বিশেষ করে ইরানি ড্রোনের সম্ভাব্য বহুমুখী হুমকি মোকাবিলায় সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার এবং কুয়েত যৌথভাবে ইউক্রেনের তৈরি অত্যাধুনিক ইন্টারসেপ্টর বা প্রতিরোধকারী ড্রোন কেনার ব্যাপক উদ্যোগ নিয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের একটি নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে পার্স টুডে জানিয়েছে যে, এই দেশগুলো সম্মিলিতভাবে সাত হাজারের বেশি ইউক্রেনীয় ইন্টারসেপ্টর ড্রোন নিজেদের সামরিক বহরে যুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এটি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর প্রচলিত পশ্চিমা অস্ত্রনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসার একটি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত।
বিশ্লেষণাত্মক ওই প্রতিবেদনে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কেবল সংযুক্ত আরব আমিরাতই ইউক্রেনের প্রখ্যাত সমরাস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টিএএফ ইন্ডাস্ট্রিজের কাছে পাঁচ হাজার ইন্টারসেপ্টর ড্রোন সরবরাহের আনুষ্ঠানিক আবেদন করেছে।
এর পাশাপাশি কাতার দুই হাজার ড্রোনের কার্যাদেশ প্রদান করেছে এবং আরেক উপসাগরীয় রাষ্ট্র কুয়েতও এই অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ক্রয়ের বিষয়ে তাদের গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেছে। সামরিক সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, সংযুক্ত আরব আমিরাত ইতোমধ্যেই ইউক্রেন থেকে ইন্টারসেপ্টর ড্রোনের প্রথম চালান সফলভাবে গ্রহণ করেছে।
এই যুগান্তকারী সামরিক চুক্তির বীজ বপন করা হয়েছিল চলতি বছরের মার্চের শেষের দিকে, যখন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এক ঐতিহাসিক সফরে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কাতার ভ্রমণ করেন। ওই উচ্চপর্যায়ের সফরের সময় ইউক্রেনের সঙ্গে এই তিন দেশের দশ বছর মেয়াদি একটি সুদূরপ্রসারী প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এই চুক্তির অধীনে কেবল তৈরি ড্রোন রপ্তানিই নয়, বরং ভবিষ্যতে এসব সমরাস্ত্রের যৌথ উৎপাদন এবং অত্যাধুনিক সামরিক প্রযুক্তি হস্তান্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
প্রতিরক্ষা চুক্তির সুনির্দিষ্ট শর্ত অনুযায়ী, সংযুক্ত আরব আমিরাত ইউক্রেনীয় সামরিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্কাইফল-এর তৈরি বিশেষায়িত ইন্টারসেপ্টর ড্রোন ব্যবহারের একচেটিয়া অধিকার লাভ করেছে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বিশেষ ড্রোনগুলো মূলত ইরানের তৈরি বহুল আলোচিত শাহেদ-১৩৬ ড্রোনকে আকাশেই নিখুঁতভাবে শনাক্ত ও ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে বিশেষভাবে নকশা করা হয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলোর এই নতুন সমরাস্ত্রের দিকে ঝুঁকে পড়ার পেছনে সবচেয়ে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে আকাশচুম্বী ব্যয়ের পার্থক্য।
সাম্প্রতিক সংঘাতগুলোতে দেখা গেছে যে, উপসাগরীয় দেশগুলোকে প্রায়শই তুলনামূলক অনেক কম দামের, কিন্তু অত্যন্ত ধ্বংসাত্মক শাহেদ-১৩৬ ড্রোনের ঝাঁকের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সমরাস্ত্র বাজারের হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি একটি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে আকাশে একটি সাধারণ ড্রোন ভূপাতিত করতে প্রায় চল্লিশ লাখ মার্কিন ডলার ব্যয় হয়।
