সোমবার, জুলাই ২৭, ২০২৬
১২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ধর্মেন্দ্র প্রধানকে লোকসভায় বিজেপির উষ্ণ অভ্যর্থনা, তীব্র সমালোচনা কংগ্রেসের

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৭ জুলাই, ২০২৬, ০৪:৫৯ পিএম

ধর্মেন্দ্র প্রধানকে লোকসভায় বিজেপির উষ্ণ অভ্যর্থনা, তীব্র সমালোচনা কংগ্রেসের
ছবি : Collected

ভারতের লোকসভায় সদ্য পদত্যাগী কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে কেন্দ্র করে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি এবং প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের মধ্যে এক নজিরবিহীন রাজনৈতিক উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে।

 

সোমবার লোকসভা অধিবেশনে যোগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে সংসদ ভবনে পৌঁছালে বিজেপি এবং এনডিএ জোটের সংসদ সদস্যরা তাকে এক অত্যন্ত উষ্ণ ও আড়ম্বরপূর্ণ অভ্যর্থনা জানান। তবে ক্ষমতাসীন জোটের এই সংবর্ধনার দৃশ্যকে কোনোভাবেই সহজভাবে মেনে নেয়নি বিরোধী শিবির।

 

কংগ্রেসের পক্ষ থেকে এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানানো হয়েছে, যা ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে নতুন করে এক উত্তপ্ত বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সোমবার সংসদ চত্বরে ধর্মেন্দ্র প্রধান উপস্থিত হওয়ার পরপরই সেখানে এক উৎসবমুখর পরিবেশের অবতারণা হয়। গাড়ি থেকে নেমে হাতজোড় করে উপস্থিত সকলকে বিনম্র শুভেচ্ছা জানিয়ে সংসদ ভবনের দিকে এগিয়ে যান তিনি।

 

ঠিক সে সময় তাকে ঘিরে ধরেন বিজেপি ও এনডিএ জোটের বিপুল সংখ্যক সংসদ সদস্য। চারপাশ থেকে ‘ধর্মেন্দ্র প্রধান জিন্দাবাদ’ স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে গোটা সংসদ চত্বর। দলীয় সহকর্মীরা তাকে ঐতিহ্যবাহী টুপি ও শাল পরিয়ে বরণ করে নেন।

 

ওড়িশা রাজ্য থেকে উঠে আসা এই প্রভাবশালী ও জনপ্রিয় নেতার প্রতি দলের সর্বস্তরের সদস্যরা এভাবেই তাদের পূর্ণ সমর্থন, গভীর আস্থা এবং ঐকান্তিক শুভকামনা জ্ঞাপন করেন। সদ্য একটি দেশব্যাপী বড় বিতর্কের জেরে মন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগের পরও দলের অভ্যন্তরে তার এমন নিরঙ্কুশ গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা উপস্থিত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

 

তবে ক্ষমতাসীন জোটের এই উল্লাস ও সংবর্ধনাকে অত্যন্ত কড়া ভাষায় আক্রমণ করেছে প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস। কংগ্রেসের পক্ষে রাজ্যসভার প্রবীণ সদস্য রেণুকা চৌধুরী এই ঘটনার তীব্র সমালোচনা করে একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও বিতর্কিত ঐতিহাসিক বিষয়ের অবতারণা করেন।

 

তিনি ক্ষমতাসীন দলের সামগ্রিক মানসিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, ২০২২ সালে বিলকিস বানোর ধর্ষণ মামলার দণ্ডিত জঘন্য আসামিদের ক্ষেত্রেও তারা ঠিক একই ধরনের সম্মানজনক আচরণ করেছিল এবং এটাই তাদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভ্যাস।

 

উল্লেখ্য, ২০০২ সালের বিভীষিকাময় গুজরাট দাঙ্গার সময় বিলকিস বানোকে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ এবং তার পরিবারের নিরীহ সদস্যদের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের দায়ে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত এগারো জন আসামিকে ২০২২ সালে ভালো আচরণের খোঁড়া যুক্তিতে আগাম মুক্তি দিয়েছিল তৎকালীন গুজরাট রাজ্য সরকার।

 

গোধরা কারাগার থেকে মুক্তির পর সেই সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের যখন প্রকাশ্য দিবালোকে মিষ্টি খাইয়ে এবং পা ছুঁয়ে সংবর্ধনা জানানো হয়েছিল, তখন গোটা ভারতজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় উঠেছিল। রেণুকা চৌধুরী সেই কলঙ্কজনক অধ্যায়ের কথা পুনরায় স্মরণ করিয়ে দিয়ে বিজেপি নেতাদের নৈতিক অবস্থানকে সরাসরি কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন।

