ঝরে যাওয়া রক্তের চূড়ান্ত ও দৃষ্টান্তমূলক প্রতিশোধ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ইরান কোনো ধরনের আপস, মধ্যস্থতা বা যুদ্ধবিরতির পথে কখনোই হাঁটবে না বলে তিনি বিশ্ব সম্প্রদায়কে খুব স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, কূটনীতি ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, তেহরানের শীর্ষ নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে আসা এই ধরনের অত্যন্ত কঠোর, আগ্রাসী ও আপসহীন বক্তব্য গোটা মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ ও ক্ষমতার ভারসাম্যকে এক নতুন এবং অত্যন্ত বিপজ্জনক খাদের কিনারায় এনে দাঁড় করিয়েছে।
দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে যে গভীর আস্থার সংকট, কূটনৈতিক বৈরিতা ও প্রক্সি বা ছায়াযুদ্ধ চলে আসছে, তা এখন যেকোনো মুহূর্তে এক সর্বাত্মক, প্রকাশ্য ও সরাসরি সামরিক সংঘাতে রূপ নেওয়ার প্রবল ও বাস্তব আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে মার্কিন সামরিক ও আর্থিক স্থাপনাগুলোকে সরাসরি নিজেদের লক্ষ্যবস্তু করার যে প্রকাশ্য ও সাহসী দাবি ইরান করেছে, তা আন্তর্জাতিক আইন এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এক অভূতপূর্ব ও বিশাল মাত্রার চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
এর প্রত্যক্ষ ফলশ্রুতিতে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে শুরু করে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য ভূখণ্ডে সামরিক উত্তেজনা ও যুদ্ধ পরিস্থিতির পারদ এখন স্মরণকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে অবস্থান করছে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যে, এই সংঘাত যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে তা বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যবস্থা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর এক ভয়ংকর ও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে, মিনাব ও লামার্দের মতো শান্তিপূর্ণ শহরগুলোতে সামরিক আগ্রাসনের ফলে বেসামরিক নাগরিক ও নিষ্পাপ শিশুদের মর্মান্তিক প্রাণহানির ঘটনা ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও সমাজজীবনে এক গভীর শোক, ট্রমা ও তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
এই অবর্ণনীয় মানবিক বিপর্যয়কে কেন্দ্র করে দেশের আপামর জনসাধারণ এখন নিজেদের জাতীয় মর্যাদা, অখণ্ডতা ও নিরাপত্তার প্রশ্নে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি সুদৃঢ় ও ঐক্যবদ্ধ। ইরানের সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বও জনগণের এই স্বতঃস্ফূর্ত আবেগ ও ন্যায়বিচারের দাবিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে নিজেদের ভবিষ্যৎ সামরিক ও পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ করছে।
এখন পুরো বিশ্বের দৃষ্টি নিবদ্ধ রয়েছে পরিস্থিতির পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। শত্রুর সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণের যে কঠিন ও প্রায় অসম্ভব শর্ত ইরান প্রকাশ্যে জুড়ে দিয়েছে, তার বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র রাষ্ট্রগুলো সামরিক, কৌশলগত বা কূটনৈতিকভাবে কী ধরনের পাল্টা পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তার ওপরই নির্ভর করছে এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ।
তবে আপাতত সংঘাত বা গোলাবর্ষণ থামার কোনো সুস্পষ্ট ও দৃশ্যমান লক্ষণ চোখে পড়ছে না, বরং আগামী দিনগুলোতে এই অঞ্চলে আরও বড় ধরনের ও ব্যাপক ধ্বংসাত্মক রক্তক্ষয়ী সংঘাতের আশঙ্কাই দিন দিন আরও প্রবল হচ্ছে।