নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইরানের ক্ষমতাসীন ইসলামপন্থি সরকারের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি নিশ্চিত করেছেন। এর মধ্য দিয়ে গত কয়েক সপ্তাহের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর এই অঞ্চলে একটি সাময়িক শান্তির সুবাতাস বইতে শুরু করেছে।
জানা গেছে, গত শনিবার এবং রোববার রাতের আঁধারে ইরানের কোনো সামরিক অথবা বেসামরিক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্য করে নতুন করে কোনো সামরিক অভিযান পরিচালনা করেনি মার্কিন প্রতিরক্ষা বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড বা সেন্টকম।
ঠিক একইভাবে, এই ৪৮ ঘণ্টার নীরবতার সুযোগে ইরানের চৌকস প্রতিরক্ষা বাহিনীও মধ্যপ্রাচ্যের অন্য কোনো দেশে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে নিজেদের হামলার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে নির্ধারণ করেনি। অথচ, এই অঘোষিত অস্ত্রবিরতির আগে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল।
এর আগে টানা ১৩ দিন ধরে প্রত্যেক রাতে উভয় দেশের প্রতিরক্ষা বাহিনী একে অপরকে লক্ষ্য করে ভয়াবহ ও ধ্বংসাত্মক পাল্টাপাল্টি হামলা চালিয়ে আসছিল। এই টানা সংঘাতে পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে এক চরম আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল এবং বিশ্বনেতারা একটি সর্বাত্মক যুদ্ধের আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন।
রয়টার্সকে দেওয়া ওই এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে সংশ্লিষ্ট সেই পদস্থ ইরানি কর্মকর্তা অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করে বলেছেন, “মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে এই সাম্প্রতিক যুদ্ধের একেবারে শুরু থেকেই ইরান মূলত ‘হামলার বদলে হামলা’ বা সমানুপাতিক জবাব দেওয়ার নীতি কঠোরভাবে অনুসরণ করে আসছে।
আমরা কখনোই প্রথমে গায়ে পড়ে যুদ্ধ বাঁধাতে চাইনি। তাই যুক্তরাষ্ট্র যদি এখন থেকে আমাদের ওপর তাদের হামলা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে স্বাভাবিকভাবেই ইরানও তার নিজস্ব পাল্টা সামরিক অভিযান মুলতবি রাখবে।
সংঘাত এড়ানোর এই সদিচ্ছার বিষয়টি ইতোমধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ মহলের কাছে ইরানের পক্ষ থেকে একটি স্পষ্ট বার্তার মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।” উল্লেখ্য, ইরানের বিতর্কিত পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বের সাথে তাদের দীর্ঘদিন ধরে চরম মাত্রায় কূটনৈতিক টানাপোড়েন চলে আসছিল।
সেই ধারাবাহিকতায় গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের মাটিতে সরাসরি সামরিক অভিযান শুরু করে মার্কিন সামরিক বাহিনী। তবে বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের বর্তমান পর্যায়ে এসে সেই পুরনো পরমাণু কর্মসূচির ইস্যুটির চেয়েও আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান জলপথ ‘হরমুজ প্রণালি’।
যুদ্ধ বেঁধে যাওয়ার পরপরই নিজেদের কৌশলগত অবস্থান শক্ত করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই হরমুজ প্রণালিতে একতরফাভাবে নৌ-অবরোধ জারি করে তেহরান প্রশাসন। তাদের এই আকস্মিক পদক্ষেপে জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজারে এক অভূতপূর্ব ও ব্যাপক মাত্রার বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়।
এর পেছনের মূল কারণ হলো, এই সংঘাতময় পরিস্থিতির আগ পর্যন্ত সারা বিশ্বের মোট জ্বালানি পণ্যের অন্তত এক পঞ্চমাংশ অত্যন্ত সংবেদনশীল এই প্রণালিটির মাধ্যমেই পরিবহন করা হতো। বিশ্ব অর্থনীতি সচল রাখতে এই আন্তর্জাতিক জলপথের বাণিজ্যিক গুরুত্ব অপরিসীম।
এই জলপথকে কেন্দ্র করে ইরান একটি নতুন শর্ত আরোপ করেছে। তাদের দাবি হলো- যেহেতু হরমুজ প্রণালির একটি বড় অংশ সরাসরি ইরানের সার্বভৌম ভূখণ্ড ও জলসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে, তাই এখন থেকে অন্য যেকোনো দেশের বাণিজ্যিক জাহাজ বা তেলবাহী ট্যাংকার পণ্য পরিবহনের উদ্দেশ্যে এই প্রণালি ব্যবহার করতে চাইলে তাদেরকে বাধ্যতামূলকভাবে তেহরানকে নির্দিষ্ট হারে টোল বা শুল্ক প্রদান করতে হবে।
তবে ইরানের এই একতরফা শর্তের তীব্র ও প্রকাশ্য বিরোধিতা করেছে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং এমনকি মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত ইরানের অন্যান্য প্রতিবেশী দেশগুলোও। আন্তর্জাতিক মহলের মতে, এটি অবাধ নৌ-চলাচলের আন্তর্জাতিক আইনের সম্পূর্ণ পরিপন্থি।
এই তীব্র বিরোধিতার মধ্যেই গত দুই সপ্তাহ আগে হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী দুটি বড় আকারের বাণিজ্যিক ট্যাংকার জাহাজে আধুনিক ড্রোন ব্যবহার করে আকস্মিক হামলা চালায় ইরানের প্রতিরক্ষা বাহিনীর অন্যতম সুপ্রশিক্ষিত ও অভিজাত শাখা ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর’ (আইআরজিসি)। মূলত ওই প্রাণঘাতী ও ধ্বংসাত্মক ঘটনার সরাসরি জের ধরেই গত টানা ১৩ দিনের এই ভয়াবহ হামলা ও পাল্টা হামলার সূত্রপাত ঘটেছিল ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে।
সাম্প্রতিক এই দুই দিনের অঘোষিত হামলা বিরতির বিষয়ে মার্কিন প্রশাসনের অবস্থানও অনেকটা নমনীয় বলে মনে হচ্ছে। জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন প্রতিনিধি দলের অন্যতম প্রভাবশালী সদস্য মাইক ওয়াল্টজ গতকাল রোববার ফক্স নিউজ সানডে-কে দেওয়া এক গুরুত্বপূর্ণ টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন যে, শুধুমাত্র কূটনীতিকে সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার মহৎ উদ্দেশ্যেই বর্তমান হামলায় বিরতি দেওয়ার এই সময়োচিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ফক্স নিউজ সানডে-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মাইক ওয়াল্টজ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেছেন, “প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামরিক সংঘাতের চেয়েও কূটনীতিকে আরও খানিকটা বেশি সুযোগ দিতে গভীরভাবে আগ্রহী।
তিনি চান আলোচনার মাধ্যমে একটি দীর্ঘস্থায়ী ও শান্তিপূর্ণ সমাধান বেরিয়ে আসুক। আর ঠিক এ কারণেই তিনি আপাতত সামরিক হামলায় বিরতি দেওয়ার মতো একটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন।”
তার এই বক্তব্যের পর আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দুই দেশই এখন সরাসরি যুদ্ধের ময়দান থেকে সরে এসে আলোচনার টেবিলে বসার জন্য একটি উপযুক্ত ক্ষেত্র প্রস্তুত করার চেষ্টা করছে, যা বিশ্ব অর্থনীতি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য এক বিশাল স্বস্তির খবর।