রবিবার, জুলাই ২৬, ২০২৬
১১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মাত্র ছয় শব্দের পোস্টে শুরু হওয়া আন্দোলনে কাঁপল ভারত!

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৬ জুলাই, ২০২৬, ০৯:৪৯ পিএম

মাত্র ছয় শব্দের পোস্টে শুরু হওয়া আন্দোলনে কাঁপল ভারত!
ছবি : Collected

ভারতের চিকিৎসাশাস্ত্রে ভর্তির সর্বভারতীয় ও অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ‘নিট’-এর প্রশ্নপত্র ফাঁসের গুরুতর অভিযোগকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি দেশটিতে এক অভূতপূর্ব ও সর্বাত্মক ছাত্র আন্দোলনের সূচনা হয়।

 

টানা ৩৭ দিন ধরে চলা এই তীব্র ও আপসহীন আন্দোলনের মূল নেতৃত্বে ছিল সম্পূর্ণ নতুন ধারার এক রাজনৈতিক ও সামাজিক প্ল্যাটফর্ম ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি। দেশের সাধারণ ও ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত ক্ষোভ থেকে জন্ম নেওয়া এই আন্দোলনে পরবর্তীতে ভারতের প্রধান বিরোধী দলগুলোও একাত্মতা ও সক্রিয়ভাবে সংহতি প্রকাশ করে।

 

ছাত্র-জনতা এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মিলিত ও লাগাতার চাপের মুখে অবশেষে গত শনিবার দুপুরের দিকে নিজেদের অনড় অবস্থান থেকে পিছু হটতে বাধ্য হয় নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার। উদ্ভূত চরম অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সম্পূর্ণ দায়ভার কাঁধে নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করেন ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান।

 

একটি নির্দিষ্ট পরীক্ষার অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন মূলত ভারতের তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি এবং ক্ষমতাসীন মোদি সরকারের সার্বিক শাসনক্ষমতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে দেশজুড়ে এক বৃহত্তর ও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

 

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক গভীর ও বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোর রাজনৈতিক ইতিহাসে এটিই ছিল ভারতের বুকে সংঘটিত সবচেয়ে বড় ও সুসংগঠিত ছাত্রসমাবেশ বা গণ-আন্দোলন।

 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গত এক দশকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি বড় মাপের গণ-আন্দোলন সংঘটিত হয়েছে। যার মধ্যে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনবিরোধী আন্দোলন কিংবা বহুল আলোচিত কৃষি আইনবিরোধী কৃষক আন্দোলন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

 

তবে সেই বৃহৎ আন্দোলনগুলোর মূল চরিত্র মূলত আদর্শিক বা নির্দিষ্ট কোনো সামাজিক, ধর্মীয় ও পেশাজীবী গোষ্ঠীকেন্দ্রিক ছিল। কিন্তু সদ্য সমাপ্ত সিজেপি-র নেতৃত্বাধীন এই ছাত্র আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য ও প্রেক্ষাপট ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং অনেক বেশি সর্বজনীন।

 

এটি ভারতের আপামর তরুণ সমাজের বছরের পর বছর ধরে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, হতাশা ও বঞ্চনার এক স্বতঃস্ফূর্ত বহিঃপ্রকাশ হিসেবেই রাজপথে আছড়ে পড়েছিল, যা সামাল দেওয়া সরকারের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

 

যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ্যাত ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বনামধন্য সিনিয়র ভিজিটিং ফেলো ইয়ামিনি আয়ার এই অভূতপূর্ব ছাত্র আন্দোলনের সমাজতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তার সুচিন্তিত মতানুসারে, ভারতের বর্তমান চরম প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ও শিক্ষাব্যবস্থা দেশের প্রচলিত জাতপাত, অর্থনৈতিক শ্রেণি এবং লিঙ্গের সকল অদৃশ্য বিভাজনকে অতিক্রম করে বিপুলসংখ্যক সাধারণ তরুণকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

 

চিকিৎসাশাস্ত্রের মতো একটি অত্যন্ত সম্মানজনক ও স্পর্শকাতর পেশায় যুক্ত হওয়ার আজন্ম লালিত স্বপ্ন নিয়ে লাখ লাখ শিক্ষার্থী বছরের পর বছর ধরে যে কঠোর পরিশ্রম ও ত্যাগ স্বীকার করে, প্রশ্নফাঁসের মতো জঘন্য দুর্নীতির ঘটনা তাদের সেই স্বপ্নের মূলে সরাসরি কুঠারাঘাত করেছে।

 

