যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান বা ভবিষ্যৎ যেকোনো প্রশাসনের জন্য, বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য এই অঞ্চলে সামরিক আধিপত্য বিস্তারের চিন্তা এখন কেবলই এক অলীক স্বপ্ন বা দুঃস্বপ্ন হিসেবে পরিগণিত হবে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এবং সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই কঠোর ও আপসহীন অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান উত্তপ্ত পরিস্থিতিকে আরও এক ধাপ নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছে, যা বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিম এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক সামরিক ও কৌশলগত ব্যর্থতার প্রসঙ্গ টেনে মেজর জেনারেল আবদোল্লাহি দাবি করেন যে, মার্কিন নৌবাহিনী এই অঞ্চলে তাদের কার্যকারিতা এবং প্রভাব সম্পূর্ণরূপে হারিয়ে ফেলেছে।
একসময় যে মার্কিন সপ্তম নৌবহর বা যুদ্ধজাহাজগুলোর নাম শুনলে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে একধরনের ভীতির সঞ্চার হতো, আজ সেই দৃশ্যপট পুরোপুরি বদলে গেছে। ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস বা দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে যে লাগাতার দাবি করা হচ্ছে, তাকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, হাস্যকর ও মনগড়া বলে দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন ইরানের এই শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা।
তিনি ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকদের প্রতি একটি অত্যন্ত যৌক্তিক এবং তীক্ষ্ণ প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বলেন, যদি যুক্তরাষ্ট্রের দাবি অনুযায়ী ইরানের সামরিক শক্তি সত্যিই নির্মূল বা পঙ্গু হয়ে থাকে, তবে সর্বাধুনিক প্রযুক্তিতে সজ্জিত মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো এবং তাদের নৌবহর কেন বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি কিংবা ইরানের নিজস্ব জলসীমার কাছাকাছি আসার সামান্যতম সাহসও দেখাতে পারছে না?
এই প্রশ্নের মাধ্যমে তিনি মূলত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে ইরানের ক্রমবর্ধমান সামরিক শক্তি এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রচ্ছন্ন দুর্বলতার দিকটিই উন্মোচন করতে চেয়েছেন। আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সবসময়ই একটি স্পর্শকাতর ইস্যু।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন মহল থেকে ইরানের স্পর্শকাতর পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ধ্বংস করার যে প্রচ্ছন্ন হুমকি এবং দাবি উত্থাপন করা হয়েছে, তাকে সম্পূর্ণ পরস্পরবিরোধী এবং বৈশ্বিক জনমতকে বিভ্রান্ত করার একটি সুপরিকল্পিত অপচেষ্টা বলে তীব্র সমালোচনা করেছেন মেজর জেনারেল আবদোল্লাহি।
তিনি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র তাদের নিজস্ব ভূ-রাজনৈতিক ব্যর্থতা এবং মিত্র দেশগুলোর কাছে তাদের ভাবমূর্তি রক্ষার মরিয়া চেষ্টা থেকেই এ ধরনের কাল্পনিক ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করছে। তার মতে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ এবং তা আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনেই পরিচালিত হচ্ছে, তবে আত্মরক্ষার খাতিরে ইরান যেকোনো ধরনের আগ্রাসন শক্ত হাতে প্রতিহত করতে সক্ষম।
এই মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র মূলত তথ্যসন্ত্রাসের আশ্রয় নিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে একটি কৃত্রিম ভীতির আবহ তৈরি করতে চাইছে, যা বাস্তবে কোনোভাবেই সফল হবে না। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান মিত্র ইসরায়েল এবং স্বয়ং যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো আগ্রাসী তৎপরতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ইরানের যে জাতীয় ঐক্য রয়েছে, সেটির ওপরও বিশেষভাবে আলোকপাত করেছেন এই পদস্থ সামরিক কর্মকর্তা।
তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে জানান যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অব্যাহত বৈরিতা এবং ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সংগ্রাম চালিয়ে যেতে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব, দেশের আপামর সাধারণ জনগণ এবং সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিটি সদস্য আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি সুসংবদ্ধ এবং দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
