ইসরায়েলভিত্তিক শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমস অব ইসরায়েলের এক সাম্প্রতিক ও সাড়া জাগানো প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিক মহলে যখন ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের প্রকাশ্য সংঘাতের আশঙ্কা তীব্র আকার ধারণ করেছিল, ঠিক সেই সংকটময় মুহূর্তে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে এই সমঝোতা প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়।
এর ফলে ইরান থেকে উদ্ভূত সম্ভাব্য সামরিক হামলার সরাসরি ঝুঁকি থেকে সৌদি আরব কার্যত রক্ষা পেয়েছে বলে কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন। এই গোপন সমঝোতার নেপথ্যে অত্যন্ত সুকৌশলে একটি দীর্ঘমেয়াদী বাণিজ্যিক উদ্যোগকে কাজে লাগানো হয়েছে।
পরিচয় গোপন রাখার শর্তে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক একজন জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক, একটি প্রভাবশালী আঞ্চলিক গোয়েন্দা সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট আরেকজন বিশেষজ্ঞ এই মধ্যস্থতা প্রক্রিয়ার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সংবাদমাধ্যমের কাছে নিশ্চিত করেছেন।
তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের শেষ দিক থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে ইরান থেকে পাকিস্তানে জ্বালানি তেল পরিবহনের একটি যৌথ ও গোপন উদ্যোগ অত্যন্ত সফলভাবে পরিচালিত হয়ে আসছে।
আশ্চর্যজনকভাবে এই বিশাল বাণিজ্যিক উদ্যোগের সঙ্গে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) শীর্ষ নেতা আহমাদ বাহিদি এবং পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরের সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে ওই প্রতিবেদনে সুনির্দিষ্টভাবে দাবি করা হয়েছে।
মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকা সত্ত্বেও এই যুগান্তকারী যৌথ জ্বালানি পরিবহন কার্যক্রম থেকে উভয় পক্ষই উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বিশাল অঙ্কের আর্থিক সুবিধা লাভ করে আসছে, যা তাদের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
এই বিশাল অর্থনৈতিক স্বার্থকেই তুরুপের তাস হিসেবে ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা সমীকরণে ইতিবাচক বদল এনেছে পাকিস্তান। গত মার্চের শেষের দিকে যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সামরিক সংঘাতের একেবারে প্রাথমিক পর্যায় চলছিল, তখন পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে এক চরম অনিশ্চয়তা ও যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছিল।
ওই উত্তেজনাকর সময়ের শুরুতে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের আরও বেশ কয়েকটি দেশ সরাসরি ইরানের সম্ভাব্য হামলার মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছিল। ঠিক সেই নাজুক ও সংকটপূর্ণ পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির তার ব্যক্তিগত প্রভাব এবং ওই যৌথ তেল পরিবহন চুক্তির কৌশলগত গুরুত্বকে কাজে লাগিয়ে ইরানের আইআরজিসি প্রধানের সঙ্গে অত্যন্ত ফলপ্রসূ আলোচনায় বসেন।
এই অভিনব সমঝোতার পরপরই সৌদি আরব ইরানের যেকোনো প্রকার সামরিক আগ্রাসন বা হামলার লক্ষ্যবস্তু হওয়া থেকে নিরাপদ দূরত্বে চলে আসে এবং মধ্যপ্রাচ্যের একটি বড় ধরনের আঞ্চলিক সংঘাত এড়ানো সম্ভব হয়।
সমঝোতার পর টানা তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে সৌদি আরবের ভূখণ্ড লক্ষ্য করে কোনো ধরনের হামলা পরিচালিত হয়নি, যা এই চুক্তির সফলতার একটি বড় প্রমাণ ছিল। তবে সম্প্রতি এই অলিখিত চুক্তিতে সামান্য ছন্দপতন ঘটে।
সংবাদমাধ্যমের ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, গত সপ্তাহান্তে হঠাৎ করেই তেহরান থেকে একটি অপ্রত্যাশিত ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে, যা আঞ্চলিক নিরাপত্তায় নতুন করে ব্যাপক উদ্বেগের সৃষ্টি করে। এই আকস্মিক ঘটনার পর পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল মুনির তাৎক্ষণিকভাবে তার কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেন।
তিনি বিন্দুমাত্র কালক্ষেপণ না করে সরাসরি আইআরজিসি প্রধান আহমাদ বাহিদিকে একটি কড়া সতর্কবার্তা পাঠান। জেনারেল মুনির স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে, সৌদি আরবের দিকে এই ধরনের সামরিক হামলা যদি ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকে, তবে তাদের মধ্যকার অত্যন্ত লাভজনক যৌথ তেল পরিবহন উদ্যোগটি অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হবে এবং সেটি বন্ধও হয়ে যেতে পারে।
এই কঠোর সতর্কবার্তার পর থেকে সৌদি আরবকে লক্ষ্য করে আর কোনো ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেনি বলে গোয়েন্দা সূত্রগুলো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছে। পাকিস্তানের এই অভিনব কূটনৈতিক মধ্যস্থতার পেছনে কেবল আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠাই নয়, বরং গভীর ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থও নিহিত রয়েছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।
মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক ওই প্রভাবশালী গোয়েন্দা সূত্রটির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই অত্যন্ত সংবেদনশীল মধ্যস্থতা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পাকিস্তান মূলত সৌদি আরবের সঙ্গে তাদের বিদ্যমান কৌশলগত সম্পর্ককে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিতে এবং অত্যন্ত সুগভীর করতে চেয়েছে।
এই সফল উদ্যোগের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান প্রমাণ করেছে যে, আঞ্চলিক সংকট নিরসনে তারা একটি নির্ভরযোগ্য ও অপরিহার্য শক্তি। ইসলামাবাদ আশা করছে, এই পদক্ষেপের ফলে ভবিষ্যৎ দিনগুলোতে রিয়াদ তাদের জাতীয় নিরাপত্তা এবং মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো আঞ্চলিক ও ভূ-রাজনৈতিক ইস্যুতে পাকিস্তানের ওপর আরও অনেক বেশি নির্ভরশীল হয়ে উঠবে।
এর মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বে পাকিস্তানের নেতৃত্ব এবং সামরিক কূটনীতির এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন হলো, যা আগামী দিনের আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।