রবিবার, জুলাই ২৬, ২০২৬
১১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলা চালালে যুদ্ধের পরিধি আরও বিস্তৃত হবে, ইরানের হুঁশিয়ারি

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৬ জুলাই, ২০২৬, ০৫:৪৯ পিএম

যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলা চালালে যুদ্ধের পরিধি আরও বিস্তৃত হবে, ইরানের হুঁশিয়ারি
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি এক অভাবনীয় ও কঠোর হুঁশিয়ারি বার্তা দিয়েছে ইরানের সামরিক বাহিনী। যুক্তরাষ্ট্র যদি নতুন করে ইরানের ওপর কোনো ধরনের সামরিক আগ্রাসন বা হামলা চালানোর দুঃসাহস দেখায়, তবে এই সংঘাত আর নির্দিষ্ট কোনো সীমানার মধ্যে আবদ্ধ থাকবে না, বরং যুদ্ধের ভৌগোলিক পরিধি আরও ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হবে বলে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।

 

রোববার (২৬ জুলাই) ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা এই কড়া বার্তা প্রদান করেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, তেহরানের এই বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় ধরনের অশনিসংকেত, যা পুরো বিশ্ব অর্থনীতি ও শান্তিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

 

ইরানের সেনাবাহিনীর অন্যতম মুখপাত্র মোহাম্মদ আর্কেমিনিয়া রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রশাসনকে সরাসরি সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি আবারও কোনো উসকানিমূলক কার্যক্রমে জড়ায়, তবে তার পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ।

 

তিনি অভিযোগ করেন যে, মার্কিন প্রশাসন বর্তমানে ইসরায়েলের পাতা ফাঁদে পা দিচ্ছে। আর্কেমিনিয়া অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেন, মার্কিনিরা যদি ইসরায়েলের নির্দেশনায় পরিচালিত হয়ে এই অঞ্চলে নতুন করে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, বিশেষ করে আকাশপথে কোনো বিমান হামলার মতো ঘটনা ঘটায়, তবে তার চূড়ান্ত ও মোক্ষম জবাব দিতে ইরান পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে।

 

তিনি জোর দিয়ে বলেন, এ ধরনের যেকোনো আগ্রাসন এই অঞ্চলের কৌশলগত সমীকরণকে সম্পূর্ণ বদলে দেবে এবং যুদ্ধের আগুন পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়বে। ইরানের সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে আসা এই রণহুংকার এমন এক স্পর্শকাতর সময়ে সামনে এল, যখন আন্তর্জাতিক কূটনীতির মঞ্চে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার অবতারণা হতে যাচ্ছে।

 

জানা গেছে, আগামী মঙ্গলবার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে এক বিশেষ ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে মিলিত হতে যাচ্ছেন। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকগণ মনে করছেন, এই বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা, ইরানের সামরিক সক্ষমতা এবং সম্ভাব্য যৌথ পদক্ষেপের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়গুলো নিয়ে গভীর আলোচনা হতে পারে।

 

এছাড়া, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকালে কট্টর ইসরায়েলপন্থি হিসেবে পরিচিত মার্কিন আইনপ্রণেতা লিন্ডসে গ্রাহামের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠানেও আনুষ্ঠানিকভাবে অংশগ্রহণ করবেন। মার্কিন রাজনৈতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের এই শক্তিশালী উপস্থিতি এবং মিত্রতার প্রদর্শনীর ঠিক পরপরই ইরানের এমন কঠোর অবস্থান আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন উত্তাপের সৃষ্টি করেছে।

 

অন্যদিকে, সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও কৌশলগত দিকগুলোও তুলে ধরেছেন ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা। ইরানের সেনাবাহিনীর আরেক জ্যেষ্ঠ মুখপাত্র জেনারেল আবদুলফজল শেকারচি একই দিনে দেওয়া ভিন্ন এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত ব্যর্থতার তীব্র সমালোচনা করেছেন।

 

রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। হরমুজ প্রণালি, যা বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেল সরবরাহের অন্যতম প্রধান ও সংবেদনশীল পথ, সেখানে সামরিক আধিপত্য বিস্তার করে ইরানকে অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে পঙ্গু করার যে নীলকশা ওয়াশিংটন তৈরি করেছিল, তা কার্যত মুখ থুবড়ে পড়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

 

জেনারেল শেকারচির মতে, এই ধারাবাহিক ব্যর্থতার ফলে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন সামরিক বাহিনীর জন্য বর্তমান পরিস্থিতি একেবারে বিশৃঙ্খল, হতাশাজনক এবং অনাকাঙ্ক্ষিত রূপ ধারণ করেছে।

 

জেনারেল শেকারচি আরও বিশদভাবে দাবি করেন যে, ওয়াশিংটন এখন চলমান এই সামরিক ও কূটনৈতিক অচলাবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য মরিয়া হয়ে নতুন কোনো কৌশল খুঁজছে। তবে তিনি এই বলে কটাক্ষ করেন যে, যুক্তরাষ্ট্র চাইলেও বর্তমান সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতি থেকে নিজেদের ইচ্ছামতো প্রত্যাহার করে নিতে পারবে না।

 

তেহরানের এই সামরিক কর্মকর্তার মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি ও সামরিক পদক্ষেপ বর্তমানে তাদের মিত্র রাষ্ট্রের দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত এবং নিয়ন্ত্রিত। ফলে, যেকোনো যুদ্ধবিরতি বা সংঘাত থেকে পিছু হঠার সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেও তাদের ইসরায়েলি মিত্রদের অনুমতির ওপর পুরোপুরি নির্ভর করতে হচ্ছে, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের অক্ষমতাকেই ফুটিয়ে তোলে।

 

সার্বিকভাবে, ইরানের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের এই ধারাবাহিক বক্তব্য ও কড়া হুঁশিয়ারি থেকে এটি অত্যন্ত স্পষ্ট যে, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি বর্তমানে একটি জ্বলন্ত বারুদের স্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। যেকোনো পক্ষের সামান্যতম ভুল হিসাব-নিকাশ বা হঠকারী সামরিক পদক্ষেপ পুরো অঞ্চলকে এক ধ্বংসাত্মক ও দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

 

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং শান্তিকামী বিশ্ব এখন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে যে, আগামী মঙ্গলবার ট্রাম্প-নেতানিয়াহু শীর্ষ বৈঠকের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরান ইস্যুতে নতুন করে সামরিক নাকি কূটনৈতিক, কোন ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়।

 

- আল জাজিরা