মঙ্গলবার, জুলাই ২৮, ২০২৬
১২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

"পাকিস্তানে এক প্লেট বিরিয়ানির জন্য মানুষ বিক্রি হয়"!

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৭ জুলাই, ২০২৬, ০৮:৪৬ পিএম

"পাকিস্তানে এক প্লেট বিরিয়ানির জন্য মানুষ বিক্রি হয়"!
ছবি : Collected

ভারতের জেন-জি বা নতুন প্রজন্মকে এতদিন এমন এক সমাজ হিসেবে বিবেচনা করা হতো, যাদের মনোযোগের পরিসর অত্যন্ত সীমিত এবং যারা সারাদিন কেবল স্মার্টফোনের পর্দায় স্ক্রল করে সময় কাটাতে অভ্যস্ত। চারপাশের গাম্ভীর্যপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়েও কেবল হাসাহাসি করাই যেন তাদের কাজ-এমন একটি বদ্ধমূল ধারণা প্রচলিত ছিল।

 

কিন্তু গত এক মাসে ভারতের এই তরুণ সমাজ নিজেদের সম্পর্কে প্রচলিত সেই ধারণাকে পুরোপুরি পাল্টে দিয়েছে। নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো গুরুতর ও স্পর্শকাতর ঘটনার প্রতিবাদে তারা যে তীব্র, লাগাতার ও সুশৃঙ্খল আন্দোলন গড়ে তুলেছে, তার সামনে শেষ পর্যন্ত নতিস্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন শক্তিশালী বিজেপি সরকার।

 

এই প্রবল গণ-অসন্তোষ ও শিক্ষার্থীদের একতা দেখে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। প্রথাগত রাজনীতির বাইরে গিয়ে গড়ে ওঠা এই অভাবনীয় ছাত্র আন্দোলনের কোনো পূর্বনির্ধারিত রাজনৈতিক ইশতেহার ছিল না।

 

বরং মিম এবং ইনস্টাগ্রাম রিলের মতো সামাজিক মাধ্যমের আধুনিক ও জনপ্রিয় উপাদানগুলোই হয়ে উঠেছিল কর্মী সংগ্রহ ও জনমত গঠনের প্রধান হাতিয়ার। আর মোবাইল ফোনে ধারণ করা ছোট ছোট ভিডিও ক্লিপগুলো কাজ করেছে পুলিশের বলপ্রয়োগ ও নির্যাতনের অকাট্য প্রমাণ হিসেবে।

 

তবে সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই আন্দোলন কেবল ভারতের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যেই আবদ্ধ থাকেনি, বরং তা সীমান্ত পেরিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর তরুণদের মাঝেও গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

 

সাম্প্রতিক অতীতে শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান ও নেপালের মতো দেশগুলোতেও তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে বড় ধরনের বিক্ষোভ দেখা গেছে। এই কারণে ভারতের ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি-এর এই ব্যতিক্রমী আন্দোলনে তারা একাত্মতা প্রকাশ করেছে।

 

শ্রীলঙ্কা ও নেপালের তরুণেরা ভারতের এই আন্দোলনকারীদের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে ২০২২ সালে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের জেরে শ্রীলঙ্কার শক্তিশালী রাজাপাকসে সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার স্মৃতি এখনও সেখানকার তরুণদের মনে প্রবলভাবে উজ্জ্বল।

 

সেই অদম্য অভিজ্ঞতার আলোকেই ভারতের এই প্রতিবাদের রেশ শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক অঙ্গনেও পড়েছে। দেশটির প্রখ্যাত কার্টুনিস্ট অবান্থা আরটিগালা তার একটি কার্টুনে অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন, কীভাবে ভারতের সরকার তেলাপোকাসম বা ‘ককরোচ’ আন্দোলনকারীদের সামলাতে গিয়ে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে।

 

এই আন্দোলনের একটি স্থিরচিত্র ইতিমধ্যে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তুলেছে, যেখানে রিও আহির নামের মুম্বাইয়ের এক তরুণী এক হাতে পুলিশের প্রিজন ভ্যানের গতি রোধ করে সাহসিকতার সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছেন।

 

১৯৮৯ সালে চীনের তিয়েনআনমেন স্কয়ারে সামরিক ট্যাংকের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সেই ঐতিহাসিক ‘ট্যাংক ম্যানের’ ছবির সঙ্গেই আন্তর্জাতিক মহল এই দৃশ্যটির তুলনা করছেন। নেপালের তরুণ সমাজও এই যৌক্তিক লড়াইয়ের প্রতি তাদের পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে।

 

কাঠমান্ডুর কনটেন্ট ক্রিয়েটর অবিনাশ মিশ্র ২০২৫ সালে নেপালে সংঘটিত তরুণদের আন্দোলনের স্মৃতিচারণ করে বলেছেন, ভারতীয় শিক্ষার্থীদের এই ক্ষোভ ও আবেগ শতভাগ যৌক্তিক এবং তাদের এই লড়াইয়ের মূল লক্ষ্য থেকে কখনোই বিচ্যুত হওয়া উচিত নয়।