ফলে এই আন্দোলন কোনো একক রাজনৈতিক দল বা নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিস্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর একচেটিয়া প্রতিনিধিত্ব করেনি, বরং এটি ছিল দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সম্মিলিত মৌলিক অধিকার আদায়ের এক সর্বাত্মক লড়াই।

 

ধর্ম, বর্ণ ও আভিজাত্যের সীমারেখার ঊর্ধ্বে উঠে পুরো দেশের তরুণ সমাজ নিজেদের মেধার মূল্যায়ন ও ন্যায়বিচারের একটি মাত্র দাবিতে এক কাতারে এসে দাঁড়িয়েছিল। সবচেয়ে বিস্ময়কর ও কৌতূহলোদ্দীপক বিষয়টি হলো, সমগ্র দেশ কাঁপিয়ে দেওয়া সুবিশাল এই ছাত্র আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটেছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে করা মাত্র ছয়টি শব্দের একটি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত পোস্ট থেকে।

 

‘সব তেলাপোকা যদি একসঙ্গে আসে?’ হতাশা ও চরম ক্ষোভের মুহূর্তে করা এই একটি মাত্র সাধারণ বাক্যই যে মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে ভারতের সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও প্রভাবশালী ছাত্র আন্দোলনের মূল স্ফুলিঙ্গ হিসেবে কাজ করবে, তা হয়তো খোদ পোস্টদাতাও শুরুতে বিন্দুবিসর্গ কল্পনা করতে পারেননি।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের এক বিস্তারিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মাত্র ৩০ বছর বয়সী তরুণ ও পেশাদার রাজনৈতিক যোগাযোগ কৌশলবিদ অভিজিৎ দীপকে ছিলেন ইতিহাস সৃষ্টিকারী এই পোস্টের রচয়িতা।

 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গণ্ডি পেরিয়ে বর্তমানে তিনিই ভারতজুড়ে তুমুল আলোড়ন তোলা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি-র আন্দোলনের সবচেয়ে পরিচিত, জনপ্রিয় ও অদম্য মুখ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন।

 

এই ‘তেলাপোকা’ বা ককরোচ শব্দটির পেছনের প্রেক্ষাপট ও ইতিহাসও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং বেদনাদায়ক। জানা যায়, গত ১৬ মে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি সূর্য কান্ত একটি মামলার শুনানিকালে একটি অত্যন্ত অনাকাঙ্ক্ষিত ও বিতর্কিত মন্তব্য করে বসেন।

 

বক্তব্যে তিনি দেশের অগণিত বেকার তরুণ সমাজকে উদ্দেশ্য করে চরম অবমাননাকরভাবে ‘তেলাপোকা’র সঙ্গে তুলনা করেছিলেন বলে ব্যাপক অভিযোগ ওঠে। যদিও পরবর্তীতে প্রবল সমালোচনার মুখে তিনি নিজের অবস্থান পরিষ্কার করার চেষ্টা করেন এবং দাবি করেন যে, তার সেই আইনি মন্তব্যটি গণমাধ্যম ও সাধারণ মানুষের কাছে সম্পূর্ণ ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

 

কিন্তু ততক্ষণে যা ঘটার তা ঘটে গেছে। দেশের একজন শীর্ষ বিচারপতির মুখ থেকে আসা ওই অনভিপ্রেত মন্তব্যটি বেকার, সংগ্রামরত ও হতাশ তরুণ প্রজন্মের আত্মসম্মানে গভীরভাবে আঘাত হানে। অভিজিৎ দীপকের সেই ছোট্ট ও ব্যঙ্গাত্মক পোস্টটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে এবং মুহূর্তের মধ্যেই তা দেশজুড়ে ভাইরাল হয়ে যায়।

 

বেকার তরুণদের প্রতি রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের এই অবজ্ঞাপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির তীব্র প্রতিবাদেই মূলত সেই ক্ষোভ থেকে সম্পূর্ণ ব্যঙ্গাত্মক অথচ অত্যন্ত প্রভাবশালী রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ‘ককরোচ জনতা পার্টি’-র আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ ঘটে।

 

আর তরুণদের অপমানের সেই ছোট স্ফুলিঙ্গ থেকেই জ্বলে ওঠা দাবানল শেষ পর্যন্ত টানা ৩৭ দিনের এক সর্বাত্মক ও সফল গণ-আন্দোলনের রূপ নেয়, যার চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে পতন ঘটে দেশের একজন শীর্ষস্থানীয় কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর এবং জয় হয় সাধারণ শিক্ষার্থীদের ঐক্যের।