ইরানের সামরিক নেতৃত্বের দাবি অনুযায়ী, তাদের সশস্ত্র বাহিনীর নিখুঁত পরিকল্পনায় পরিচালিত এই সুনির্দিষ্ট ও শক্তিশালী হামলায় ওই অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোর একটি বিশাল অংশ বর্তমানে সম্পূর্ণভাবে তাদের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ও শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো এই ঘটনাকে আঞ্চলিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের বাঁকবদল হিসেবে মূল্যায়ন করছে। এই ধরনের সামরিক পদক্ষেপ ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-কৌশলগত সামরিক সমীকরণকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে, যা বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতিতেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলার শঙ্কা তৈরি করেছে।
শনিবার রাতে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক বিশেষ ও বহুল আলোচিত সাক্ষাৎকারে দেশটির সেনাবাহিনীর অন্যতম শীর্ষ মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আকরামি-নিয়া এই বিস্ফোরক তথ্য প্রকাশ্যে আনেন।
স্থানীয় মেহর বার্তা সংস্থার বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, এই ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তা অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে মার্কিন প্রশাসনকে একটি কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি সুস্পষ্ট ভাষায় বলেন, চলমান এই সামরিক সংঘাত বা যুদ্ধ পরিস্থিতি যদি ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকে, তবে অতীত অভিজ্ঞতা ও সফলতার ওপর ভিত্তি করে আগের মতোই সর্বাত্মক সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার জন্য ইরানের সশস্ত্র বাহিনী সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত রয়েছে।
জেনারেল আকরামি-নিয়া অত্যন্ত জোর দিয়ে উল্লেখ করেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যতক্ষণ পর্যন্ত এই রূঢ় বাস্তবতা অনুধাবন করতে ব্যর্থ হবে যে সামরিক আগ্রাসন চালিয়ে স্বাধীনচেতা ইরানি জনগণের ওপর কোনোভাবেই নিজেদের হীন ইচ্ছা বা আধিপত্য চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়, ঠিক ততক্ষণ পর্যন্ত ইরানের এই প্রতিরোধমূলক সামরিক অভিযান কোনো ধরনের বিরতি ছাড়াই অব্যাহত থাকবে।
সম্প্রতি সমাপ্ত হওয়া দীর্ঘ ৪০ দিনের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের একটি সার্বিক পর্যালোচনা করতে গিয়ে এই সেনা মুখপাত্র ইরানের ক্রমবর্ধমান সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ে বেশ কিছু নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেশবাসীর সামনে তুলে ধরেন।
তিনি বিস্তারিতভাবে জানান, যুদ্ধের একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী সামরিক রণকৌশলে সম্পূর্ণ নতুন এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তির বেশ কিছু ড্রোন সফলভাবে উন্মোচন করেছে। তবে সামরিক ও কৌশলগত নিরাপত্তার স্বার্থে এখনই এগুলোর বিস্তারিত কারিগরি তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা হচ্ছে না বলে তিনি জানান।
তিনি প্রবল আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিশ্চিত করেছেন যে, বর্তমানে ইরানের সামরিক ভাণ্ডারে নতুন যুক্ত হওয়া এই ড্রোনগুলো তাদের পূর্ববর্তী বহুল আলোচিত ‘আরাশ-২’ ড্রোনের চেয়েও প্রযুক্তির দিক থেকে অনেক বেশি উন্নত।
