রবিবার, জুলাই ২৬, ২০২৬
১১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনে এবং ইরানকে দুর্বল করতে ব্যর্থ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৬ জুলাই, ২০২৬, ০১:২৬ পিএম

হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনে এবং ইরানকে দুর্বল করতে ব্যর্থ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র
ছবি : Collected

যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর জলপথ হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক ও সামরিক লক্ষ্য অর্জনে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে বলে তীব্র সমালোচনা করেছে ইরান।

 

একই সঙ্গে তেহরানকে অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে দুর্বল করার যে সুদূরপ্রসারী মিশন নিয়ে ওয়াশিংটন অগ্রসর হচ্ছিল, সেটিও সফলতার মুখ দেখেনি বলে দৃঢ়ভাবে দাবি করেছে দেশটির সামরিক বাহিনী।

 

রবিবার (২৬ জুলাই) ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এই বিস্ফোরক মন্তব্য করেন ইরানের সামরিক বাহিনীর শীর্ষ মুখপাত্র জেনারেল আবুলফজল শেকারচি।

 

সাম্প্রতিক সময়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান তীব্র সামরিক উত্তেজনা, ধারাবাহিক সংঘাত এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে তার এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এই বিবৃতিকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

 

ইরানি সামরিক বাহিনীর এই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা তার আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে ওয়াশিংটনের বর্তমান অবস্থাকে অত্যন্ত শোচনীয় ও দিশেহারা বলে আখ্যায়িত করেছেন। রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যমে দেওয়া ওই সাক্ষাৎকারে তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, মার্কিনিদের জন্য বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত বিশৃঙ্খল, হতাশাজনক এবং তাদের জন্য এটি সম্পূর্ণ অনাকাঙ্ক্ষিত একটি পর্যায়।

 

তার মতে, হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের প্রাথমিক লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র এখন যুদ্ধক্ষেত্রে নতুন সামরিক কৌশল ও বিকল্প পথের সন্ধান করছে। মধ্যপ্রাচ্যের রণাঙ্গনে মার্কিন বাহিনীর এই অস্থিতিশীল অবস্থার কথা উল্লেখ করে জেনারেল শেকারচি আরও বলেন, মার্কিনিরা চাইলেই এখন নিজেদের একক সিদ্ধান্তে এই ধ্বংসাত্মক ও দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে না।

 

যুদ্ধবিরতি, সেনা প্রত্যাহার বা সংঘাত অবসানের মতো যেকোনো বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের এখন সম্পূর্ণভাবে ইহুদিবাদীদের, অর্থাৎ ইসরায়েলের চূড়ান্ত অনুমতির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। উল্লেখ্য, ইরানের রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও সামরিক পরিভাষায় সাধারণত ইসরায়েল রাষ্ট্রকে 'ইহুদিবাদী' বা জায়নবাদী শক্তি হিসেবেই অভিহিত করা হয়ে থাকে।

 

চলমান এই তীব্র সংঘাতের শিকড় মূলত কয়েক মাস আগের একটি বড় ধরনের ও সমন্বিত সামরিক পদক্ষেপের সাথে গভীরভাবে যুক্ত। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর দেওয়া তথ্য ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানের অভ্যন্তরে আকস্মিক ও বড় পরিসরে সামরিক হামলা পরিচালনা করে।

 

ওই হামলার পর থেকেই পুরো মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে চরম অস্থিতিশীলতা, রণপ্রস্তুতি এবং গভীর উৎকণ্ঠার সৃষ্টি হয়। উভয় পক্ষের মধ্যে এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ টানা চল্লিশ দিন ধরে অব্যাহত থাকে, যা গোটা বিশ্বের জ্বালানি বাজার, অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার ওপর গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

 

দীর্ঘ এই সংঘাতের পর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত করার লক্ষ্যে এবং আন্তর্জাতিক মহলের জোরালো চাপে জুলাই মাসের শুরুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের শীর্ষ প্রতিনিধিরা একটি যুদ্ধবিরতি ও সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছিলেন।

 

বিশ্ববাসী এই চুক্তির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ফিরে আসার আশা করলেও, বাস্তব পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং তা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। খুব অল্প সময়ের ব্যবধানেই সেই বহুপ্রতীক্ষিত সমঝোতা স্মারকটি সম্পূর্ণভাবে ভেস্তে যায় এবং উভয় পক্ষ আবারও এক নতুন ও ভয়াবহ সশস্ত্র সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে।

 

সমঝোতা চুক্তি বাতিল হওয়ার পরপরই যুক্তরাষ্ট্র অত্যন্ত আক্রমণাত্মক রূপ ধারণ করে এবং টানা দুই সপ্তাহ ধরে ইরানের বিভিন্ন কৌশলগত, পারমাণবিক ও সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে অবিরাম বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়।

 

তবে তেহরানও এই আগ্রাসনের মুখে নিশ্চুপ থাকেনি। সামরিক দিক থেকে নিজেদের সক্ষমতা ও প্রস্তুতির প্রমাণ দিয়ে ইরানও তাৎক্ষণিকভাবে অত্যন্ত কঠোর পাল্টা জবাব দেওয়া শুরু করে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি, কৌশলগত অবকাঠামো এবং তাদের আঞ্চলিক মিত্রদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করে একের পর এক সফল ও বিধ্বংসী হামলা পরিচালনা করে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী।

 

এই পাল্টাপাল্টি হামলার ফলে পুরো অঞ্চলটি কার্যত একটি সক্রিয় ও অনিয়ন্ত্রিত যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়। তবে রণক্ষেত্রের এই উত্তাল ও ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতির মাঝে গত দুই দিন ধরে এক রহস্যময় স্থবিরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। গত ৪৮ ঘণ্টায় মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের অভ্যন্তরে নতুন করে কোনো বড় ধরনের হামলা পরিচালনা করা থেকে নিজেদের সম্পূর্ণভাবে গুটিয়ে রেখেছে।

 

এই আকস্মিক নীরবতা বা যুদ্ধবিরতির পেছনের কারণ হিসেবে মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও চাঞ্চল্যকর একটি তথ্য প্রকাশ করেছে। প্রথম সারির মার্কিন গণমাধ্যমগুলোর বিশ্লেষণ ও পেন্টাগনের প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, টানা যুদ্ধ এবং ইরানের ছোড়া মিসাইলগুলোর বিপরীতে প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টারসেপ্টর মিসাইল বা আক্রমণ প্রতিহতকারী ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থার মজুত অত্যন্ত আশঙ্কাজনক হারে কমে এসেছে।

 

এই অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক মিসাইলের মজুত ফুরিয়ে যাওয়ার তীব্র শঙ্কা থেকেই মার্কিনিরা আপাতত ইরানে নতুন করে কোনো বড় পরিসরের সামরিক অভিযান বা সরাসরি সংঘাত পরিচালনা করা থেকে নিজেদের বিরত রেখেছে।

 

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর এখন তাদের সামরিক রসদ, আকাশ সুরক্ষা ব্যবস্থা ও মজুত পুনর্গঠনের দিকে সর্বোচ্চ মনোযোগ দিচ্ছে, যার ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে সাময়িক এই স্থবিরতা বিরাজ করছে।

 

- আল জাজিরা