কুয়েতের পক্ষ থেকে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, ইরানে কোনো ধরনের সামরিক হামলা পরিচালনার উদ্দেশ্যে কুয়েতের নিজস্ব সার্বভৌম ভূখণ্ড, আকাশসীমা কিংবা জলসীমা ব্যবহারের কোনো অনুমতি কোনো বিদেশি বা আঞ্চলিক শক্তিকে দেওয়া হয়নি এবং ভবিষ্যতেও এ ধরনের কোনো পদক্ষেপ সমর্থন করা হবে না।
মূলত আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত একটি স্পর্শকাতর প্রতিবেদনের জেরে মধ্যপ্রাচ্যের এই ক্ষুদ্র অথচ কৌশলগত ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রটিকে এমন আনুষ্ঠানিক ও জোরালো ব্যাখ্যার পথে হাঁটতে হয়েছে।
কুয়েতের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা কুনার বরাতে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি প্রকাশ্যে এনেছে, যা আঞ্চলিক কূটনীতিতে ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী দৈনিক পত্রিকা ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে প্রকাশিত একটি বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে এই ব্যাপক কূটনৈতিক বিতর্কের সূত্রপাত হয়। ওই বিতর্কিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল যে, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে ইরানের সাম্প্রতিক ড্রোন ও বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কড়া প্রতিক্রিয়া হিসেবে কুয়েত ও বাহরাইন সম্পূর্ণ গোপনে ইরানি ভূখণ্ডে বিমান হামলা পরিচালনা করেছে।
সংবাদমাধ্যমটির দাবি অনুযায়ী, চলতি মাসের শুরুর দিকে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে ইরানের কয়েকটি সংবেদনশীল সামরিক স্থাপনা এবং ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র মজুত রাখার গোপন গুদাম লক্ষ্য করে এসব চোরাগোপ্তা হামলা চালানো হয়েছিল।
শুধু তা-ই নয়, প্রতিবেদনটিতে আরও একটি বিস্ফোরক ও সংবেদনশীল দাবি করা হয় যে, উপসাগরীয় অঞ্চলের আরেক প্রভাবশালী রাষ্ট্র সংযুক্ত আরব আমিরাত অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে সংগৃহীত নিখুঁত গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করে এই সামরিক অভিযানে সরাসরি সহায়তা প্রদান করেছে।
এই ধরনের সংবাদ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থার চরম সংকট তৈরি করতে পারে এবং নতুন করে যুদ্ধ পরিস্থিতির উসকানি দিতে পারে বিবেচনায় কুয়েত তাৎক্ষণিকভাবে এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে প্রকাশিত এই ধরনের ভিত্তিহীন ও উসকানিমূলক দাবির পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের নিরপেক্ষ অবস্থান পরিষ্কার করতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে কার্যকর কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে কুয়েত সরকার।
যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত কুয়েতের রাষ্ট্রদূত শেখা আল-জেইন আল-সাবাহ অবিলম্বে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের সম্পাদকীয় বোর্ডের কাছে একটি আনুষ্ঠানিক ও কড়া ভাষায় লিখিত প্রতিবাদপত্র বা চিঠি প্রেরণ করেন। সেই চিঠিতে তিনি পত্রিকায় উত্থাপিত প্রতিটি অভিযোগকে সম্পূর্ণ বানোয়াট, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, মিথ্যা ও পুরোপুরি ভিত্তিহীন বলে দৃঢ়ভাবে উল্লেখ করেন।
আন্তর্জাতিক কূটনীতির প্রচলিত রীতিনীতি মেনে তিনি অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সঙ্গে বিশ্ববাসীর সামনে নিজের দেশের শান্তিকামী অবস্থান তুলে ধরেন। রাষ্ট্রদূত শেখা আল-জেইন আল-সাবাহ তার প্রেরিত চিঠিতে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় উল্লেখ করেছেন যে, কুয়েত কোনোভাবেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত কোনো সামরিক অভিযানে ন্যূনতম অংশগ্রহণ করেনি।
একই সঙ্গে তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে পুনরায় আশ্বস্ত করে জানান, যেকোনো ধরনের আক্রমণাত্মক সামরিক অভিযান পরিচালনার জন্য কুয়েতের সার্বভৌম ভূখণ্ড, সংরক্ষিত আকাশসীমা বা জলসীমা ব্যবহারের সামান্যতম অনুমতিও কোনো রাষ্ট্র বা সামরিক জোটকে কখনোই দেওয়া হয়নি।
একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে কুয়েত সর্বদা আঞ্চলিক শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পক্ষে এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যেকোনো ধরনের হস্তক্ষেপ বা সামরিক আগ্রাসনের ঘোর বিরোধী।
এদিকে, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতে কুয়েতের এই দৃঢ় ও স্পষ্ট অবস্থানের খবরটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে প্রচারিত হচ্ছে। ইরানের প্রভাবশালী রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম মেহর নিউজ কুয়েতের সরকারি বার্তা সংস্থা কুনার বরাত দিয়ে তাদের নিজস্ব বিস্তারিত প্রতিবেদনে জানিয়েছে যে, কুয়েত প্রকাশিত ওই মার্কিন সংবাদমাধ্যমের তথ্য কঠোরভাবে ও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাখ্যান করে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে।
এর মাধ্যমে দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে সম্ভাব্য ভুল-বোঝাবুঝি ও উত্তেজনার যে গভীর আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, তা অনেকাংশেই প্রশমিত হয়েছে বলে ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
তবে এই অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে প্রতিবেদনে উল্লিখিত অপর রাষ্ট্র বাহরাইনের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক বক্তব্য আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে পাওয়া যায়নি, যা কূটনৈতিক মহলে নানা ধরনের নীরব জল্পনাকল্পনার জন্ম দিয়েছে।
আঞ্চলিক শান্তিকামী মানুষেরা এবং আন্তর্জাতিক মহল নিবিড়ভাবে আশা করছে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো পারস্পরিক সম্মান ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘাত সযত্নে এড়িয়ে চলবে।