রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) প্রকাশিত এক তাৎপর্যপূর্ণ ভিডিও বার্তায় তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, এই পদত্যাগ কোনো চূড়ান্ত পরিণতি নয়, বরং এটি একটি দীর্ঘ সংগ্রামের কেবলই শুরু। দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনতে এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে তাদের এখনও অনেক দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া বাকি রয়েছে।
ভারতের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক বিস্তারিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বহুল আলোচিত মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষার (নিট) প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো ভয়াবহ কেলেঙ্কারির ঘটনায় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ এবং সরকারের পক্ষ থেকে আন্দোলনকারীদের অন্যান্য যৌক্তিক দাবি মেনে নেওয়ার পর ককরোচ পার্টির প্রধান আপাতত কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন।
দেশব্যাপী গড়ে ওঠা এই বিশাল ছাত্র-আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া ৩০ বছর বয়সী এই তরুণ নেতা বর্তমানে তার প্রাপ্ত বিশ্রামের মুহূর্তগুলোকে পূর্ণমাত্রায় উপভোগ করার চেষ্টা করছেন। দীর্ঘ এক মাসের বেশি সময় ধরে চলা মানসিক ও শারীরিক চাপের পর তার এই স্বস্তি অত্যন্ত স্বাভাবিক।
ভিডিও বার্তায় নিজের অনুভূতির কথা প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি সাবলীলভাবে বলেন, এখন আর তাকে আগামীকাল কী করতে হবে বা সন্ধ্যা পর্যন্ত নতুন কী ঘটবে, সেসব নিয়ে কোনো দুশ্চিন্তা করতে হয় না। কোনো রকম চাপ ছাড়াই তিনি এখন রাতে শান্তিতে ঘুমাতে যেতে পারছেন এবং নিজের পরিচিত শোবার ঘরে নিশ্চিন্তে ঘুম থেকে জেগে উঠতে পারছেন।
রোববার সকালে প্রকাশিত ওই ভিডিও বার্তায় অভিজিৎ দিপকে আরও জানান, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এখন আর তার মনে কোনো গভীর উৎকণ্ঠা অবশিষ্ট নেই। তবে আন্দোলনের বিগত ৩৭ দিনের টানা সংগ্রামকে তিনি তার জীবনের 'সত্যিই অত্যন্ত কঠিন' ও চ্যালেঞ্জিং একটি অধ্যায় হিসেবে অভিহিত করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার অগণিত অনুসারীদের অতীতের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, এই প্রাথমিক বিজয় তাদের লক্ষ্য অর্জনের একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। বৈষম্যহীন সমাজ গড়তে ককরোচ জনতা পার্টিকে সামনের দিনগুলোতে আরও বড় বাধা অতিক্রম করতে হবে।
উল্লেখ্য, ভারতের প্রধান বিচারপতির করা একটি মন্তব্যের ব্যঙ্গাত্মক ও প্রতিবাদী জবাব হিসেবে গত মে মাসে দিপকে এই 'সিজিপি' নামক রাজনৈতিক মঞ্চটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। প্রতিষ্ঠার পর পরবর্তী মাত্র ৭০ দিনের স্বল্প সময়ের ব্যবধানে এই উদ্যোগটি দেশটির জেন-জি বা নতুন প্রজন্মের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও শক্তিকে এক সুতোয় গেঁথে একটি সর্বাত্মক গণআন্দোলনে রূপান্তর করতে সক্ষম হয়।
এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই হাজার হাজার তরুণ ও বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী, যারা নিজেদের গর্বের সঙ্গে 'ককরোচ' বা সিজিপির সমর্থক বলে পরিচয় দিয়ে থাকেন, তারা ভারতের রাজধানীর ক্ষমতার অন্যতম প্রাণকেন্দ্র দখল করে নেন।
