এই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে এবং গ্রেপ্তারকৃত সাধারণ শিক্ষার্থীদের অবিলম্বে নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে আগামী মঙ্গলবার থেকে আবারও দেশজুড়ে কঠোর ও সর্বাত্মক আন্দোলনের ডাক দেওয়ার কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে ভারতের তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি।
সরকারের দ্বিমুখী নীতির তীব্র সমালোচনা করে সংগঠনটির নেতারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, তাদের যৌক্তিক দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা রাজপথ ছাড়বেন না। ভারতীয় শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক বিস্তারিত প্রতিবেদনে সোমবার এই রাজনৈতিক ও সামাজিক উত্তাপের খবরটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, শিক্ষার্থীদের টানা আন্দোলনের মুখে সম্প্রতি ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। মূলত শিক্ষামন্ত্রীর এই পদত্যাগের মধ্য দিয়ে আন্দোলনকারীদের অন্যতম প্রধান একটি দাবি বাস্তবায়িত হয়।
এই রাজনৈতিক সাফল্যের পর, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং সম্মানজনক সমাধানের স্বার্থে অভিজিৎ দীপকের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে রাজধানী দিল্লির কেন্দ্রস্থল যন্তর মন্তরে চলমান ৩৭ দিনের টানা অবস্থান কর্মসূচি সাময়িকভাবে তুলে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা।
কিন্তু সেই সাময়িক বিরতি এখন সরকারের দমন-পীড়নের কারণে ফের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে রূপ নেওয়ার উপক্রম হয়েছে। পরিস্থিতির এই আকস্মিক অবনতির পেছনে প্রশাসনের কঠোর ও অসহনশীল মনোভাবকে সরাসরি দায়ী করেছে ককরোচ জনতা পার্টি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক অত্যন্ত কড়া বার্তায় সিজেপির মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা ভারতের ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) শীর্ষ নেতা এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জেপি নাড্ডা ও জিতেন্দ্র সিংকে উদ্দেশ্য করে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
তিনি তাঁর বার্তায় সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, আন্দোলন স্থগিত করার সময় শিক্ষার্থীদের ওপর কোনো ধরনের পুলিশি হয়রানি বা আইনি ব্যবস্থা না নেওয়ার যে চুক্তি হয়েছিল, প্রশাসন তা সম্পূর্ণরূপে পদদলিত করছে।
তিনি অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে জানান যে, বিহার এবং পশ্চিমবঙ্গ থেকে ইতিমধ্যে শত শত নিরীহ শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, রাজধানী দিল্লিতে আন্দোলনকারীদের যারা লজিস্টিক বা যৌক্তিক সহায়তা প্রদান করেছিলেন, সেই সকল স্বেচ্ছাসেবকদেরও অন্যায়ভাবে আটক করা হচ্ছে।
দেশের বিভিন্ন রাজ্যে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি এবং তাদের নানাভাবে হেনস্তা করার একের পর এক খবর প্রতিনিয়ত আসছে, যা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূল্যবোধের পরিপন্থি।
প্রশাসনের এই বৈরী আচরণের প্রেক্ষিতে সিজেপির মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা সরকারের প্রতি একটি চূড়ান্ত আল্টিমেটাম ছুড়ে দিয়েছেন। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, আন্দোলনকারী ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত যতগুলো এফআইআর বা প্রাথমিক তথ্য বিবরণী দায়ের করা হয়েছে, তা অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে। এর পাশাপাশি, যেসব শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার বা আটক করা হয়েছে, তাদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে সসম্মানে মুক্তি দিতে হবে।
তিনি আরও দাবি করেন যে, পূর্ববর্তী চুক্তি অনুযায়ী দিল্লি পুলিশ বা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল এবং বিজেপির মিত্র দলগুলোর শাসনাধীন রাজ্যগুলোর পুলিশ যেন শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে নতুন করে কোনো হয়রানিমূলক মামলা দায়ের না করে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
অন্যথায়, তরুণ সমাজ আবারও রাজপথে নেমে তাদের অধিকার আদায়ের লড়াই শুরু করতে বাধ্য হবে বলে তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় সতর্ক করে দিয়েছেন। একই সঙ্গে, আলোচনার টেবিলে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী মামলা বাতিলের আনুষ্ঠানিক ও লিখিত চুক্তি আগামীকালের মধ্যেই তাদের হাতে হস্তান্তরের একটি সুনির্দিষ্ট সময়সীমাও বেঁধে দিয়েছেন এই ছাত্রনেতা।
এর আগে চলমান এই সংকটের সমাধানের লক্ষ্যে গত শনিবার কনস্টিটিউশন ক্লাবে সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীদের সঙ্গে আন্দোলনকারী প্রতিনিধিদের তৃতীয় দফার এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
সেই ফলপ্রসূ বৈঠকের পর সিজেপির পক্ষ থেকে গণমাধ্যমকে জানানো হয়েছিল যে, দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করা বহুল আলোচিত ‘নিট’ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস ও জালিয়াতির কারণে হতাশাগ্রস্ত হয়ে যেসব মেধাবী শিক্ষার্থী আত্মহত্যার মতো মর্মান্তিক পথ বেছে নিয়েছিলেন, তাদের শোকসন্তপ্ত পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে কেন্দ্রীয় সরকার নীতিগতভাবে রাজি হয়েছে।
এছাড়া, ভারতজুড়ে এই যৌক্তিক আন্দোলনে অংশ নেওয়া সকল শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে থাকা সমস্ত মামলা তুলে নেওয়ার বিষয়েও সরকার সম্মতি জ্ঞাপন করেছিল। ওই বৈঠকে সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে পাঁচ দফা দাবি পেশ করেছিল সিজেপি এবং সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে, সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করার জন্য চার সপ্তাহ পর পরবর্তী দফার বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
উল্লেখ্য, গত ২০ জুলাই ভারতে শিক্ষার্থীদের বহুল আলোচিত ‘চলো সংসদ’ বা পার্লামেন্ট অভিমুখে পদযাত্রা কর্মসূচির পর দেশজুড়ে প্রশাসন কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের করা শুরু করে।
ককরোচ জনতা পার্টি শুরু থেকেই অত্যন্ত জোরালোভাবে এসব মামলা প্রত্যাহার এবং ভবিষ্যতে তরুণ শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের আইনি ব্যবস্থা না নেওয়ার কঠোর শর্ত দিয়ে আসছিল। এখন সরকারের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের ফলে ভারতের রাজপথে আবারও শিক্ষার্থীদের প্রবল বিক্ষোভের দাবানল ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন অভিজ্ঞ রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।