 

তবে এই গণআন্দোলনের প্রেক্ষিতে সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ও আবেগঘন প্রতিক্রিয়াটি এসেছে চিরবৈরী প্রতিবেশী রাষ্ট্র পাকিস্তান থেকে। সাধারণত ভারতের যেকোনো বিষয়ে যেখানে রাজনৈতিক শত্রুতার আবহ বিরাজ করে, সেখানে এবার দেখা গেছে অকপট প্রশংসা ও মুগ্ধতা।

 

পাকিস্তানে মুক্তচিন্তা চর্চা বা সরকারের বিরুদ্ধে স্বাধীনভাবে কথা বলার সুযোগ প্রায় নেই বললেই চলে। কিন্তু দেশটির সাধারণ নাগরিকেরা ভারতের এই ‘ককরোচ’ আন্দোলনকারীদের সাহসিকতার প্রেমে পড়েছেন।

 

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এক পাকিস্তানি তরুণী বলেন, কেউ যদি এত দারুণ কাজ করে, তবে তাকে কোনোভাবেই ঘৃণা করা সম্ভব নয়। আরেক পাকিস্তানি তরুণ মুম্বাইয়ের একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করে জানান, সেখানকার একজন সাধারণ পথচারী যেভাবে পুলিশের ভ্যানের ছিটকিনি খুলে দিয়ে আটকে পড়া শিক্ষার্থীদের পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন, তা সত্যিই মুগ্ধ করার মতো এক মানবিক দৃশ্য।

 

তিনি পাকিস্তানি তরুণদের ভারতের এই শিক্ষার্থীদের অভূতপূর্ব ঐক্য থেকে শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান জানান। তার মতে, হিন্দু-মুসলিম বা জাতিগত সব ভেদাভেদ ভুলে ভারতীয় শিক্ষার্থীরা যেভাবে একতাবদ্ধ হয়েছে, পাকিস্তানে পাঞ্জাবি, পশতুন, সুন্নি বা শিয়া বিভেদের কারণে তেমন ঐক্যবদ্ধ হওয়া অত্যন্ত কঠিন একটি কাজ।

 

অন্যদিকে, এই আন্দোলনে বিদেশি, বিশেষ করে পাকিস্তানি অর্থায়নের যে ভিত্তিহীন অভিযোগ উঠেছে, তা নিয়ে তীব্র ব্যঙ্গ করেছেন পাকিস্তানি কনটেন্ট ক্রিয়েটর বিলাল হাসান। তিনি মন্তব্য করেছেন যে, নিজেদের দেশ চালানোর মতো পর্যাপ্ত অর্থই যেখানে তাদের নেই, সেখানে তারা অন্য দেশের আন্দোলনে কীভাবে অর্থায়ন করবে!

 

তিনি দুই দেশের শাসনব্যবস্থা ও মানবাধিকারের বাস্তবতার এক করুণ চিত্র তুলে ধরে বলেন, ভারতে শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশ লাঠিচার্জ করছে, আর পাকিস্তানে সরকারবিরোধীদের সরাসরি গুম করে দেওয়া হয়। বিশেষ করে কেউ বেলুচ সম্প্রদায়ের হলে এবং একবার গায়েব হয়ে গেলে, তার বেঁচে থাকার কোনো খবরই আর জানা যায় না।

 

নিজেদের দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অবক্ষয়ের কথা অকপটে স্বীকার করে তিনি আক্ষেপের সুরে বলেন, তাদের দেশে এক প্লেট বিরিয়ানির বিনিময়েই মানুষ বিক্রি হয়ে যায়। পরিশেষে, দুই দেশের সাধারণ মানুষের এই আত্মিক ও মানসিক সম্পর্ককে তিনি অত্যন্ত চমৎকার একটি বাক্যের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন।

 

তিনি বলেন, দিনশেষে উভয় দেশের মানুষ একে অপরকে খুব ভালোভাবে বোঝে, কারণ তারা সবাই একই দেশভাগের সন্তান। রাজধানী দিল্লিতে যখন সিজেপির এই প্রতিবাদ তুঙ্গে উঠেছিল, তখন চারপাশের দৃশ্য ছিল সত্যিই নজিরবিহীন।

 

বিশ্বের অন্যান্য দেশ এবং ভারতের তরুণেরা এবার আর সামাজিক মাধ্যমের ভিডিও বা মিম দেখে কেবল হাসাহাসি করেনি, বরং চরম শ্রদ্ধার সঙ্গে রাজপথে এক নতুন ইতিহাসের জন্ম হতে দেখেছে।

 

- ইন্ডিয়া টুডে