মঙ্গলবার, জুলাই ২৮, ২০২৬
১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নেতানিয়াহুর ওপর চাপ বাড়াতে ট্রাম্পকে ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের চিঠি

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৮ জুলাই, ২০২৬, ০১:৩২ পিএম

নেতানিয়াহুর ওপর চাপ বাড়াতে ট্রাম্পকে ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের চিঠি
ছবি : Collected

অধিকৃত পশ্চিম তীরে ক্রমবর্ধমান ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা, অরাজকতা এবং কাঠামোগত সন্ত্রাস অবিলম্বে বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের লক্ষ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ইসরায়েলের সাবেক শীর্ষ নিরাপত্তা ও সামরিক কর্মকর্তারা।

 

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর ওপর যেন ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে জোরালো কূটনৈতিক, রাজনৈতিক ও কৌশলগত চাপ প্রয়োগ করা হয়, সেই জরুরি ও সময়োপযোগী আহ্বান জানিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছে একটি বিশেষ চিঠি প্রেরণ করা হয়েছে।

 

ইসরায়েলের নিজস্ব সামরিক, গোয়েন্দা এবং কূটনৈতিক অঙ্গনের শত শত অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তার এই বিরল ও নজিরবিহীন পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এক নতুন ও গভীর মাত্রা যোগ করেছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

 

জানা গেছে, 'কমান্ডার্স ফর ইসরায়েলস সিকিউরিটি' নামক একটি অত্যন্ত সুপরিচিত ও প্রভাবশালী সংগঠনের ব্যানারেই এই গুরুত্বপূর্ণ চিঠিটি প্রণয়ন ও প্রেরণ করা হয়েছে। এই সংগঠনটিতে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ), অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা শিন বেট, আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ, জাতীয় পুলিশ বাহিনী এবং কূটনৈতিক কোরের প্রায় ছয় শতাধিক সাবেক ও অবসরপ্রাপ্ত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা রয়েছেন, যারা একসময় রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নীতি নির্ধারণের সাথে সরাসরি যুক্ত ছিলেন।

 

মঙ্গলবার, আটাশে জুলাই, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসির হোয়াইট হাউসে ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর মধ্যে একটি পূর্বনির্ধারিত, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

 

এই তাৎপর্যপূর্ণ বৈঠকের ঠিক একদিন আগে, সোমবার, ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সাবেক ডেপুটি চিফ অব স্টাফ মাতান ভিলনাই ওই ছয় শতাধিক কর্মকর্তার পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রতিনিধি হিসেবে স্বাক্ষর করে চিঠিটি ট্রাম্পের কার্যালয়ে প্রেরণ করেন।

 

চিঠিতে ইসরায়েলি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার সাবেক এই শীর্ষ কর্তারা অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় সতর্ক করে বলেছেন যে, অধিকৃত পশ্চিম তীরে বর্তমানে যে ভয়াবহ অরাজক পরিস্থিতি ও লাগামহীন সহিংসতা চলছে, তা যদি অনতিবিলম্বে এবং অত্যন্ত কঠোর হাতে দমন করা না হয়, তবে এর চূড়ান্ত পরিণতি হবে অত্যন্ত মারাত্মক।

 

তারা গভীর আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, এই স্থানীয় পর্যায়ের সংঘাত খুব দ্রুত একটি বড় ধরনের আঞ্চলিক সংকটে রূপ নিতে পারে, যা কেবল ইসরায়েল বা ফিলিস্তিন নয়, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ভঙ্গুর স্থিতিশীলতাকেই চরম ঝুঁকির মুখে ফেলে দেবে।

 

সাবেক এই কর্মকর্তারা চিঠিতে চরম হতাশা ও ক্ষোভের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে সর্বদা অত্যন্ত সক্রিয় ও কঠোর ভূমিকা পালন করে আসলেও, তথাকথিত ‘ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের সন্ত্রাস’ দমনের ক্ষেত্রে তারা মাঠে পদে পদে নানাবিধ রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও পদ্ধতিগত বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন।

 