এই নতুন প্রজন্মের ড্রোনগুলোর ধ্বংসক্ষমতা, নিশানায় আঘাত হানার নিখুঁত নির্ভুলতা এবং উড্ডয়ন পাল্লা বা রেঞ্জ আগের যেকোনো সমরাস্ত্রের তুলনায় বহুগুণ বেশি, যা যেকোনো মুহূর্তে শত্রুপক্ষের শক্তিশালী প্রতিরোধ ব্যূহ ভেদ করে গভীরে গিয়ে ভয়াবহ আঘাত হানতে সক্ষম।
যুদ্ধবিরতির ফলে সৃষ্ট সাময়িক শান্ত পরিস্থিতিকে ইরান অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে নিজেদের সামরিক শক্তি পুনর্গঠন ও সুসংহত করার কাজে লাগিয়েছে বলেও জেনারেল আকরামি-নিয়া বিস্তারিতভাবে জানিয়েছেন।
তিনি অত্যন্ত সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, সাময়িক এই যুদ্ধবিরতির মূল্যবান সুযোগ কাজে লাগিয়ে এবং যুদ্ধের শেষ দিক থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত, বিগত হামলাগুলোতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ইরানের অসংখ্য সামরিক সরঞ্জাম ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে তারা পুনরায় সম্পূর্ণরূপে মেরামত করে নিখুঁতভাবে কার্যকর করে তুলতে সক্ষম হয়েছেন।
নিজস্ব প্রযুক্তি ও প্রকৌশলীদের দ্বারা এই বিশাল ও জটিল মেরামত প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সফলতার সঙ্গেই সম্পন্ন হয়েছে। এর পাশাপাশি সামরিক বাহিনীকে আরও যুগোপযোগী ও আধুনিকায়নের লক্ষ্যে তারা সম্পূর্ণ নতুন এবং অত্যাধুনিক বেশ কিছু সমরাস্ত্র ও প্রতিরক্ষামূলক সরঞ্জামও নিজেদের সামরিক বহরে যুক্ত করেছেন।
এই নতুন সংযোজনগুলো সামগ্রিকভাবে ইরানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে এক অভাবনীয় উচ্চতায় নিয়ে গেছে। যার ফলশ্রুতিতে, অতীতের ওই ৪০ দিনের যুদ্ধের সময়ের তুলনায় বর্তমানে ইরানের আকাশসীমা যেকোনো অনুপ্রবেশকারী শত্রুর জন্য তুলনামূলকভাবে আরও অনেক বেশি বিপজ্জনক ও নিশ্ছিদ্র হয়ে উঠেছে।
নিজেদের আকাশসীমার সুরক্ষা ও আধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে কথা বলার পাশাপাশি, সামরিক নিরাপত্তার একটি চিরন্তন বৈশ্বিক বাস্তবতার কথাও তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে স্মরণ করিয়ে দেন। ইরানি সেনাবাহিনীর এই প্রভাবশালী মুখপাত্র অত্যন্ত জোর দিয়ে বলেন যে, বর্তমান বিশ্বের অত্যাধুনিক সামরিক প্রেক্ষাপটেও কোনো শক্তিশালী রাষ্ট্রই এককভাবে এ কথা দাবি করতে পারে না যে তাদের দেশের আকাশসীমা শতভাগ সুরক্ষিত বা নিশ্ছিদ্র।
উদাহরণ টানতে গিয়ে তিনি সরাসরি বিশ্বের শীর্ষ পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বিশ্বের সর্বোচ্চ সামরিক বাজেটের অধিকারী ও সর্বাধুনিক প্রযুক্তিতে বলীয়ান আমেরিকার মতো দেশেও মাঝে মাঝে রাডার ফাঁকি দিয়ে অজ্ঞাত ও অননুমোদিত বিমান ঢুকে পড়ার মতো বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে থাকে, যা এমনকি দেশটির প্রশাসনিক ক্ষমতার মূল কেন্দ্রবিন্দু হোয়াইট হাউসের সুরক্ষিত প্রাঙ্গণ পর্যন্ত অনায়াসেই পৌঁছে যায়।
তার এই সুচিন্তিত বক্তব্যটি মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অপ্রতিরোধ্য সামরিক অহংকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করার পাশাপাশি নিজেদের প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপের যৌক্তিকতা প্রমাণের একটি সুস্পষ্ট কূটনৈতিক কৌশল হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।