আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেহরানের এই অস্থিরতা এবং ওয়াশিংটনের গোয়েন্দা সতর্কবার্তার প্রেক্ষিতেই তেল আবিব নিজেদের সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করেছে। শনিবার ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং যুক্তরাষ্ট্রের নবনিযুক্ত জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মার্কো রুবিও টেলিফোনে এক জরুরি বৈঠকে মিলিত হন। যদিও এই ফোনালাপের বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি, তবে কূটনৈতিক সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল ইরানের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি।
এই আলোচনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয়ে নতুন করে সতর্কতা জারি করে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলোকে জানিয়েছেন, তাঁর প্রশাসন ইরানের বিক্ষুব্ধ জনতার পাশে দাঁড়াতে প্রস্তুত এবং পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে। ইরানের এই গণবিক্ষোভের মূল কারণ দেশটির ভঙ্গুর অর্থনীতি। বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনায় ইরানি রিয়াল বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম দুর্বল মুদ্রায় পরিণত হয়েছে।
খোলা বাজারে এক মার্কিন ডলারের বিপরীতে রিয়ালের মান প্রায় ১০ লাখের (৯ লাখ ৯৪ হাজার ৫৫) কাছাকাছি পৌঁছানোয় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। গত ২৮ ডিসেম্বর তেহরানের বাজারগুলোতে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও মুদ্রাস্ফীতির প্রতিবাদে ব্যবসায়ীদের ডাকা সাধারণ ধর্মঘট এখন ৩১টি প্রদেশে ছড়িয়ে পড়ে সর্বাত্মক জাতীয় আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। খাদ্য, বস্ত্র ও চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদা মেটাতে ব্যর্থ হয়ে সাধারণ মানুষ এখন রাস্তায় নেমে এসেছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ইরান সরকার কঠোর দমনপীড়নের পথ বেছে নিয়েছে। রাজধানী তেহরানসহ গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে ইন্টারনেট ও মোবাইল সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে, যাতে বিক্ষোভকারীরা সংঘবদ্ধ হতে না পারে। পুলিশ ও সাধারণ নিরাপত্তা বাহিনীর পাশাপাশি এবার মাঠে নামানো হয়েছে দেশটির প্রভাবশালী সেনাবাহিনী এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-র বিশেষ ইউনিটগুলোকে।
শনিবার রাতে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে আন্দোলনকারীদের ব্যাপক সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন নিহতের খবর পাওয়া গেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও সংঘাতময় করে তুলেছে। অন্যদিকে, গত জুন মাসে দুই দেশের মধ্যে হওয়া ১২ দিনের সরাসরি সামরিক সংঘাতের স্মৃতি এখনো অমলিন। তাই চিরশত্রু ইরানে এমন চরম অস্থিরতা চললেও ইসরায়েল এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করা থেকে বিরত রয়েছে।
‘দ্য ইকোনমিস্ট’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ‘অপেক্ষা এবং পর্যবেক্ষণ’ নীতি অনুসরণের কথাই জানিয়েছেন। তবে সীমান্তে উচ্চ সতর্কতা জারি এটাই প্রমাণ করে যে, তেহরানের এই অভ্যন্তরীণ বাত্যয় যেন কোনোভাবেই ইসরায়েলের নিরাপত্তার ওপর হুমকি হয়ে না দাঁড়ায়, সে বিষয়ে তেল আবিব বিন্দুমাত্র ঝুঁকি নিতে নারাজ। আঞ্চলিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরানের এই অভ্যন্তরীণ সংকট অদূর ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে বড় ধরণের পরিবর্তন আনতে পারে।