সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কেন্দ্র করে ই-২০ জনতা পার্টি বা ইজেপি নামের এই নতুন নাগরিক সংগঠনটি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে সাধারণ মানুষের সমর্থন আদায় করে নিচ্ছে। মূলত ব্যঙ্গাত্মক প্রচারণা এবং রসবোধ বা মিমকে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে তারা সরকারি জ্বালানি নীতির বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে।
সদ্য আত্মপ্রকাশ করা এই সংগঠনটি নিজেদের প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে বেছে নিয়েছে ‘কাঁকড়া’। তাদের দৃঢ় দাবি, সমাজে ঘটে চলা যেকোনো অবিচার ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে তারা কাঁকড়ার মতোই সর্বত্র নীরবে অথচ শক্তিশালীভাবে ছড়িয়ে পড়বে।
এই নতুন সংগঠনের মূল দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে ভারতের জাতীয় জ্বালানি নীতিতে পূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং সাধারণ ভোক্তাদের পছন্দের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেওয়া। তারা জোর দিয়ে বলছে যে, তারা ইথানল মিশ্রণের সম্পূর্ণ বিরোধী নয় এবং সরকারের কাছে কোনো ধরনের আর্থিক ভর্তুকিও দাবি করছে না।
বরং তাদের প্রধান দাবি হলো, দেশের প্রতিটি জ্বালানি পাম্পে বাধ্যতামূলকভাবে ভোক্তাদের জন্য শতভাগ বিশুদ্ধ পেট্রল কেনার একটি বিকল্প ব্যবস্থা রাখতে হবে। একই সঙ্গে, কোন জ্বালানিতে ঠিক কী পরিমাণ ইথানল বা অন্য রাসায়নিক উপাদান মেশানো হয়েছে, তা পাম্পগুলোতে স্পষ্টভাবে লিখে রাখা বাধ্যতামূলক করতে হবে।
গত ২৬ জুলাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) সংগঠনটির পক্ষ থেকে একাধিক পোস্টের মাধ্যমে ভারতের কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহনমন্ত্রী নিতিন গডকড়ীর পদত্যাগেরও জোরালো দাবি জানানো হয়।
শুধু তাই নয়, ইথানল-মিশ্রিত জ্বালানির কারণে গাড়ির মাইলেজ, ইঞ্জিনের কর্মক্ষমতা, পরিবেশ দূষণের মাত্রা এবং অতিরিক্ত রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো যাচাই করার জন্য একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ গবেষণার দাবিও তুলেছে সংগঠনটি।
রোববার ভোরে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করার পর থেকেই অন্তর্জালে এই কাঁকড়া আন্দোলনের অনুসারীর সংখ্যা যেন জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ছবি ও ভিডিও আদান-প্রদানের মাধ্যম ইনস্টাগ্রামে তাদের অনুসারীর সংখ্যা দুই লাখ ছাড়িয়ে যায়।
এছাড়া এক্সেও তাদের অনুসারীর সংখ্যা অত্যন্ত দ্রুতগতিতে প্রায় ৩৫ হাজারে গিয়ে পৌঁছেছে। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এত বিপুল সমর্থন পাওয়া সত্ত্বেও এই সংগঠনের মূল নেতৃত্বে কারা রয়েছেন, তা এখনো জনসাধারণের কাছে পুরোপুরি অস্পষ্ট।
যদিও ইতিমধ্যে সংগঠনটির পক্ষ থেকে স্বেচ্ছাসেবী এবং আনুষ্ঠানিক মুখপাত্র নিয়োগের কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের তথ্য অনুযায়ী, ইজেপির এক্স অ্যাকাউন্টটি ২০২১ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রথম খোলা হয়েছিল এবং এরপর থেকে এখন পর্যন্ত এর নাম অন্তত ৫১ বার পরিবর্তন করা হয়েছে।
