মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ভারতের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যম এনডিটিভি এক অত্যন্ত বিস্ফোরক প্রতিবেদনে প্রকাশ করেছে যে, শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করতে দাঙ্গা-নিরোধক বন্দুক থেকে গুলি চালানোর যে মর্মান্তিক নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, তা সরাসরি দিল্লি পুলিশের একজন উপ-পুলিশ কমিশনার বা ডিসিপি পদমর্যাদার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছ থেকেই এসেছিল।
নয়াদিল্লির প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানায় গত ২২ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত করা একটি সাধারণ ডায়েরি বা জিডি রিপোর্টের ভিত্তিতে এই ভয়াবহ সত্যটি উন্মোচিত হয়েছে। এই সংবাদটি প্রকাশ্যে আসার পর থেকে ভারতের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা ও জবাবদিহি নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনা ও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে।
উন্মোচিত ওই সরকারি নথিতে লিপিবদ্ধ তথ্যানুযায়ী, গত ২০ জুলাই নয়াদিল্লির ঐতিহাসিক যন্তর মন্তর এলাকায় শিক্ষার্থীদের চলমান শান্তিপূর্ণ আন্দোলন যখন ক্রমশ তীব্র ও উত্তাল রূপ ধারণ করে, ঠিক তখনই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের অজুহাতে দায়িত্বপ্রাপ্ত ডিসিপি চরম বলপ্রয়োগের এই বিতর্কিত নির্দেশ প্রদান করেন।
ঊর্ধ্বতন এই পুলিশ কর্মকর্তার সরাসরি নির্দেশে র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স বা আরএএফ-এর সদস্যরা নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের ওপর ব্যাপক মাত্রায় চড়াও হয়। ওই সাধারণ ডায়েরির নথিতে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, দাঙ্গা দমনের নামে পুলিশ ও আরএএফ সদস্যরা সেদিন ৫৫টি নন-ইলেকট্রিক সেল, ১৫টি ইলেকট্রিক সেল এবং ৫টি কাঁদানে গ্যাসের গ্রেনেড নিক্ষেপ করে।
পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলতে দাঙ্গা-নিরোধক বিশেষ বন্দুক থেকে অন্তত দুই রাউন্ড গুলিও বর্ষণ করা হয়। এই গুলিতে অত্যন্ত বিপজ্জনক প্লাস্টিকের পেলেট বা ছররা ব্যবহৃত হওয়ার কারণে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী মারাত্মকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হন।
নির্ভরযোগ্য সূত্রমতে, পুলিশের এই নির্দয় ও অনাকাঙ্ক্ষিত হামলায় কমপক্ষে চারজন শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয়টি হলো, এই ঘটনার পর প্রথমদিকে দিল্লি পুলিশের শীর্ষ পর্যায় থেকে গণমাধ্যমের কাছে শিক্ষার্থীদের ওপর কোনো প্রকার ছররা গুলি বা পেলেট গান ব্যবহারের অভিযোগটি সম্পূর্ণভাবে ও দৃঢ়তার সাথে অস্বীকার করা হয়েছিল।
তবে হাসপাতালে যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকা আহত শিক্ষার্থীরা যখন সংবাদমাধ্যমের সামনে তাদের শরীরে বিদ্ধ হওয়া পেলেটের ক্ষত সরাসরি প্রদর্শন করেন এবং পুলিশের বিরুদ্ধে ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আনেন, তখন পুলিশের প্রাথমিক মিথ্যাচারের বিষয়টি জনসমক্ষে একেবারে পরিষ্কার হয়ে যায়।
পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে এবং নাগরিক সমাজের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স বা আরএএফ-এর মহাপরিদর্শক সীমা ধুন্ধিয়া একটি বিশেষ ভার্চুয়াল জরুরি বৈঠক আহ্বান করতে বাধ্য হন।
এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে তিনি যন্তর মন্তরে শিক্ষার্থীদের ওপর এহেন অমানবিক বলপ্রয়োগের ঘটনাটিকে সরাসরি সম্পূর্ণ ‘অন্যায়’ ও ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে আখ্যায়িত করেন। একইসঙ্গে উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে তিনি একটি কঠোর ও সময়োপযোগী নির্দেশ জারি করে জানিয়েছেন যে, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত দিল্লি এবং এর আশপাশের সমগ্র এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যেকোনো ইউনিটের জন্য পেলেট গান, দাঙ্গা-নিরোধক বন্দুক এবং ইলেকট্রিক শিল্ডের ব্যবহার ও বিতরণ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ থাকবে।
পাশাপাশি, ঠিক কোন পরিস্থিতিতে এবং কার প্ররোচনায় এমন চরম পদক্ষেপ নেওয়া হলো, তা নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখতে বাহিনীর অভ্যন্তরে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের ওপর প্রাণঘাতী এই অস্ত্র ব্যবহারের মর্মান্তিক ঘটনাটি কেবল পুলিশের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলার অভাবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি ভারতের জাতীয় রাজনীতি ও বিচার বিভাগীয় অঙ্গনেও এক প্রবল আলোড়নের সৃষ্টি করেছে।
দেশের প্রধান বিরোধী দলগুলো এই ন্যক্কারজনক ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে একে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ওপর চরম আঘাত বলে অভিহিত করেছে। তারা অবিলম্বে দেশের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের আনুষ্ঠানিক বিবৃতি ও জবাবদিহি দাবি করেছে।
তাদের মতে, বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশে শান্তিপূর্ণ ছাত্র আন্দোলনের ওপর এমন বর্বরোচিত ও রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট হামলা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না এবং এর জন্য দায়ীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা প্রয়োজন।
অন্যদিকে, এই চরম বিতর্কিত পেলেট গান ব্যবহারের বিষয়টি এরই মধ্যে ভারতের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়িয়েছে। দেশের সাধারণ নাগরিকদের সাংবিধানিক নিরাপত্তা ও মৌলিক মানবাধিকার রক্ষায় ভারতীয় পুলিশ সার্ভিস বা আইপিএস-এর প্রাক্তন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যশবর্ধন আজাদসহ আরও তিন বিশিষ্ট নাগরিক সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন।
প্রখ্যাত মানবাধিকার আইনজীবী বৃন্দা গ্রোভারের মাধ্যমে দায়ের করা এক জরুরি জনস্বার্থ বিষয়ক আবেদনে তারা দেশের সর্বোচ্চ আদালতের কাছে বিনীত আবেদন জানিয়েছেন। আবেদনে তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে যেকোনো ধরনের বিক্ষোভ দমনে সব ধরনের পেলেট গান বা কাইনেটিক প্রজেক্টাইলের ব্যবহার চিরতরে ও স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি এই সংক্রান্ত পূর্ববর্তী সকল নিয়ম সম্পূর্ণরূপে বাতিল করার সুস্পষ্ট নির্দেশ প্রদানের জন্য আদালতের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন।