কেন্দ্রীয় পর্যায়ে এমন রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের রেশ কাটতে না কাটতেই এবার সেই উত্তাপ আছড়ে পড়েছে পাঞ্জাবের রাজ্য রাজনীতিতে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর পদত্যাগের পর এবার পাঞ্জাবের শিক্ষামন্ত্রী হরজোত সিং বেইন্সের পদত্যাগের জোর দাবি তুলেছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এবং জাতীয় কংগ্রেস।
রাজ্যের বিভিন্ন সরকারি নিয়োগ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রবেশিকা পরীক্ষায় ধারাবাহিক অনিয়ম এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ এনে তারা ক্ষমতাসীন আম আদমি পার্টির (এএপি) ওপর প্রবল রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেছে।
রোববার বিজেপির সর্বভারতীয় মুখপাত্র প্রদীপ ভান্ডারি এক কড়া বিবৃতি দিয়ে পাঞ্জাবের শিক্ষামন্ত্রীর দ্রুত পদত্যাগের দাবি জানিয়েছেন। তিনি আম আদমি পার্টির শীর্ষ নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়ালের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে জানতে চেয়েছেন, কবে তিনি তার দলের এই শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ চাইবেন।
বিজেপির পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট বেশ কিছু অভিযোগ সামনে আনা হয়েছে। দলটির দাবি, পাঞ্জাব স্কুল এডুকেশন বোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিত দ্বাদশ শ্রেণির ইংরেজি পরীক্ষা থেকে শুরু করে পাঞ্জাব স্টেট টিচার এলিজিবিলিটি টেস্ট এবং কৃষি উন্নয়ন কর্মকর্তা নিয়োগ পরীক্ষায় ভয়াবহ মাত্রায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে।
পাঞ্জাব সাব-অর্ডিনেট সার্ভিসেস সিলেকশন বোর্ডের অধীনে গ্রুপ-বি পর্যায়ের নিয়োগ এবং অন্যান্য সম্মিলিত নিয়োগ প্রক্রিয়ায়ও চরম অস্বচ্ছতার অভিযোগ তুলেছে বিজেপি। এছাড়া, রাজ্যের নাইব তহসিলদার ও ফার্মাসি অফিসার নিয়োগ পরীক্ষায় ব্যাপক নকল এবং এক্সাইজ অ্যান্ড ট্যাক্সেশন ইন্সপেক্টর নিয়োগের চূড়ান্ত মেধাতালিকায় ভুয়া প্রার্থীদের নাম অন্তর্ভুক্ত থাকার দাবি করেছে দলটি।
বিজেপির পাশাপাশি পাঞ্জাবের প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে জাতীয় কংগ্রেসও রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছে। পাঞ্জাব প্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতি অমরিন্দর সিং রাজা ওয়ারিং কড়া সমালোচনা করে জানিয়েছেন, গত চার বছরে পাঞ্জাবে অন্তত ছয়টি বড় ধরনের প্রশ্নফাঁসের ঘটনা ঘটেছে।
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রশ্ন রাখেন, এতগুলো দুর্নীতির পরও পাঞ্জাবের শিক্ষামন্ত্রী হরজোত সিং বেইন্স কবে নিজের ব্যর্থতা স্বীকার করে পদত্যাগ করবেন। কংগ্রেস নেতার মতে, গত চার বছরে ছয়টি বড় প্রশ্নফাঁসের ঘটনার মাধ্যমে অগণিত শিক্ষার্থীর সোনালি স্বপ্ন ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে, অথচ ন্যূনতম জবাবদিহি নিশ্চিত করা হয়নি।
তিনি বলেন, পাঞ্জাবের লাখো শিক্ষার্থী আজ নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উত্তর খুঁজছেন, তারা প্রশাসনের কাছে স্বচ্ছ জবাবদিহি চান এবং সুরক্ষিত ভবিষ্যৎ আশা করেন। বিরোধীদের এমন রাজনৈতিক আক্রমণ ও পদত্যাগের দাবিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও 'ভুয়া খবর' বলে উড়িয়ে দিয়েছে পাঞ্জাবের ক্ষমতাসীন দল আম আদমি পার্টি।
রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ভগবন্ত মান দৃঢ়তার সঙ্গে সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি দেশবাসীর উদ্দেশে পরিষ্কার করে জানিয়েছেন যে, তার সরকারের গত সাড়ে চার বছরের শাসনামলে পাঞ্জাবে একটিও প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটেনি।
বিরোধীদের অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আখ্যা দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে নিশ্চয়তা দিচ্ছেন যে ভবিষ্যতেও পাঞ্জাবের মাটিতে কোনো প্রশ্নফাঁস হবে না এবং এটিই তার সরকারের প্রধান গ্যারান্টি।
তবে তিনি স্বীকার করেন যে, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত একটি পরীক্ষার মাত্র দুটি কেন্দ্রে কিছু অসাধু চক্রের মাধ্যমে নকল করার ঘটনা ধরা পড়েছিল। কিন্তু প্রশাসন সময় নষ্ট না করে মাত্র দশ মিনিটের মধ্যে সেই চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, নকল করার অপচেষ্টাকে কোনোভাবেই প্রশ্নপত্র ফাঁস বলা চলে না। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিধ্বনি করে আম আদমি পার্টির আরেক শীর্ষ নেতা বালতেজ পান্নু বিজেপি এবং কংগ্রেসের আনীত সকল অভিযোগকে মিথ্যা বলে আখ্যায়িত করেছেন।
ঘটনার ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি জানান, একটি পরীক্ষাকেন্দ্রে কয়েকজন পরীক্ষার্থী অবৈধভাবে ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করে ডিজিটাল পদ্ধতিতে নকল করার চেষ্টা করার সময় হাতেনাতে ধরা পড়েছিলেন। তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবে আইনি ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে, তবে এর সঙ্গে প্রশ্নপত্র আগেই ফাঁস হয়ে যাওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই।
উল্টো তিনি অভিযোগ করেন যে, বিজেপি এবং কংগ্রেস সম্পূর্ণ ইচ্ছাকৃতভাবে একটি সাধারণ নকলের ঘটনাকে অতিরঞ্জিত করে প্রশ্নফাঁস হিসেবে প্রচার করছে। পান্নু বলেন, এই প্রচারণার মূল উদ্দেশ্য হলো কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের সময়কার দুর্নীতি থেকে মানুষের দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়া।
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, কেন্দ্রে বিজেপি সরকারের শাসনামলে নব্বইটির বেশি প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে। এখন সেই দায় এড়াতেই বিজেপি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে পাঞ্জাবের আম আদমি পার্টি সরকারের দিকে আঙুল তুলছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে প্রশ্নফাঁস ইস্যুটি এখন সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মূলত সর্বভারতীয় নিট পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের গুরুতর অভিযোগ এবং শিক্ষাব্যবস্থায় প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়মের প্রতিবাদে দিল্লিতে টানা এক মাস ধরে চলা গণ-আন্দোলনের পরিণতি হিসেবে গত শনিবার কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন।
তার পদত্যাগের পর কেন্দ্রীয় মন্ত্রী প্রহ্লাদ যোশীকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নতুন দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় পর্যায়ের এই ঘটনার ঠিক পরপরই পাঞ্জাবকে কেন্দ্র করে নতুন এই রাজনৈতিক সংঘাতের সূত্রপাত ঘটেছে, যা ভারতের সার্বিক শিক্ষাব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে আগামী দিনগুলোতে আরও বড় জাতীয় বিতর্কের জন্ম দেবে বলে মনে করা হচ্ছে।