তারপরও এর মূল উদ্যোক্তাদের আসল পরিচয় এখনো গোপনই রয়ে গেছে। ভারতে ইথানল-মিশ্রিত পেট্রল বা ই-২০ নিয়ে এই তীব্র বিতর্কের মূল কারণ হলো এর ব্যবহারিক প্রভাব। দেশের অসংখ্য গাড়িচালক ও মালিক দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন যে, এই মিশ্র জ্বালানি ব্যবহারের ফলে তাদের গাড়ির স্বাভাবিক মাইলেজ উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাচ্ছে।
পাশাপাশি পুরোনো গাড়ির ইঞ্জিন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং এর ফলে তাদের অতিরিক্ত রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় মেটাতে হচ্ছে। অথচ এই মিশ্র জ্বালানির দামও রাখা হচ্ছে শতভাগ বিশুদ্ধ পেট্রলের সমান। বিষয়টি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের একটি বড় অংশও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, মাত্র দুই সপ্তাহ আগে ভারতের কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে নিতে বাধ্য হয়েছে যে, ই-২০ জ্বালানি ব্যবহারের ফলে গাড়ির মাইলেজ ৩ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।
তবে তারা এ কথাও স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে, পেট্রলে ইথানল মেশানোর অর্থ এই নয় যে বাজারে জ্বালানির দাম আনুপাতিক হারে কমে যাবে। অন্যদিকে, ভারত সরকার তাদের এই নীতির পক্ষে অত্যন্ত জোরালো অবস্থান ধরে রেখেছে। কেন্দ্রীয় সরকারের দাবি, ই-২০ জ্বালানি ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতি বছর দেশের বিপুল পরিমাণ মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হচ্ছে।
এছাড়া এটি কৃষকদের আয় বৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে এবং পরিবেশে কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণের মাত্রাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হয়েছে। সরকার অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে জানিয়েছে যে, নির্ধারিত সময়ের পাঁচ বছর আগেই ভারত সফলভাবে পেট্রলে ২০ শতাংশ ইথানল মেশানোর জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।
তবে সরকারের এই দাবির তীব্র বিরোধিতা করে মাঠে নেমেছে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো। তাদের অভিযোগ, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী নিতিন গডকড়ীর পরিবারের সাথে ইথানল-সংশ্লিষ্ট ব্যবসার গভীর স্বার্থ জড়িত থাকার কারণেই তিনি এই নীতির পক্ষে এমন অনড় অবস্থান নিয়েছেন।
বিরোধী দলগুলো ইতিমধ্যে এই স্পর্শকাতর বিষয়টি জাতীয় সংসদে উত্থাপন করার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে ইজেপি বা কাঁকড়া আন্দোলনের আকস্মিক উত্থানের পাশাপাশি মাঠপর্যায়েও সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ক্রমশ দৃশ্যমান হচ্ছে।
ই-২০ জ্বালানির বাধ্যবাধকতা বাতিলের একই দাবিতে আগামী ৩১ জুলাই ভারতের রাজধানী দিল্লিতে একটি নাগরিক সংগঠন ‘গাড়ি মিছিল, গান্ধী মিছিল’ নামক এক অভিনব প্রতিবাদ কর্মসূচির ডাক দিয়েছে। এছাড়া দিল্লির ট্যাক্সি ও পর্যটন পরিবহন সংগঠনগুলো আগামী ৪ আগস্ট সরাসরি ‘সংসদ চলো’ কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছে।
তাদের সকলের একটাই সাধারণ প্রশ্ন-যখন দেশের সাধারণ ভোক্তারা তাদের কষ্টার্জিত অর্থে পূর্ণমূল্য দিয়ে পেট্রল কিনছেন, তখন কেন তাদেরকে বাধ্যতামূলকভাবে ইথানল-মিশ্রিত ক্ষতিকর জ্বালানি সরবরাহ করা হবে। সব মিলিয়ে ই-২০ পেট্রল ইস্যুটি ভারতে বর্তমানে একটি বড় ধরনের জাতীয় আন্দোলনে রূপ নিতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন অভিজ্ঞ মহল।