এই ন্যক্কারজনক ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে স্থানীয় এক চিকিৎসককে গ্রেফতার করেছে বেঙ্গালুরু পুলিশ। অভিযুক্ত ওই চিকিৎসকের দাবি, আক্রান্ত দম্পতি অবৈধভাবে ভারতে বসবাস করছিলেন এবং এর আগে তাদের ভারত থেকে আইনি প্রক্রিয়ায় বিতাড়িত করা হয়েছিল।
তবে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এই ঘটনাটি স্থানীয় মানবাধিকার ও নাগরিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। ভারতীয় গণমাধ্যম ‘দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর প্রতিবেদনের ভিত্তিতে জানা গেছে, গত ২২ জুলাই, বুধবার সকালে বেঙ্গালুরুর রাস্তায় এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি ঘটে। ঘটনার পরদিন অর্থাৎ বৃহস্পতিবার পুলিশ অভিযুক্ত ওই চিকিৎসককে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত ও তথ্যানুযায়ী, অভিযুক্ত ব্যক্তির নাম ডা. নগেন্দ্রাপ্পা। বেঙ্গালুরু শহরে তার নিজস্ব একটি চিকিৎসাকেন্দ্র বা ক্লিনিক রয়েছে। পেশায় একজন চিকিৎসক হয়েও তিনি যেভাবে সাধারণ নাগরিকের ওপর চড়াও হয়েছেন, তা সচেতন মহলকে হতবাক করেছে।
ভুক্তভোগী ওই গৃহবধূর নাম নাসরিনা, যার বয়স ২৩ বছর। তিনি এবং তার স্বামী মোহাম্মদ বিলাল বুধবার সকালে নিজেদের গন্তব্যে যাওয়ার পথে ডা. নগেন্দ্রাপ্পার রোষানলের শিকার হন। পুলিশের কাছে দায়ের করা নাসরিনার লিখিত অভিযোগ থেকে জানা যায়, অভিযুক্ত চিকিৎসক সম্পূর্ণ অযাচিতভাবে মাঝরাস্তায় তাদের পথরোধ করেন।
এরপর কোনো ধরনের উসকানি ছাড়াই তিনি তাদের জাতীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং অত্যন্ত অশালীন ভাষায় হিন্দিতে গালিগালাজ করতে শুরু করেন। একপর্যায়ে পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করে। ডা. নগেন্দ্রাপ্পা নাসরিনাকে জনসমক্ষে টেনেহিঁচড়ে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন।
স্ত্রীর ওপর এমন আচরণের প্রতিবাদ করতে গেলে চিকিৎসক তখন মোহাম্মদ বিলালের ওপরও পাশবিক কায়দায় চড়াও হন। বিলালের মাথা ও পিঠে উপর্যুপরি আঘাত করা হয়। মারধরের একপর্যায়ে বিলালকে রাস্তায় মাটিতে ফেলে নির্মমভাবে লাথি মারতে থাকেন ওই চিকিৎসক।
এমনকি এই ভয়াবহ ঘটনার বিষয়ে পুলিশের কাছে কোনো ধরনের অভিযোগ জানালে তাদেরকে প্রাণে মেরে ফেলার প্রকাশ্য হুমকিও দেওয়া হয় বলে নাসরিনা তার অভিযোগে বিস্তারিত উল্লেখ করেছেন।
এই ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা দ্রুত ভাইরাল হয় এবং ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। জানা গেছে, পুলিশ কর্তৃক গ্রেফতার হওয়ার ঠিক কিছুক্ষণ আগে অভিযুক্ত ডা. নগেন্দ্রাপ্পা নিজেই তার ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট থেকে ওই ঘটনার একটি ভিডিও পোস্ট করেছিলেন।
সেই ভিডিওতে তাকে অত্যন্ত উত্তেজিত অবস্থায় ওই দম্পতিকে ‘বাংলাদেশি’ হিসেবে বারবার অভিযুক্ত করতে শোনা যায়। তিনি সেখানে জোর দিয়ে দাবি করেন যে, এই দম্পতিকে এর আগে অবৈধ অভিবাসী হিসেবে ভারত থেকে বিতাড়িত করা হয়েছিল, কিন্তু তারা বেআইনিভাবে আবারও ভারতের ভূখণ্ডে ফিরে এসেছে।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ওই ভিডিওটি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে ঘটনার একটি ভিন্ন চিত্রও সামনে আসে। ভিডিওতে দেখা যায়, অভিযুক্ত চিকিৎসক যখন মোহাম্মদ বিলালের গায়ে হাত তুলছেন এবং তাকে মারধর করছেন, তখন বিলাল অত্যন্ত সাবলীলভাবে স্থানীয় কন্নড় ভাষায় তার কথার জবাব দিচ্ছেন।
বিলাল দৃঢ়তার সঙ্গে চিকিৎসকের অভিযোগ অস্বীকার করে কন্নড় ভাষায় জানান যে, তিনি কোনো অবৈধ অভিবাসী নন, বরং তিনি বিগত ২০ বছর ধরে এই বেঙ্গালুরু শহরেই স্থায়ীভাবে বসবাস করে আসছেন। এই বিষয়টি প্রমাণ করে যে, নিছক সন্দেহের বশবর্তী হয়ে এবং ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে এই হামলার ঘটনা ঘটানো হয়ে থাকতে পারে।
বেঙ্গালুরুর বেলান্দুর থানা-পুলিশ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে এই ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে। পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন তদন্তকারী কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, তারা ঘটনার সব দিক খতিয়ে দেখছেন। ইতোমধ্যে বেলান্দুর থানায় ওই অভিযুক্ত চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির একাধিক ধারায় একটি সুনির্দিষ্ট ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে-বিনা প্ররোচনায় শারীরিক মারধর, নারীর শ্লীলতাহানি ও সম্মানহানি, বেআইনিভাবে সাধারণ মানুষের পথরোধ করা এবং অপরাধমূলক ভীতি প্রদর্শন বা হত্যার হুমকি দেওয়া।
অন্যদিকে, অভিযুক্ত চিকিৎসকের করা দাবির প্রেক্ষিতে তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে, ভুক্তভোগী ওই দম্পতির প্রকৃত জাতীয়তা এবং অভিবাসন-সংক্রান্ত যাবতীয় নথিপত্রের সত্যতা যাচাই করে দেখা হচ্ছে। তদন্ত শেষ হলেই এই বিষয়ে চূড়ান্ত আইনি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্ভব হবে।
সর্বশেষ প্রাপ্ত আইনি তথ্য অনুযায়ী, গ্রেফতারের পর আইনি প্রক্রিয়া শেষে শুক্রবার অভিযুক্ত ডা. নগেন্দ্রাপ্পা আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। তবে এই ঘটনাটি গণতান্ত্রিক সমাজে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া এবং নিছক সন্দেহের বশে প্রান্তিক মানুষের ওপর হামলার যে একটি বিপজ্জনক প্রবণতা তৈরি হয়েছে, তার একটি জ্বলন্ত উদাহরণ হিসেবে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর নজরে এসেছে।