রবিবার, জুলাই ২৬, ২০২৬
১১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিজেপিকে ক্ষমতাচ্যুত করতে সমাজবাদী পার্টিকে জোটের প্রস্তাব ওয়াইসির

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৬ জুলাই, ২০২৬, ০৮:৪৯ পিএম

বিজেপিকে ক্ষমতাচ্যুত করতে সমাজবাদী পার্টিকে জোটের প্রস্তাব ওয়াইসির
ছবি : Collected

ভারতের রাজনীতিতে উত্তর প্রদেশ সবসময়ই একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করে থাকে। ২০২৭ সালের আসন্ন উত্তর প্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক মেরুকরণ, কৌশল নির্ধারণ এবং নতুন সমীকরণ তৈরির প্রক্রিয়া এখনই শুরু হয়ে গেছে।

 

এই তুমুল রাজনৈতিক ডামাডোলের মধ্যে, ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপিকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্যে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্য গড়ার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিন (এআইএমআইএম) প্রধান এবং হায়দরাবাদের প্রবীণ সংসদ সদস্য আসাদউদ্দিন ওয়াইসি।

 

তিনি রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল সমাজবাদী পার্টির প্রধান ও সাবেক মুখ্যমন্ত্রী আখিলেশ যাদবকে সরাসরি জোট গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন। উত্তর প্রদেশের মতো একটি বৃহৎ ও রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল রাজ্যে ওয়াইসির এই নতুন রাজনৈতিক চাল আগামী নির্বাচনগুলোতে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

 

সম্প্রতি উত্তর প্রদেশের মোরাদাবাদে আয়োজিত একটি বিশাল জনসভায় উপস্থিত কর্মী-সমর্থকদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখতে গিয়ে আসাদউদ্দিন ওয়াইসি জোটবদ্ধ রাজনীতির এই স্পষ্ট বার্তা প্রদান করেন।

 

বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার যেন কোনোভাবেই আগামী বিধানসভা নির্বাচনে পুনরায় বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসতে না পারে, ঠিক সেই লক্ষ্যেই তিনি বিরোধী দলগুলোকে সকল ভেদাভেদ ভুলে এক ছাতার নিচে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।

 

জনসভায় ওয়াইসি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন যে, তিনি সমাজবাদী পার্টির সঙ্গে শর্তসাপেক্ষে হাত মেলাতে এবং একটি সুদৃঢ় রাজনৈতিক জোট গঠন করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছেন। রাজনৈতিক দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়ে তিনি জোরালোভাবে উল্লেখ করেন যে, নির্বাচন শেষ হওয়ার পর ভোট বিভাজনের কারণে পরাজিত হয়ে আফসোস করার চেয়ে, এখনই সঠিক সময়ে আলোচনার টেবিলে বসা এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণ করা সবচেয়ে বেশি জরুরি।

 

তার মতে, এখনই সময় ঐক্যবদ্ধ হয়ে ময়দানে নামার। দীর্ঘদিন ধরে ভারতের রাজনৈতিক মহলে, বিশেষ করে উত্তর প্রদেশে প্রায়শই এমন একটি গুরুতর অভিযোগ শোনা যায় যে, আসাদউদ্দিন ওয়াইসির দল নির্বাচনে অংশ নিলে মূলত ধর্মনিরপেক্ষ বিরোধী দলগুলোরই ভোট বিভাজন ঘটে, যার প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক সুবিধা খুব সহজেই পেয়ে যায় ক্ষমতাসীন বিজেপি।

 

এই বহুল প্রচলিত অভিযোগের সরাসরি ও কড়া জবাব দিয়ে ওয়াইসি সমাজবাদী পার্টির উদ্দেশ্যে বলেন যে, তারা যদি সত্যি মনে করেন এআইএমআইএমের একাকী নির্বাচনে অংশগ্রহণের কারণে তাদের রাজনৈতিক ও ভোটের সমীকরণে ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে, তবে সেই ক্ষতি এড়াতে তিনি তাদের সঙ্গেই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাজনৈতিক লড়াই করতে পুরোপুরি প্রস্তুত।

 

তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় দেশবাসীকে জানান যে, তার দলের রাজনৈতিক লড়াই কখনোই কোনো বিশেষ ধর্মের বা সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে নয়। বরং তাদের এই দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক সংগ্রাম হলো সমাজের পিছিয়ে পড়া, অবহেলিত ও প্রান্তিক মানুষের সম্মান, ন্যায্য অধিকার এবং ন্যায়বিচার আদায়ের জন্য।

 

