মঙ্গলবার, জুলাই ২৮, ২০২৬
১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভারতে শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের একে-৪৭ দিয়ে গুলিবর্ষণ, দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ!

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৭ জুলাই, ২০২৬, ০৬:৩৬ পিএম

ভারতে শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের একে-৪৭ দিয়ে গুলিবর্ষণ, দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ!
ছবি : Collected

ভারতের বিহার রাজ্যে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ও মর্মান্তিক ঘটনা গোটা দেশে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। রাজ্যজুড়ে ডাকা সর্বাত্মক ধর্মঘট বা ‘বিহার বন্ধ’-এর সময় সিওয়ান জেলায় বিক্ষোভরত সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের একে-৪৭ রাইফেলের মতো অত্যাধুনিক ও প্রাণঘাতী আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের একটি দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।

 

আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজে নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের ওপর এহেন সামরিক ধাঁচের অস্ত্রের ব্যবহার মানবাধিকার ও আইনের শাসন নিয়ে নতুন করে গুরুতর প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের মানদণ্ড অনুযায়ী, এ ধরনের ঘটনা অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং মারাত্মক উদ্বেগের বিষয়।

 

দেশব্যাপী সমালোচনার ঝড় ওঠার পর বিহার রাজ্যের পুলিশ সদর দপ্তর ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিয়েছে এবং প্রাথমিক প্রশাসনিক পদক্ষেপ হিসেবে অভিযুক্ত এক পুলিশ সদস্যকে তাৎক্ষণিকভাবে বরখাস্ত করার কঠোর নির্দেশ প্রদান করেছে।

 

গত শনিবার, ২৫ জুলাই, পূর্বনির্ধারিত রাজ্যব্যাপী এই ধর্মঘটের অংশ হিসেবে বিহারের বিভিন্ন জেলায় ছাত্র সংগঠনগুলো নিজেদের অধিকার ও দাবিদাওয়া আদায়ের লক্ষ্যে রাজপথে নেমে আসে। রাজধানী পাটনা ও সিওয়ানসহ একাধিক স্থানে হাজার হাজার শিক্ষার্থী একত্রিত হয়ে অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে জমায়েত হয়ে ঐতিহাসিক গান্ধী ময়দানের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করে।

 

প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ ও নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মিছিলটি সামনের দিকে এগোতে থাকলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ব্যাপক বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয়।

 

একপর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে চরম উত্তেজনা, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়। ঠিক সেই শ্বাসরুদ্ধকর মুহূর্তেই ভাইরাল হওয়া ওই ভিডিওটিতে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দেখা যায়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক সদস্য অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে প্রাণঘাতী একে-৪৭ রাইফেল থেকে সরাসরি গুলি ছুড়ছেন।

 

স্বাধীন দেশের নিরস্ত্র নাগরিকদের ওপর এমন ভারী ও প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার উপস্থিত জনতাসহ পুরো দেশবাসীকে গভীরভাবে হতবাক করে দেয়। এই অপ্রত্যাশিত ও ভয়াবহ গোলাগুলির ঘটনায় বেশ কয়েকজন নিরীহ মানুষ গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন।

 

বর্তমানে পাটনার স্বনামধন্য জয়প্রভা মেদান্ত হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তিন আহত বিক্ষোভকারীর শারীরিক অবস্থা আপাতত স্থিতিশীল বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে। এই আহতদের মধ্যে সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটেছে মাত্র পনেরো বছর বয়সি এক নিরীহ কিশোর মোহাম্মদ আরিফের সঙ্গে।

 

আরিফের পরিবারের সদস্যদের দেওয়া তথ্যমতে, ধর্মঘটের দিন চারপাশের দোকানপাট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সে নিতান্তই সাধারণ একজন পথচারী হিসেবে বাধ্য হয়ে নিজের বাড়িতে ফিরছিল। পথিমধ্যে সে আকস্মিকভাবে পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যকার এই তীব্র সংঘাতের মাঝখানে পড়ে যায় এবং দুর্ভাগ্যজনকভাবে তার ঘাড়ে সরাসরি গুলি লাগে।

 

দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাকে হাসপাতালে স্থানান্তর করার পর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের একটি সুদক্ষ দল দীর্ঘ অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তার শরীর থেকে অত্যন্ত সন্তর্পণে গুলিটি বের করে আনতে সক্ষম হন। বর্তমানে নিবিড় পর্যবেক্ষণে থাকা এই কিশোরকে চিকিৎসকরা সম্পূর্ণ আশঙ্কামুক্ত বলে ঘোষণা করেছেন।

 

শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের এই নির্মম ও বেপরোয়া আচরণের পরপরই ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। বিহার রাজ্যের প্রধান বিরোধী দলীয় নেতা তেজস্বী যাদব এই নজিরবিহীন ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে দোষী পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কঠোর শাস্তিমূলক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি তুলেছেন।

 

নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টে তিনি ঘটনার সেই ভয়াবহ ভিডিওটি প্রকাশ করে দেশবাসীর সামনে পুলিশের ক্ষমতার অপব্যবহার ও নির্মমতার অকাট্য প্রমাণ তুলে ধরেন। অন্যদিকে, ভারতের লোকসভার প্রধান বিরোধী দলীয় নেতা রাহুল গান্ধীও এই গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি জাতীয় স্তরে অত্যন্ত জোরালোভাবে উপস্থাপন করেছেন।

 

তিনি রাজধানী দিল্লিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর ছররা গুলি বা পেলেট গান ব্যবহার এবং বিহারের সিওয়ানে একে-৪৭ ব্যবহারের প্রাসঙ্গিকতা একত্রে টেনে এনে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় অভিযোগ করেন যে, গোটা দেশজুড়েই সাধারণ মানুষের ভিন্নমত দমনের জন্য সরকার সুপরিকল্পিতভাবে একই ধরনের স্বৈরতান্ত্রিক ছক ও দমন-পীড়নের নীতি অনুসরণ করে চলেছে।

 

প্রশাসনের তরফ থেকে এই স্পর্শকাতর ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রদান করা হয়েছে। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করে জানিয়েছেন যে, সমাজে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং সাধারণ মানুষের জানমালের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই পুলিশ বাহিনীর প্রধান ও পবিত্র দায়িত্ব।

 

তবে এই রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের নামে প্রতিষ্ঠিত আইন ও নিয়মনীতির কোনো ধরনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না বলে তারা অঙ্গীকার করেছেন। এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটির প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনে এরই মধ্যে একটি বিস্তৃত ও নিরপেক্ষ বিভাগীয় তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে।

 

নিরস্ত্র ও সাধারণ বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে বলপ্রয়োগ বা আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে পুলিশের যে সুনির্দিষ্ট ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তা এই ক্ষেত্রে যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, সেটিই এই তদন্তের মূল বিবেচ্য বিষয় হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।

 

গঠিত তদন্ত কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদনের ফলাফলের ওপর ভিত্তি করেই অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে পরবর্তী শাস্তিমূলক বা কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে দেশবাসীকে সম্পূর্ণভাবে আশ্বস্ত করা হয়েছে। এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করার দিকে এখন অধীর আগ্রহে তাকিয়ে আছে পুরো দেশ।

 

- এনডিটিভি