এই প্রক্রিয়ার আওতায় সাহসী ব্যক্তিদের নির্দিষ্ট রাতের জন্য নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, যাদের মূল কাজ হলো ওই সন্দেহভাজন বাড়িগুলোতে এক রাত অবস্থান করা। আর এই দুঃসাহসিক কাজের পারিশ্রমিক হিসেবে তাদের প্রদান করা হচ্ছে মোটা অঙ্কের অর্থ।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, মাত্র এক রাত এমন বাড়িতে কাটানোর বিনিময়ে কর্মীরা পাচ্ছেন ৮৮ হাজার জাপানি ইয়েন, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৬৬ হাজার টাকার সমতুল্য। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক বিশেষ প্রতিবেদনে জাপানের আবাসন খাতের এই চমকপ্রদ তথ্যটি সম্প্রতি তুলে ধরা হয়েছে।
জাপানের সমাজে ও আবাসন শিল্পে এ ধরনের সুনির্দিষ্ট ইতিহাস থাকা বাড়িগুলোকে মূলত 'জিকো বুক্কেন' বলে আখ্যায়িত করা হয়। সাধারণত যেসব বাসগৃহে অতীতে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ও মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে, যেমন-হত্যা, আত্মহত্যা, অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানি কিংবা কোনো বৃদ্ধ বা নিঃসঙ্গ ব্যক্তির একাকী মৃত্যুর মতো বিয়োগান্তক ঘটনা, সেগুলোই এই বিশেষ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত হয়।
জাপানের আবাসন খাতের আইন অত্যন্ত কঠোর এবং স্বচ্ছতার ওপর নির্ভরশীল। এই আইন অনুযায়ী, কোনো বাড়ি বিক্রি বা ভাড়া দেওয়ার সময় আবাসন এজেন্টদের জন্য ওই সম্পত্তির অতীত ইতিহাস, বিশেষ করে কোনো অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা থাকলে তা সম্ভাব্য ক্রেতা বা ভাড়াটেদের কাছে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা আইনিভাবে বাধ্যতামূলক।
এই বাধ্যবাধকতার কারণে, ইতিহাস জানার পর মনস্তাত্ত্বিক ভীতি ও সংস্কারের বশবর্তী হয়ে অনেকেই এসব বাড়িতে বসবাস করতে বা তা ক্রয় করতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন। ফলে চমৎকার স্থাপত্যশৈলী ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থাকা সত্ত্বেও অসংখ্য বাড়ি মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর ধরে সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে।
দীর্ঘদিন ধরে খালি পড়ে থাকা এসব সম্পত্তির কারণে বাড়ির মালিক এবং আবাসন ব্যবসায়ীদের বিপুল আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। এই অব্যাহত লোকসানের ধারা কাটিয়ে উঠতে এবং ক্রেতাদের মনে জমে থাকা অতিপ্রাকৃত ভীতি দূর করতেই তারা এই সৃজনশীল পেশার উদ্ভব ঘটিয়েছেন।
তারা বিশ্বাস করেন, কোনো সুস্থ ও স্বাভাবিক মানুষ যদি ওই বাড়িতে নিরাপদে রাত কাটিয়ে আসতে পারেন, তবে তা সম্ভাব্য ক্রেতাদের কাছে একটি ইতিবাচক বার্তা পৌঁছাবে। তবে অর্থের বিনিময়ে যারা এই তথাকথিত ভৌতিক বাড়িগুলোতে রাত কাটাতে আসেন, তাদের কাজটা কেবল আরাম করে ঘুমিয়ে রাত পার করা নয়।
চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, তাদের সারা রাত সম্পূর্ণ সজাগ থাকতে হয়। বিভিন্ন অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, সংবেদনশীল ক্যামেরা এবং অন্যান্য পর্যবেক্ষণ যন্ত্রপাতির সাহায্যে পুরো বাড়ির পরিবেশ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হয়।
রাতের দীর্ঘ প্রহর শেষে যদি সত্যিই কোনো অতিপ্রাকৃত বা অস্বাভাবিক ঘটনার প্রমাণ না পাওয়া যায়, তবে নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা ওই বাড়িটিকে সম্পূর্ণ 'ভূতমুক্ত' বা নিরাপদ ঘোষণা করে একটি আনুষ্ঠানিক প্রশংসাপত্র বা ছাড়পত্র প্রদান করেন। এই ছাড়পত্রই পরবর্তীতে নতুন ক্রেতাদের মনে আস্থা ফেরাতে সাহায্য করে।
বর্তমান জাপানে এই ধরনের বিশেষায়িত সেবার চাহিদা জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর পেছনে কেবল অতিপ্রাকৃত ভীতিই একমাত্র কারণ নয়, বরং দেশটির গভীর জনতাত্ত্বিক সংকটও এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। জাপান বর্তমানে মারাত্মকভাবে বয়স্ক জনসংখ্যার আধিক্য এবং জন্মহার হ্রাসের মতো জাতীয় সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
তরুণ প্রজন্মের একটি বিশাল অংশ উন্নত জীবনযাপন ও কর্মসংস্থানের সন্ধানে প্রত্যন্ত অঞ্চল ছেড়ে রাজধানী ও বড় শহরমুখী হচ্ছে। ফলশ্রুতিতে, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে, বিশেষ করে গ্রামীণ ও শহরতলি এলাকাগুলোতে লাখ লাখ বসতবাড়ি দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকছে।
এই পরিত্যক্ত বাড়িগুলোর একটি উল্লেখযোগ্য অংশই হলো সেইসব বাড়ি, যেখানে নিঃসঙ্গ বৃদ্ধরা একাকী মৃত্যুবরণ করেছেন। এই সামাজিক বাস্তবতার কারণেই 'জিকো বুক্কেন'-এর সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে এবং সেই সঙ্গে বাড়ছে এই ভয় তাড়ানোর অভিনব পেশার কদর।
আন্তর্জাতিক আবাসন বিশেষজ্ঞ ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, জাপানে আত্মপ্রকাশ করা এই নতুন পেশার মূল উদ্দেশ্য কেবল বিনোদন বা চমক সৃষ্টি করা নয়, বরং এর গভীরে রয়েছে একটি সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক লক্ষ্য।
মানুষের অবচেতন মনে থাকা অমূলক ভীতি ও মনস্তাত্ত্বিক বাধা দূর করে দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত ও পরিত্যক্ত সম্পত্তিগুলোকে পুনরায় ব্যবহারযোগ্য করে তোলাই এর প্রধান কাজ। এর ফলে একদিকে যেমন সম্পত্তির মালিকরা তাদের আর্থিক ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারছেন এবং ক্রেতা খুঁজে পাচ্ছেন, অন্যদিকে দেশের আবাসন খাতও স্থবিরতা থেকে মুক্তি পাচ্ছে।
আধুনিক আবাসন ব্যবসার কৌশল এবং লোককথার ভূত অনুসন্ধানের রোমাঞ্চকর ধারণাকে একীভূত করে সৃষ্ট এই পেশাটি বর্তমানে জাপানের কর্মসংস্থানের বাজারে সবচেয়ে ব্যতিক্রমী, লাভজনক এবং বহুল আলোচিত একটি বিশেষায়িত পেশা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের কাছেও এটি এখন একটি বিস্ময়কর উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।