এই প্রাতিষ্ঠানিক বাধা ও প্রতিবন্ধকতার জন্য সরাসরি বর্তমান ইসরায়েলি সরকারের কট্টরপন্থী সদস্যদের দিকেই স্পষ্ট অভিযোগের আঙুল তুলেছেন সাবেক কর্মকর্তারা। চিঠিতে অত্যন্ত জোরালোভাবে দাবি করা হয়েছে যে, নেতানিয়াহু সরকারের অভ্যন্তরীণ বেশ কয়েকজন উগ্র ডানপন্থী নীতিনির্ধারক ও গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী আইন অমান্যকারী এই চরমপন্থী বসতি স্থাপনকারীদের একধরনের অঘোষিত ও নিরঙ্কুশ দায়মুক্তি দিয়ে রেখেছেন।

 

রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার শীর্ষ পর্যায় থেকে রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় এমন আইনি দায়মুক্তি পাওয়ার ফলেই চরমপন্থিরা নির্ভয়ে এবং বিনা দ্বিধায় ফিলিস্তিনি সাধারণ নাগরিকদের ওপর লাগাতার আক্রমণ চালানোর দুঃসাহস পাচ্ছে।

 

সাবেক কর্মকর্তাদের মতে, সরকারের এই দ্বিমুখী নীতি প্রকারান্তরে ইসরায়েলের নিজস্ব রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামোর চরম দুর্বলতাকেই উন্মোচিত করছে এবং গণতান্ত্রিক আইনের শাসনকে সম্পূর্ণরূপে ভূলুণ্ঠিত করছে।

 

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে অধিকৃত পশ্চিম তীরের মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি রীতিমতো ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ফিলিস্তিনি সাধারণ নাগরিক এবং তাদের সহায়-সম্পত্তি, কৃষিজমি, ফসল ও বাসভবনের ওপর উগ্রবাদী ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের পরিকল্পিত হামলার ঘটনা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোরও নজর কেড়েছে।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা আনাদোলু এজেন্সির প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্যমতে, বর্তমানে পূর্ব জেরুজালেমসহ অধিকৃত পশ্চিম তীরের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে প্রায় ১৫৬টি মূল বসতি এবং ৩৬০টি আউটপোস্ট বা অনুমোদনহীন ক্ষুদ্র বসতি স্থাপন করা হয়েছে।

 

এসব বসতিতে সব মিলিয়ে প্রায় সাত লাখ পঞ্চাশ হাজার ইসরায়েলি নাগরিক বসবাস করছেন। ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করে জোরপূর্বক গড়ে ওঠা এই বিশাল জনবসতি এবং তাদের ধারাবাহিক আক্রমণাত্মক কার্যকলাপ ওই অঞ্চলে একটি স্থায়ী, ন্যায্য ও টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বর্তমানে সবচেয়ে বড় অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে।

 

সব মিলিয়ে, মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছে পাঠানো ইসরায়েলি সাবেক কর্মকর্তাদের এই বিস্ফোরক চিঠিটি কেবল নেতানিয়াহু সরকারের বিতর্কিত নীতির প্রতি দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের অসন্তোষেরই বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং এটি ফিলিস্তিন ইস্যুতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও জোরালো ও বাস্তবসম্মত হস্তক্ষেপের প্রয়োজনীয়তাকেও নতুন করে বিশ্বমঞ্চে সামনে নিয়ে এসেছে।

 

এখন আন্তর্জাতিক মহলের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিবদ্ধ রয়েছে হোয়াইট হাউসের এই বহুল প্রতীক্ষিত বৈঠকের দিকে। দেখার বিষয় হলো, সাবেক নিরাপত্তা কর্তাদের এই গভীর সতর্কবার্তা ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিনির্ধারণে কতটা প্রভাব ফেলে এবং দীর্ঘদিনের মিত্র নেতানিয়াহুর প্রতি যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত কী ধরনের কঠোর বা সমন্বয়মূলক বার্তা প্রদান করে।

 

- আনাদোলু এজেন্সি