রবিবার, জুলাই ২৬, ২০২৬
১১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইসরায়েলের সঙ্গে নিরাপত্তা চুক্তির পথে সিরিয়া

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৬ জুলাই, ২০২৬, ০৮:২২ পিএম

ইসরায়েলের সঙ্গে নিরাপত্তা চুক্তির পথে সিরিয়া
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই এক যুগান্তকারী কূটনৈতিক পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিয়েছে সিরিয়া। দীর্ঘদিনের বৈরী প্রতিবেশী ইসরায়েলের সঙ্গে একটি কার্যকরী নিরাপত্তা চুক্তি স্বাক্ষরের লক্ষ্যে দামেস্ক বর্তমানে সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে বলে নিশ্চিত করেছেন সিরিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘আল মুকাবালা’-তে দেওয়া এক বিশেষ ও বিস্তারিত সাক্ষাৎকারে তিনি এই তাৎপর্যপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করেন। প্রেসিডেন্ট আল-শারা জানান, কয়েকটি বন্ধুপ্রতিম ও মধ্যস্থতাকারী দেশের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে এই অত্যন্ত স্পর্শকাতর আলোচনাটি ধীরে ধীরে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

 

তার দৃঢ় বিশ্বাস, এই প্রাথমিক নিরাপত্তা বোঝাপড়া সফল হলে তা ভবিষ্যতে ওই অঞ্চলে একটি সুদূরপ্রসারী ও বিস্তৃত শান্তি চুক্তির শক্ত ভিত্তি বা পথ তৈরি করতে সক্ষম হবে। তবে তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে জানিয়ে দিয়েছেন যে, এই চুক্তির অর্থ কোনোভাবেই সিরিয়ার সার্বভৌমত্বের সঙ্গে আপস করা নয়।

 

বিশেষ করে, ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে ইসরায়েলের দখলে যাওয়া গোলান মালভূমির ওপর সিরিয়ার যে ঐতিহাসিক ও ন্যায্য অধিকার রয়েছে, তা এই চুক্তির ফলে বিন্দুমাত্র ক্ষুণ্ন হবে না। সিরিয়া বর্তমানে এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ নিরাপত্তা সমঝোতা চাইছে, যা অন্তত দুই দেশের মধ্যকার চলমান সীমান্ত উত্তেজনা ও সামরিক সংঘাত উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনবে।

 

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে দীর্ঘস্থায়ী বাশার আল-আসাদ সরকারের আকস্মিক পতনের পর সিরিয়ার রাষ্ট্রক্ষমতায় আসেন আহমেদ আল-শারা। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে দক্ষিণ সিরিয়ায় ইসরায়েলের বারবার সামরিক অভিযান ও অব্যাহত বিমান হামলার যে ভয়ংকর প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে, তার আলোকেই বর্তমান প্রেসিডেন্টের এই সংযত ও কূটনৈতিক মন্তব্য আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।

 

দামেস্ক এখন আর ইসরায়েলের সঙ্গে নতুন করে কোনো প্রত্যক্ষ ও সর্বাত্মক সামরিক সংঘাতে জড়াতে ইচ্ছুক নয়, বরং আলোচনার মাধ্যমে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও স্থিতিশীল সমাধানের পথ খুঁজছে।

 

সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা কেবল ইসরায়েল প্রসঙ্গেই নয়, বরং প্রতিবেশী রাষ্ট্র লেবাননের চলমান বহুমুখী সংকট নিয়েও সিরিয়ার বর্তমান অবস্থান অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে তুলে ধরেন। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মহলে সিরিয়ার লেবাননে সম্ভাব্য সামরিক হস্তক্ষেপ নিয়ে যে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছিল, তিনি তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে নাকচ করে দেন।

 

তিনি জোর দিয়ে বলেন, প্রতিবেশী রাষ্ট্র লেবাননে কোনো ধরনের সামরিক হস্তক্ষেপ চালানোর বিন্দুমাত্র পরিকল্পনা সিরিয়ার বর্তমান সরকারের নেই। এর পরিবর্তে, লেবানন বর্তমানে যে ভয়াবহ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তা কাটিয়ে উঠতে দেশটির বৈধ কর্তৃপক্ষকে কীভাবে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা যায়, তা নিয়ে দামেস্কের অভ্যন্তরীণ ও দ্বিপক্ষীয় আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।

 

সিরিয়ার প্রেসিডেন্টের মতে, লেবাননের এই গভীর সংকট কেবল সামরিক বা নিরাপত্তা ব্যবস্থা দিয়ে সমাধান করা কখনোই সম্ভব নয়। এর জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং সামাজিক কাঠামোর উন্নয়নসহ নানা দিক বিবেচনায় নিয়ে একটি সমন্বিত ও টেকসই সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।