এর বিপরীতে একটি ইউক্রেনীয় ইন্টারসেপ্টর ড্রোনের উৎপাদন ও ব্যবহারিক খরচ মাত্র দশ হাজার ডলারের কাছাকাছি। ব্যয়ের এই বিশাল আকাশ-পাতাল পার্থক্য উপসাগরীয় দেশগুলোকে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষার জন্য বিকল্প, সাশ্রয়ী ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের দিকে ধাবিত হতে প্রবলভাবে উৎসাহিত করেছে।
অর্থনৈতিক সুবিধার পাশাপাশি ইউক্রেনের প্রত্যক্ষ ও বাস্তব যুদ্ধের অভিজ্ঞতাও এই সামরিক চুক্তির একটি প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। গত চার বছর ধরে রাশিয়ার সঙ্গে চলমান তীব্র সামরিক সংঘাতে ইউক্রেনীয় বাহিনী ড্রোন হামলা প্রতিরোধ এবং আধুনিক ড্রোন-বিধ্বংসী প্রযুক্তি ব্যবহারে অভূতপূর্ব ও ব্যাপক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দাবি করেছেন যে, আধুনিক ড্রোন যুদ্ধের এই ময়দানে তাদের সামরিক অভিজ্ঞতার কোনো সমকক্ষ বর্তমানে বিশ্বে নেই। মিত্র দেশগুলোর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে ইউক্রেন ইতোমধ্যেই সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ পাঁচটি দেশে ড্রোন প্রতিরোধে পারদর্শী ২২৮ জন শীর্ষ সামরিক বিশেষজ্ঞ পাঠিয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, উপসাগরীয় দেশগুলো ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্রের প্যাট্রিয়ট এবং থাড-এর মতো অত্যন্ত ব্যয়বহুল আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর তাদের একচ্ছত্র নির্ভরতা কমিয়ে আনতে চাইছে। এর পরিবর্তে তারা নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতায় বৈচিত্র্য আনতে এবং বহুমুখী সামরিক কৌশল গ্রহণ করতে আগ্রহী হয়ে উঠেছে।
তবে সামরিক বিশেষজ্ঞরা সমরাস্ত্র পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বেশ কিছু বাস্তবসম্মত চ্যালেঞ্জের কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তাদের বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ অনুযায়ী, অত্যন্ত আধুনিক হলেও ইউক্রেনীয় ইন্টারসেপ্টর ড্রোনগুলোকে উপসাগরীয় দেশগুলোর বিদ্যমান প্রচলিত প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্কের সঙ্গে পুরোপুরি সমন্বয় করা খুব একটা সহজ কাজ হবে না।
এই প্রতিরোধকারী ড্রোনগুলোকে সর্বোচ্চ কার্যক্ষমতার সঙ্গে নিখুঁতভাবে পরিচালনা করার জন্য নিম্ন-উচ্চতার রাডার ব্যবস্থা, সংবেদনশীল শব্দ শনাক্তকারী সেন্সর এবং অত্যন্ত আধুনিক ইলেকট্রনিক নজরদারি ব্যবস্থার একটি সমন্বিত নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা একান্ত প্রয়োজন।
এছাড়া এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তি পরিচালনার জন্য দেশগুলোতে দক্ষ অপারেটরের চরম ঘাটতি রয়েছে এবং দীর্ঘমেয়াদি ও নিবিড় প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
সার্বিক পর্যালোচনায় বলা যায়, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ অন্যান্য উপসাগরীয় দেশের এই উদ্যোগ ওই অঞ্চলের সামগ্রিক প্রতিরক্ষা কৌশলে একটি বড় ধরনের কৌশলগত পরিবর্তনের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে।
তবে এর পাশাপাশি এ কথাও অনস্বীকার্য যে, ইরানও ধারাবাহিকভাবে তাদের সামরিক ড্রোন কৌশল এবং প্রযুক্তির নিরবচ্ছিন্ন উন্নয়ন ঘটিয়ে চলেছে। ফলে অস্ত্র প্রতিযোগিতার এই নতুন সমীকরণ ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য প্রতিনিয়ত নিত্যনতুন ও জটিল চ্যালেঞ্জ তৈরি করতেই থাকবে।