বিভিন্ন রাজ্যে মন্দির-মসজিদ বিতর্ক এবং ধর্মীয় বিভাজনের যে পরিবেশ তৈরি হয়েছে, তার সুস্পষ্ট প্রভাব এবার এসে পড়েছে এই প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাটির ওপর। হিন্দুত্ববাদী বিভিন্ন সংগঠনের জোরালো দাবি, এই ঐতিহাসিক আদিনা মসজিদটি আদতে আদিনাথের একটি প্রাচীন শিবমন্দির ছিল।
আর এই দাবির ওপর ভিত্তি করেই স্থাপনাটির একেবারে সন্নিকটে, মাত্র পঞ্চাশ মিটার দূরত্বের মধ্যে একটি শিবলিঙ্গ স্থাপন, বিশেষ শিবপূজা এবং মহাদেবের পবিত্র মন্ত্রপাঠ সহকারে জল ও পঞ্চামৃত দিয়ে রুদ্রাভিষেকের মতো ধর্মীয় আচারের আয়োজন করা হয়েছে, যা সচেতন মহলে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
ইতিহাস ও ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগের সংরক্ষিত তথ্য অনুযায়ী, ১৩৭৩ খ্রিস্টাব্দে স্বাধীন সুলতান সিকান্দর শাহ এই সুবিশাল ও দৃষ্টিনন্দন আদিনা মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন। তবে দীর্ঘকাল ধরেই একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর দাবি, স্থাপনাটির বিভিন্ন স্থাপত্যশৈলী, কারুকাজ, ব্যাসল্ট পাথরের মজবুত দেয়াল এবং দরজায় হিন্দু দেবদেবী, বিশেষ করে শিব ও দুর্গার খোদাই করা চিত্রাবলি স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা এবং আদিনাথ শিব মন্দির ও মেলা কমিটির অন্যতম উদ্যোক্তা কাজল গোস্বামীর তরফ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, ইতিপূর্বে প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্য পরিচালনার সময়ও এখান থেকে হিন্দু দেবদেবীর নানা মূর্তি উদ্ধার করা হয়েছিল।
তাদের দাবি, একটি প্রাচীন শিবমন্দিরকে ধ্বংস করেই পরবর্তীতে এই কাঠামোর ওপর মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছিল। অন্যদিকে, প্রথিতযশা স্থাপত্য ইতিহাসবিদ ও গবেষকরা এই বিষয়টিকে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করেছেন।
তাদের মতে, মধ্যযুগীয় নির্মাণশৈলীতে পূর্ববর্তী কাঠামোর নানা উপকরণ ও পাথর পুনঃব্যবহার করার একটি অত্যন্ত সাধারণ রীতি সে যুগে প্রচলিত ছিল। আদিনা মসজিদের ক্ষেত্রেও ইসলামি স্থাপত্য ও স্থানীয় দেশীয় মন্দির নির্মাণ রীতির এক অপূর্ব ও বিরল সংশ্লেষণ ঘটেছে, যা তৎকালীন সমন্বয়বাদী নির্মাণরীতিরই একটি ঐতিহাসিক দলিল।
তবে এই পুনঃব্যবহৃত উপকরণগুলোর সঠিক উৎস কী ছিল, তা নিয়ে ইতিহাসবিদ এবং স্থানীয় দাবিদার গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে বিতর্ক আজও অব্যাহত রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার গুরুত্বপূর্ণ বর্ষাকালীন অধিবেশনে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বিধায়ক তরুণজ্যোতি তেওয়ারি আদিনা মসজিদকে আদিনাথ মন্দির হিসেবে প্রকাশ্য অধিবেশনে দাবি করলে বিতর্কটি রাজনৈতিক ময়দানে নতুন মাত্রা পায়।
ভারতের চলমান রাজনীতিতে ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে পরস্পরবিরোধী এই ধরনের বয়ান সাধারণ জনমতকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে চলেছে। আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা দীর্ঘদিন ধরে প্রাচীন এই মন্দিরটি পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিতে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন চালিয়ে আসছেন।
তবে বর্তমানে তারা আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল। সেই কারণে এ বছর ধর্মীয় মূল আচার-অনুষ্ঠানটি মসজিদের নিকটবর্তী অপর একটি মন্দিরেই সীমাবদ্ধ রাখা হচ্ছে এবং স্মৃতিস্তম্ভটির ওপর যেকোনো দাবি তারা বিচারিক হস্তপেক্ষের মাধ্যমেই সমাধান করতে চান।
তারা আশা প্রকাশ করেছেন যে, আদালতের মাধ্যমে আইনি লড়াইয়ে জয়ী হয়ে ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট স্থানেই তারা শিবলিঙ্গ স্থাপন করতে সক্ষম হবেন। এছাড়া সমগ্র বিষয়টি নিয়ে তারা সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাতেরও একটি বিশদ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন।
পরিস্থিতির সংবেদনশীলতা ও রাজনৈতিক উত্তাপ অনুধাবন করে মালদা জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন অত্যন্ত সতর্ক ও কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মসজিদ প্রাঙ্গণে এই ধরনের ধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজনের খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার পরপরই স্থানীয় পুলিশের পক্ষ থেকে তড়িঘড়ি করে একটি বিশেষ জনবিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়।
ওই সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে সর্বসাধারণকে স্পষ্টভাবে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, আদিনা মসজিদ ১৯৫৮ সালের প্রাচীন স্মৃতিস্তম্ভ এবং প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান ও ধ্বংসাবশেষ আইনের অধীনে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত একটি জাতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান।
প্রশাসনের তরফ থেকে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলা হয়েছে, কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি ছাড়া এই সুরক্ষিত কাঠামোতে কোনো ধরনের ধর্মীয় কার্যকলাপ পরিচালনা করা বা এর কাঠামোগত পরিবর্তনের বিন্দুমাত্র চেষ্টা করা হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ও দৃষ্টান্তমূলক কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
যেহেতু আদিনা মসজিদের ঐতিহাসিক পরিচয় ও মূল মালিকানা সংক্রান্ত অত্যন্ত স্পর্শকাতর এই মামলাটি বর্তমানে ভারতের উচ্চ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে, তাই চূড়ান্ত আইনি রায় বা নির্দেশিকা না আসা পর্যন্ত প্রশাসন সেখানে সর্বোচ্চ স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা মোতায়েন করেছে। ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব, ধর্ম ও রাজনীতির এই জটিল আবর্তে শতবর্ষী আদিনা মসজিদ বর্তমানে দেশের অন্যতম আলোচিত এক বিতর্কিত কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।