পার্লামেন্ট ভবন ও সরকারের প্রশাসনিক কেন্দ্রগুলোর সন্নিকটে অবস্থিত ঐতিহাসিক আন্দোলনস্থল 'যন্তর মন্তর' প্রতিদিন হাজার হাজার তরুণের পদচারণা এবং তাদের বজ্রকণ্ঠের 'ইনকিলাব' স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে।
শিক্ষার্থী এবং তরুণ আন্দোলনকারী সমাজ জোরালোভাবে নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং এর ফলে হতাশ হয়ে চাকরিপ্রার্থীর আত্মহত্যার মতো মর্মান্তিক ঘটনাগুলোর জন্য সরাসরি শিক্ষামন্ত্রীর ব্যর্থতাকে দায়ী করেন। তারা নৈতিক দায়ভার গ্রহণ করে অবিলম্বে তার পদত্যাগের দাবিতে সরকারের ওপর অব্যাহত চাপ সৃষ্টি করতে থাকেন।
শুরুতে সরকার কিছুটা গড়িমসি করলেও, প্রতি মুহূর্তে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নতুন সমর্থক ককরোচদের এই ন্যায়সংগত আন্দোলনে যোগ দিতে শুরু করলে পরিস্থিতি অভাবনীয় রূপ নেয়। এহেন শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির মাঝেই শনিবার দেশটির শিক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে নিজের পদত্যাগের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিতে বাধ্য হন ধর্মেন্দ্র প্রধান।
একই সঙ্গে সরকার আন্দোলনকারীদের আশ্বস্ত করে প্রতিশ্রুতি দেয় যে, এই গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী কোনো শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক বা হয়রানিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না। সরকারের এই লিখিত প্রতিশ্রুতির পরই সিজিপি তাদের রাজপথের আন্দোলন সাময়িকভাবে প্রত্যাহার করে নেয়।
তবে, বিজয়ের এই পথটি মোটেও মসৃণ বা সহজ ছিল না বলে নিজের রোববারের ভিডিও বার্তায় দেশবাসীকে পুনরায় স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন দিপকে। প্রথম দিকে সমাজের অনেক বিশিষ্টজন এই তরুণদের সক্ষমতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন।
তবে যারা সব বাধা উপেক্ষা করে শুরু থেকেই সিজিপিকে নিঃশর্ত সমর্থন জুগিয়েছেন, তাদের সবার প্রতি তিনি গভীর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন। শারীরিকভাবে টাইফয়েডে আক্রান্ত হওয়া এবং প্রচণ্ড জ্বর থাকার কারণে শনিবার বিজয়ের দিন যন্তর মন্তরে উপস্থিত হয়ে সবাইকে ব্যক্তিগতভাবে ধন্যবাদ জানাতে না পারার জন্য তিনি আন্তরিকভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন।
দেশটির এই তরুণ আন্দোলনকর্মী তার ভিডিও বার্তার শেষাংশে আবেগপ্রবণ হয়ে বলেন, যারা রোদ ও বৃষ্টি উপেক্ষা করে দীর্ঘ ৩৭ দিন ধরে যন্তর মন্তরে বিনিদ্র অপেক্ষা করছিলেন, তাদের প্রত্যেককে তিনি আলাদাভাবে ধন্যবাদ জানাতে চান।
তিনি বলেন, দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে দুর্নীতিমুক্ত করতে এই তরুণরা যা করেছেন, তা তিনি সত্যিই অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে অনেক বেশি সম্মান করেন। পাশাপাশি, শুধু সমর্থকদেরই নয়, যারা বিভিন্ন সময়ে তাদের সমালোচনা করেছেন, তাদের প্রতিও তিনি সমানভাবে ধন্যবাদ ও সম্মান জ্ঞাপন করেছেন।
দিপকে অত্যন্ত পরিপক্বতার সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, সমালোচকদের গঠনমূলক সমালোচনা এবং তীক্ষ্ণ প্রশ্নগুলোর মাধ্যমেই তিনি নিজের ও দলের ভুলত্রুটিগুলো সময়মতো শুধরে নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, সেই আত্মসমালোচনার সুযোগ ছিল বলেই আজ তারা নিজেদের কাঙ্ক্ষিত এই অভাবনীয় সাফল্যটি অর্জন করতে পেরেছেন।