সমাজে কোনো ধরনের বিভাজন বা বৈষম্য নয়, বরং পূর্ণাঙ্গ সমতা প্রতিষ্ঠাই তার দলের মূল আদর্শিক দর্শন বলে তিনি দাবি করেন। একই সঙ্গে তিনি আখিলেশ যাদবকে উন্মুক্ত আলোচনার আমন্ত্রণ জানিয়ে বলেন, সমাজবাদী পার্টির প্রধান যদি সদিচ্ছা নিয়ে সামনে এসে বসেন, তবে তিনি তার সঙ্গে বঞ্চিত মানুষের মৌলিক অধিকার ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা করতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করবেন না।

 

অন্যদিকে, আসাদউদ্দিন ওয়াইসির এই প্রকাশ্য জোট প্রস্তাবের তীব্র সমালোচনা করে অত্যন্ত দ্রুত রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে রাজ্যের ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। দলটির কেন্দ্রীয় মুখপাত্র শেহজাদ পুনাওয়ালা ওয়াইসির এই ঐক্যের প্রস্তাবকে নিছক ভোটব্যাংকের রাজনীতির সহযোগিতা বলে তীব্র কটাক্ষ করেছেন।

 

তার মতে, বিরোধী দল সমাজবাদী পার্টি এবং এআইএমআইএম-উভয় রাজনৈতিক দলই দীর্ঘদিন ধরে উত্তর প্রদেশের রাজনীতিতে কেবলমাত্র সংখ্যালঘু তুষ্টিকরণের রাজনীতি চর্চা করে আসছে। পুনাওয়ালা অত্যন্ত ব্যঙ্গাত্মক সুরে বলেন যে, আখিলেশ যাদব এবং আসাদউদ্দিন ওয়াইসি এতদিন ধরে উত্তর প্রদেশের রাজনৈতিক ময়দানে কে সবচেয়ে বড় নেতা বা সংখ্যালঘুদের একক প্রতিনিধি হবেন, সেই অঘোষিত ও তীব্র প্রতিযোগিতায় লিপ্ত ছিলেন।

 

কিন্তু বর্তমানে নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে তারা সেই পুরোনো প্রতিযোগিতা সাময়িকভাবে ভুলে গিয়ে এখন পরস্পরের সঙ্গে রাজনৈতিক সহযোগিতা করতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন।

 

এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে আধুনিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পরিভাষায় কটাক্ষ করে বিজেপি মুখপাত্র বলেন যে, ওয়াইসি মূলত তার রাজনৈতিক স্বার্থ উদ্ধারের জন্যই আখিলেশ যাদবকে একটি রাজনৈতিক বন্ধুত্বের প্রস্তাব পাঠিয়েছেন।

 

তার জোরালো দাবি, মতাদর্শগত ও রাজনৈতিক আচরণের দিক থেকে ওয়াইসি এবং আখিলেশ যাদব মূলত একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ, যাদের মূল লক্ষ্য কেবল ক্ষমতার মসনদ দখল করা। ২০২৭ সালে অনুষ্ঠিতব্য উত্তর প্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনটি ভারতের সমগ্র জাতীয় রাজনীতির প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি ঘটনা।

 

ঐতিহাসিকভাবেই ভারতের লোকসভা নির্বাচনে দিল্লির মসনদ দখলে উত্তর প্রদেশের ফলাফল একটি চূড়ান্ত ও নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করে থাকে। তাই পরবর্তী লোকসভা নির্বাচনের আগে এই রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনকে জাতীয় ও আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোর জনপ্রিয়তা ও শক্তির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

 

বর্তমানে উত্তর প্রদেশের বিধানসভায় সমাজবাদী পার্টিই হলো শাসক দল বিজেপির প্রধান এবং সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী। এমন একটি মেরুকৃত, উত্তপ্ত ও তীব্র প্রতিযোগিতামূলক রাজনৈতিক পরিবেশে, আসাদউদ্দিন ওয়াইসির জোটবদ্ধ হওয়ার এই নতুন প্রস্তাব রাজ্যের সংখ্যালঘু ভোটব্যাংককে ঐক্যবদ্ধ করার একটি সুপরিকল্পিত কৌশল হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

 

যদি সত্যিই শেষ পর্যন্ত সমাজবাদী পার্টি এবং এআইএমআইএমের মধ্যে এমন কোনো শক্তিশালী রাজনৈতিক সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে তা উত্তর প্রদেশের আগামী বিধানসভা নির্বাচনে সম্পূর্ণ একটি নতুন সমীকরণের জন্ম দিতে পারে।

 

- এনডিটিভি