কোনো ধরনের অর্থনৈতিক অবরোধ, সামরিক হুমকি বা আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগ করে ইরানের এই ইস্পাতকঠিন প্রতিরোধ স্পৃহাকে বিন্দুমাত্র টলানো যাবে না। বরং, যেকোনো বহিঃশত্রুর আক্রমণ ইরানের জনগণকে দেশপ্রেমের মন্ত্রে আরও বেশি উজ্জীবিত করবে এবং শত্রুর বিরুদ্ধে তাদের ঐক্যের প্রাচীরকে আরও সুদৃঢ় করবে।
বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে চলমান সামরিক সংঘাত এবং ভূ-কৌশলগত উত্তেজনার মধ্যে বিশ্বের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালির ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার বিষয়ে তেহরানের অনড় অবস্থানের কথা পুনরায় ব্যক্ত করেছেন মেজর জেনারেল আবদোল্লাহি।
বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের এক বিশাল অংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়, যার ফলে এই জলপথটির কৌশলগত গুরুত্ব অপরিসীম। ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনোভাবে ইরানের ওপর নৌ অবরোধ আরোপ করার বা তাদের অর্থনীতিকে পঙ্গু করার দুঃসাহস দেখায়, তবে তার পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ।
সেই ধরনের যেকোনো উসকানিমূলক পদক্ষেপের তাৎক্ষণিক ও কঠোর জবাব হিসেবে পশ্চিম এশিয়াজুড়ে ছড়িয়ে থাকা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমস্ত কৌশলগত সামরিক ঘাঁটি এবং লক্ষ্যবস্তুগুলোতে বিধ্বংসী হামলা চালানো হবে বলে তিনি খোলাখুলি সতর্কবার্তা দিয়েছেন।
ইরানের এই প্রতিরক্ষামূলক কিন্তু আক্রমণাত্মক সামরিক কৌশল মূলত যুক্তরাষ্ট্রকে এই বার্তা দিচ্ছে যে, তেহরানের বিরুদ্ধে যেকোনো হঠকারী পদক্ষেপের চড়া মূল্য দিতে হবে ওয়াশিংটনকে। দীর্ঘস্থায়ী কোনো সামরিক সংঘাতে জড়ালে তার পরিণতি কী হতে পারে, সে সম্পর্কে একটি সুদূরপ্রসারী ভূ-রাজনৈতিক পূর্বাভাস দিয়েছেন মেজর জেনারেল আবদোল্লাহি।
তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল যদি মনে করে যে ইরানের সঙ্গে একটি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে তারা জয়লাভ করবে, তবে তারা চরম মূর্খতার স্বর্গে বাস করছে। তিনি দৃঢ়ভাবে দাবি করেন যে, ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনো দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ বা সংঘাত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে এমন এক গভীর এবং অন্তহীন সামরিক ও অর্থনৈতিক সংকটে নিমজ্জিত করবে, যেখান থেকে তাদের ঘুরে দাঁড়ানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।
অতীতের বিভিন্ন রণাঙ্গনে মার্কিন বাহিনীর শোচনীয় ব্যর্থতার ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, পারস্য উপসাগরে নতুন করে কোনো সংঘাতের সূচনা হলে তা হবে ওয়াশিংটন এবং তেল আবিবের জন্য আত্মঘাতী একটি সিদ্ধান্ত, যা চূড়ান্তভাবে এই অঞ্চলে তাদের আধিপত্যের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেবে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরানের এই সর্বশেষ এবং অত্যন্ত কঠোর বিবৃতি পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে এক নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র তার হারানো আধিপত্য পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে, অন্যদিকে ইরান আঞ্চলিক পরাশক্তি হিসেবে নিজের অবস্থানকে সুসংহত করার পাশাপাশি যেকোনো বিদেশি হস্তক্ষেপকে সমূলে উৎপাটন করার সংকল্প ব্যক্ত করছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প বা মার্কিন প্রশাসনের যেকোনো পদক্ষেপের ওপর এখন নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতা। তবে একটি বিষয় অত্যন্ত পরিষ্কার যে, পারস্য উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অঞ্চলে ইরানের সামরিক সতর্কতা এবং প্রস্তুতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে বিনা চ্যালেঞ্জে কোনো মার্কিন তৎপরতা আর সম্ভব নয়।
এখন দেখার বিষয়, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং পরাশক্তিগুলো এই উত্তেজনা প্রশমনে কূটনীতির পথে হাঁটে, নাকি পারস্য উপসাগরের এই নীল জলরাশি আবারও কোনো ভয়াবহ ভূ-রাজনৈতিক ঝড়ের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।