 

ধর্মেন্দ্র প্রধানের এই আকস্মিক পদত্যাগের পেছনে মূলত রয়েছে এক দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যাপক মাত্রার ছাত্র অসন্তোষ এবং গণআন্দোলন। ভারতের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, মর্যাদাপূর্ণ এবং তুমুল প্রতিযোগিতামূলক মেডিকেল প্রবেশিকা পরীক্ষা ‘নিট’-এর প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং সার্বিক শিক্ষাব্যবস্থায় ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ ওঠে সম্প্রতি।

 

এর প্রতিবাদে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে গোটা ভারতজুড়ে তীব্র ছাত্র আন্দোলন পরিচালিত হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক প্রতিবাদী সংগঠন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি-এর সুযোগ্য নেতৃত্বে শুরু হওয়া এই আন্দোলন সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাঝে অভূতপূর্ব সাড়া ফেলে।

 

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির ঐতিহাসিক কেন্দ্রস্থল যন্তর মন্তরে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভের স্ফুলিঙ্গ খুব দ্রুতই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত ও অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে, যা কেন্দ্রীয় সরকারকে চরম রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অস্বস্তিতে ফেলে দেয়।

 

দেশজুড়ে শিক্ষার্থীদের এই লাগাতার এবং অপ্রতিরোধ্য আন্দোলনের মুখেই শেষ পর্যন্ত গত শনিবার কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিতে বাধ্য হন ধর্মেন্দ্র প্রধান। পদত্যাগের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি দীর্ঘ ও আবেগঘন বিবৃতি প্রকাশ করেন ধর্মেন্দ্র প্রধান।

 

তিনি দেশবাসীর উদ্দেশে স্পষ্টভাবে জানান যে, তিনি ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কার্যালয়ে নিজের পদত্যাগপত্র আনুষ্ঠানিকভাবে পাঠিয়ে দিয়েছেন। নিজের ইস্তফাপত্রের প্রেক্ষাপট ও কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে চিঠিতে তিনি গভীরভাবে উল্লেখ করেন, গত দশ দিনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাবলি তাকে মানসিকভাবে মারাত্মকভাবে ব্যথিত করেছে।

 

তিনি অত্যন্ত জোরালোভাবে বলেন, এই পদত্যাগ কোনোভাবেই তার ব্যক্তিগত সম্মান বা মর্যাদার বিষয় নয়, বরং এটি দেশের বৃহত্তর স্বার্থের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ভারতের বিপুল সংখ্যক তরুণ সমাজকেই দেশের প্রকৃত এবং অদম্য শক্তি হিসেবে অভিহিত করে তিনি বলেন, দেশের এই প্রাণবন্ত যুবসমাজকে কোনোভাবেই বিভ্রান্তি এবং অনিশ্চয়তার এক অন্ধকার চক্রে আটকে পড়তে দেওয়া উচিত নয়।

 

তার এই সুচিন্তিত বার্তার মাধ্যমে তিনি বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার একটি প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত দিয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে। অন্যদিকে, শিক্ষামন্ত্রীর এই নাটকীয় পদত্যাগের পর চলমান ছাত্র আন্দোলনের দৃশ্যপটেও বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।

 

ককরোচ জনতা পার্টির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে গণমাধ্যমকে জানানো হয়েছে যে, কেন্দ্রীয় সরকারের উচ্চপদস্থ নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে তাদের অত্যন্ত ফলপ্রসূ ও গঠনমূলক আলোচনা হয়েছে এবং সরকার তাদের উত্থাপিত প্রতিটি যৌক্তিক দাবি মেনে নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে।

 

নিজেদের ন্যায্য দাবি আদায়ের এই অভাবনীয় সফলতার পরপরই তারা এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা এই দেশব্যাপী তীব্র আন্দোলন প্রত্যাহারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়। এর মধ্য দিয়ে ভারতের শিক্ষাক্ষেত্রে চলমান এক গভীর ও নজিরবিহীন সংকটের আপাতত সফল অবসান ঘটল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ মহল।

 

তবে রাজনৈতিক অঙ্গনে ধর্মেন্দ্র প্রধানের এই আকস্মিক বিদায় এবং তাকে ঘিরে তৈরি হওয়া এই নতুন বিতর্ক আগামী দিনে ভারতের সংসদীয় ও দলীয় রাজনীতিতে ঠিক কতটা সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

 

- এনডিটিভি