 

তিনি আরও অভিমত ব্যক্ত করেন যে, দক্ষিণ লেবাননের যেসব অঞ্চল এখনও দখলদারিত্বের শিকার, তা দ্রুত পুনরুদ্ধার করা উচিত এবং একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে লেবাননের অভ্যন্তরীণ সব ধরনের সশস্ত্র গোষ্ঠী বা অস্ত্রের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ কেবল রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের হাতেই থাকা বাঞ্ছনীয়।

 

একই সঙ্গে তিনি গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, লেবাননে যদি কোনো কারণে বড় ধরনের অস্থিতিশীলতা বা যুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, তবে তার সরাসরি ও মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব সিরিয়ার ওপরও পড়বে।

 

বিশেষ করে ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যকার সম্ভাব্য যুদ্ধ যদি আরও বিস্তৃত হয়, তবে পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল এক ভয়াবহ ও অপূরণীয় সংকটের মুখে পতিত হবে বলে তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

 

যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার বিপর্যস্ত অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পুনরুদ্ধারের বিষয়েও প্রেসিডেন্ট আল-শারা তার সরকারের সুনির্দিষ্ট দাবি ও পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, দেশের অর্থনীতিকে পুনরায় নিজের পায়ে দাঁড় করাতে হলে কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের অন্যান্য দেশের আরোপিত কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাগুলো প্রত্যাহার করলেই চলবে না।

 

এই অর্থনৈতিক মুক্তির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে সিরিয়ার ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের জন্য দেশটিকে ‘সন্ত্রাসবাদে পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্র’-এর কালো তালিকা থেকেও অবিলম্বে বাদ দিতে হবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এই ধরনের ইতিবাচক পদক্ষেপ ছাড়া সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কর্মসূচি কখনোই সম্পূর্ণরূপে কার্যকর বা সফল হবে না বলে তিনি সতর্ক করেন।

 

দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় উত্তর ও পূর্ব সিরিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণকারী কুর্দি নেতৃত্বাধীন ‘সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস’ বা এসডিএফ-এর সঙ্গে সরকারের পূর্বস্বাক্ষরিত চুক্তির বিষয়েও তিনি কথা বলেন।

 

প্রেসিডেন্ট অকপটে স্বীকার করেন যে, নানা অভ্যন্তরীণ ও কৌশলগত কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে কিছুটা অনাকাঙ্ক্ষিত বিলম্ব হয়েছে। তবে তিনি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে জানান, সিরিয়ার বর্তমান সরকার যেকোনো মূল্যে এই শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নে সম্পূর্ণভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং অচিরেই এর সফলতা দেখতে পাওয়ার বিষয়ে তিনি অত্যন্ত আশাবাদী।

 

পরিশেষে, ২০১১ সাল থেকে শুরু করে ২০২৪ সাল পর্যন্ত চলা দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের সময় নিখোঁজ হওয়া অগণিত মানুষের সন্ধানে সরকার সম্প্রতি একটি বিশেষ ও ক্ষমতাসম্পন্ন জাতীয় কমিটি গঠন করেছে বলেও তিনি সাক্ষাৎকারে নিশ্চিত করেন। জাতিসংঘের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই দীর্ঘ যুদ্ধ চলাকালে সিরিয়ায় প্রায় এক লাখ মানুষ জোরপূর্বক গুম বা নিখোঁজ হয়েছেন।

 

তবে সিরিয়ার নিজস্ব জাতীয় নিখোঁজ ব্যক্তি কমিশনের ধারণা অনুযায়ী, এই নিখোঁজ মানুষের প্রকৃত সংখ্যা তিন লাখ পর্যন্তও হতে পারে। প্রেসিডেন্ট আল-শারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, এই নতুন গঠিত কমিটি সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড অনুসরণ করে অত্যন্ত স্বচ্ছতার সঙ্গে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করবে।

 

এছাড়া, এ ধরনের সংবেদনশীল বিষয়ে আগে থেকেই অভিজ্ঞ এমন বন্ধুরাষ্ট্রগুলোর কারিগরি ও গোয়েন্দা সহযোগিতায় নিখোঁজদের দ্রুত সন্ধান ও সঠিক তথ্য সংগ্রহের এই মানবিক কার্যক্রম জোরদার করা হবে, যা যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি জাতির ক্ষত নিরাময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

 

- আল জাজিরা