রবিবার, জুলাই ২৬, ২০২৬
১১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হরমুজ প্রণালিতে নির্ধারিত পথ থেকে সরে যাওয়ায় তেলবাহী ট্যাংকারে ভয়াবহ বিস্ফোরণ

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৬ জুলাই, ২০২৬, ০৮:১৫ পিএম

হরমুজ প্রণালিতে নির্ধারিত পথ থেকে সরে যাওয়ায় তেলবাহী ট্যাংকারে ভয়াবহ বিস্ফোরণ
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের অত্যন্ত কৌশলগত ও বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য অপরিহার্য জলপথ হরমুজ প্রণালিতে একটি তেলবাহী ট্যাংকারে ভয়াবহ মাইন বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা মেহর নিউজের বরাত দিয়ে রোববার প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ট্যাংকারটি নৌ-চলাচলের জন্য ইরানের নির্ধারিত ও নির্দেশিত নিরাপদ পথ অনুসরণ না করে আকস্মিকভাবে সেখান থেকে সরে যাওয়ার কারণেই এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে।

 

অত্যন্ত সংবেদনশীল এই জলপথে পূর্বে থেকে পুঁতে রাখা একটি সামুদ্রিক মাইনের সঙ্গে সজোরে ধাক্কা লাগার ফলেই এই প্রকাণ্ড বিস্ফোরণ ঘটে বলে প্রাথমিক তথ্যে জানা গেছে। তবে এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও আকস্মিক বিস্ফোরণের ফলে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো ক্রুর প্রাণহানি বা হতাহতের ঘটনা ঘটেছে কি না, ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজটির প্রকৃত পরিচয় কী এবং সামগ্রিক আর্থিক বা কাঠামোগত ক্ষতির পরিমাণ ঠিক কতটুকু, সে সম্পর্কে এখন পর্যন্ত বিস্তারিত কোনো তথ্য আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বা সরকারি কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে প্রকাশ করা হয়নি।

 

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বর্তমানে ঘটনাস্থলের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়নের কাজ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে চালিয়ে যাচ্ছে। এই বিস্ফোরণের ঘটনাটি এমন এক চরম উত্তেজনাকর ও স্পর্শকাতর সময়ে ঘটল, যখন হরমুজ প্রণালির নৌ-চলাচলের নিয়মকানুন নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক বিতর্ক ও পরাশক্তিগুলোর মধ্যে মতবিরোধ চলছে।

 

উল্লেখ্য, গত ২৬ জুন ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে একটি কড়া নির্দেশনা জারি করা হয়েছিল। ওই ঘোষণায় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয় যে, বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত এই সামুদ্রিক প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী যেকোনো বাণিজ্যিক জাহাজ বা তেলবাহী ট্যাংকারকে এখন থেকে বাধ্যতামূলকভাবে কেবল তেহরানের নির্ধারিত নৌপথই ব্যবহার করতে হবে।

 

হরমুজ প্রণালি বিশ্বব্যাপী উৎপাদিত জ্বালানি তেল সরবরাহের অন্যতম প্রধান ধমনী হওয়ায়, জলপথটির ওপর ইরানের এই একতরফা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্য ও বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তার জন্ম দিয়েছিল।

 

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, রোববারের এই ট্যাংকার বিস্ফোরণের ঘটনা সেই গভীর উদ্বেগেরই একটি বাস্তব ও মর্মান্তিক প্রতিফলন, যা সামুদ্রিক বাণিজ্যের ঝুঁকিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

 

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে এবং বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় উত্তেজনা একটি নজিরবিহীন ও বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। সামরিক সংঘাতের এই ধারাবাহিকতায় মার্কিন প্রশাসন সম্প্রতি ইরানের অভ্যন্তরে সামরিক হামলা পরিচালনা করে।

 

এর জবাবে তেহরানও নীরব বসে থাকেনি। ইরানের সামরিক বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে জোরালো দাবি করা হয়েছে যে, তারা মার্কিন আগ্রাসনের সরাসরি পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মিত্র দেশে অবস্থিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা ও লজিস্টিক সরঞ্জাম লক্ষ্য করে সফলভাবে প্রতিশোধমূলক হামলা চালিয়েছে।

 

দুই চিরশত্রু দেশের মধ্যকার এই নিরবচ্ছিন্ন পাল্টাপাল্টি সামরিক আগ্রাসন পুরো অঞ্চলের নাজুক শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে এক চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে, যার নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি হরমুজ প্রণালির মতো স্পর্শকাতর জলপথের নিরাপত্তার ওপরও এসে পড়ছে।

 

সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনেও দেশ দুটির মধ্যে চরম অচলাবস্থা ও আস্থার সংকট বিরাজ করছে। এই অব্যাহত অস্থিরতার মাঝেই গত ৮ জুলাই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে ঠিক আগের মাসে স্বাক্ষরিত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক হঠাৎ করেই বাতিল বলে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন।

 

এই চুক্তি বাতিলের পেছনে মার্কিন প্রেসিডেন্টের মূল অভিযোগ ছিল, তেহরান ওই সমঝোতা স্মারকের শর্তগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে লঙ্ঘন করেছে এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে তারা প্রতিশ্রুতি রক্ষায় সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।

 

ট্রাম্প প্রশাসনের এই আকস্মিক ও কঠোর ঘোষণার ঠিক আগেই হরমুজ প্রণালির এই কৌশলগত জলপথে অন্তত তিনটি ভিন্ন ভিন্ন তেলবাহী ট্যাংকারে রহস্যজনক হামলার ঘটনা ঘটেছিল। সেই ধারাবাহিক হামলাগুলোর প্রেক্ষাপটেই মূলত নৌ-চলাচলের স্বাধীন নিয়মকানুন এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে চরম মতবিরোধ ও কূটনৈতিক দ্বন্দ্বের সূত্রপাত হয়, যা বর্তমান বিস্ফোরণের মাধ্যমে আরও ঘনীভূত হলো।

 

হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের আইনি অধিকার ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের অবস্থান বর্তমানে সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক জলসীমায় বাধাহীন ও অবাধ নৌ-চলাচলের সর্বজনীন নীতির পক্ষে অত্যন্ত জোরালো অবস্থান গ্রহণ করা হয়েছে।

 

ওয়াশিংটন মনে করে, অবাধ বিশ্ব বাণিজ্যের স্বার্থে এই জলপথে যেকোনো দেশের বাণিজ্যিক ও বেসামরিক জাহাজের স্বাধীনভাবে চলাচলের অধিকার আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন দ্বারা পুরোপুরি সুরক্ষিত। অন্যদিকে, এই ইস্যুতে ইরানের দাবি সম্পূর্ণ ভিন্ন।

 

তেহরান দৃঢ়তার সঙ্গে জোর দিয়ে বলছে, এই প্রণালিতে চলাচলকারী সকল বিদেশি জাহাজকে আবশ্যিকভাবে তাদের উপকূলঘেঁষা নির্ধারিত নৌপথ ব্যবহার করতে হবে এবং এই পুরো চলাচল প্রক্রিয়াটি তেহরানের নিবিড় তত্ত্বাবধানে পরিচালিত নিজস্ব নৌ-নির্দেশনা ব্যবস্থার অধীনেই সম্পন্ন হতে হবে।

 

এই বিপরীতমুখী নীতি ও সামুদ্রিক আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ের ফলেই জলপথটিতে বারবার এ ধরনের মারাত্মক দুর্ঘটনা ও সংঘাতের সৃষ্টি হচ্ছে, যা সামগ্রিকভাবে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে এক গভীর ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে।

 

- আনাদোলু