প্রযুক্তির এমন ভয়ংকর ও নিষ্ঠুর অপব্যবহারের মাধ্যমে মানসিক নির্যাতনের এই নজিরবিহীন ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে তীব্র ক্ষোভ এবং আলোড়নের সৃষ্টি করেছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই রোমহর্ষক ও অমানবিক ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ উঠে এসেছে, যা পারিবারিক সহিংসতার এক নতুন ও ভয়ংকর রূপ উন্মোচন করেছে।
চাঞ্চল্যকর ও হৃদয়বিদারক এই ঘটনাটি ঘটেছে গত রোববার সন্ধ্যায় কর্ণাটক রাজ্যের বাগালকোট জেলায়। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের বরাত দিয়ে জানা যায়, নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া ওই হতভাগ্য তরুণীর নাম বাগশ্রী জিগালুর, যার বয়স ছিল মাত্র তেইশ বছর।
অন্যদিকে, এই পৈশাচিক ঘটনার মূল হোতা তথা তার স্বামীর নাম প্রবীন জিগালুর। পুলিশি তদন্তে প্রাথমিকভাবে উঠে এসেছে যে, স্বামী প্রবীনের মনে দীর্ঘদিন ধরেই সন্দেহ ছিল যে তার স্ত্রী হয়তো পরকীয়ায় জড়িত। এই সন্দেহ থেকেই তাদের দাম্পত্য জীবনে চরম অশান্তির সূত্রপাত ঘটে।
পারিবারিক এই দ্বন্দ্বের জেরে গত প্রায় দুই মাস ধরে বাগশ্রী স্বামীর বাড়ি ছেড়ে নিজের বাবার বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। কিন্তু সম্প্রতি পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে প্রবীন তার শ্বশুরবাড়িতে যায়।
সেখানে সে তার স্ত্রীকে বোঝাতে সক্ষম হয় যে, অতীতের সকল ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটিয়ে তারা নতুন করে একসঙ্গে বসবাস শুরু করবে। স্বামীর এই প্রলোভন ও মিথ্যা আশ্বাসে বিশ্বাস করে বাগশ্রী নিজের বাড়িতে ফিরে আসতে রাজি হন। কিন্তু তিনি ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেননি যে, এই ফেরা তার জীবনের শেষ ফেরা হতে চলেছে।
স্ত্রীকে নিজের বাড়িতে ফিরিয়ে আনার দিন সন্ধ্যায়ই প্রবীন তার পূর্বপরিকল্পিত ও নিষ্ঠুর হত্যার নীলনকশা বাস্তবায়ন করে। পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, প্রবীন প্রথমে একটি ভারী কাঠের গুঁড়ি দিয়ে বাগশ্রীর ওপর আকস্মিক ও প্রাণঘাতী আঘাত হানে।
এই অতর্কিত হামলায় বাগশ্রী যখন দুর্বল ও প্রতিরোধহীন হয়ে পড়েন, ঠিক তখনই প্রবীন একটি সবুজ রঙের ওড়না দিয়ে তার গলায় ফাঁস লাগিয়ে দেয়। তবে এই হত্যাকাণ্ডের সবচেয়ে ভয়ংকর ও অমানবিক দিকটি উন্মোচিত হয় এর পরবর্তী ধাপে।
গলায় ফাঁস লাগানোর পর যখন বাগশ্রী বাঁচার জন্য এবং একটুখানি শ্বাস নেওয়ার আশায় তীব্র যন্ত্রণায় ছটফট করছিলেন, তখন সেই পাষণ্ড স্বামী তাকে বাঁচানোর সামান্যতম চেষ্টা তো করেইনি, উল্টো পকেট থেকে মুঠোফোন বের করে এই মৃত্যুযন্ত্রণার দৃশ্য ধারণ করতে শুরু করে।
প্রবীনের নিষ্ঠুরতা এখানেই থেমে থাকেনি। সে তাৎক্ষণিকভাবে তার শ্বশুর-শাশুড়ি অর্থাৎ বাগশ্রীর বাবা-মাকে ভিডিও কল করে এবং তাদের চোখের সামনেই নিজের মেয়েকে একটু একটু করে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে দেখতে বাধ্য করে।
সন্তানের এমন ভয়ংকর ও যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু নিজ চোখে দেখার পর ওই হতভাগ্য বাবা-মায়ের মানসিক অবস্থা কী হতে পারে, তা কল্পনা করতেও শিউরে ওঠে সাধারণ মানুষ। শুধু বাবা-মাকেই নয়, প্রবীন তার এই পৈশাচিক উল্লাসের প্রমাণস্বরূপ হত্যার ওই মর্মান্তিক দৃশ্যটি তাদের অন্যান্য আত্মীয়স্বজনের কাছেও ডিজিটাল মাধ্যমে পাঠিয়ে দেয়।
একজন মানুষের মৃত্যুযন্ত্রণা নিয়ে এমন পাশবিক উল্লাস ও মানসিক বিকৃতির ঘটনা স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনকেও হতবাক করেছে। দৃশ্যটিতে বাগশ্রীর গলায় সবুজ ওড়না পেঁচিয়ে ফাঁস দেওয়ার যে খণ্ডচিত্র ধারণ করা হয়েছে, তা আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর হস্তগত হয়েছে।
ঘটনার খবর পাওয়া মাত্রই বাগালকোট জেলার স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন অত্যন্ত দ্রুততার সাথে ঘটনাস্থলে ছুটে যায়। তারা তাৎক্ষণিকভাবে সেখানে অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত প্রবীনকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। বর্তমানে প্রবীনকে পুলিশি হেফাজতে নিয়ে এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের পেছনের প্রতিটি কারণ ও পূর্বপরিকল্পনার বিষয়ে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
একই সাথে নিহত বাগশ্রীর মৃতদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করছেন, পারিবারিক সহিংসতার সাথে প্রযুক্তির এমন ভয়ংকর সংমিশ্রণ অপরাধের মাত্রাকে এক নতুন ও বিপজ্জনক পর্যায়ে নিয়ে গেছে, যা এখনই কঠোর আইনের মাধ্যমে দমন করা প্রয়োজন।