মঙ্গলবার, জুলাই ২৮, ২০২৬
১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চাপের মুখে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহারের পথে শুভেন্দু সরকার!

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৮ জুলাই, ২০২৬, ০৫:০৫ পিএম

চাপের মুখে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহারের পথে শুভেন্দু সরকার!
ছবি: সংগৃহীত

চিকিৎসাশাস্ত্রের প্রবেশিকা পরীক্ষা বা নিট-এর প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো ভয়াবহ দুর্নীতির প্রতিবাদে রাস্তায় নামা সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সকল মামলা প্রত্যাহারের নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার।

 

দেশজুড়ে চলমান তীব্র সমালোচনা এবং রাজনৈতিক চাপের মুখে নতিস্বীকার করে অবশেষে এই পথে হাঁটতে বাধ্য হলো মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন প্রশাসন। প্রতিবেশী রাজ্য বিহার এবং আসামের পদাঙ্ক অনুসরণ করে তৃতীয় রাজ্য হিসেবে পশ্চিমবঙ্গও আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে গৃহীত কঠোর আইনি পদক্ষেপগুলো পর্যায়ক্রমে শিথিল করার এই যুগান্তকারী প্রক্রিয়া শুরু করেছে।

 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা রাজ্য সরকারের এই পিছু হটাকে অধিকার আদায়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের এক বড় বিজয় হিসেবেই দেখছেন। ঘটনার সূত্রপাত ঘটে মূলত গত সোমবার, যখন আন্দোলনরত নিরীহ শিক্ষার্থীদের ওপর দেশের বিভিন্ন রাজ্যে পুলিশের নির্বিচার ধরপাকড় ও অভিযানের তীব্র ভাষায় সমালোচনা করে রাজনৈতিক সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপি।

 

সংগঠনটির শীর্ষ নেতারা এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে দাবি করেন যে, কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধিরা ইতিপূর্বেই আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সব মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার এবং আটককৃত সাধারণ শিক্ষার্থীদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিঃশর্ত মুক্তির সুস্পষ্ট আশ্বাস দিয়েছিলেন।

 

কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতির কোনো দৃশ্যমান বাস্তবায়ন না হওয়ায় সিজেপি নেতারা কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারগুলোকে তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতির কথা পুনরায় স্মরণ করিয়ে দেন। শুধু তাই নয়, সিজেপির পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয় যে, পশ্চিমবঙ্গ, বিহার ও আসামের মতো রাজ্যগুলোতে আটক হওয়া সকল আন্দোলনকারীর জন্য তারা ইতোমধ্যে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে আইনি সহায়তা প্রদানের সার্বিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।

 

এর পাশাপাশি প্রশাসনকে চরম সময়সীমা বেঁধে দিয়ে তারা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে যে, মঙ্গলবারের মধ্যে কারাবন্দি সকল শিক্ষার্থীকে মুক্তি দেওয়া না হলে এবং মামলা প্রত্যাহারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসলে দেশব্যাপী আরও বৃহত্তর ও কঠোর কর্মসূচির ডাক দেওয়া হবে।

 

ককরোচ জনতা পার্টির এই কঠোর ও সময়বদ্ধ ঘোষণার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে এর ব্যাপক প্রভাব দৃশ্যমান হতে শুরু করে। পরিস্থিতির অবনতি এড়াতে সবার আগে বিহার রাজ্য সরকার একটি জরুরি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে কারাবন্দি আটক আন্দোলনকারীদের মুক্তির আইনি উদ্যোগ গ্রহণের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে।

 

বিহারের এই ঘোষণার পরপরই আসাম সরকারও নড়েচড়ে বসে। আসাম প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি বিশেষ সরকারি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয় যে, সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া অন্তত পাঁচটি পৃথক মামলায় আটককৃত মোট ১৩ জনকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়া হবে।

 

এই মুক্তি ও মামলা প্রত্যাহারের আইনি প্রক্রিয়া সুচারুভাবে সম্পন্ন করার জন্য আসাম সরকারের পক্ষ থেকে চার দফা সম্বলিত একটি সুনির্দিষ্ট নির্দেশনাও জারি করা হয়, যা প্রশাসন যন্ত্রকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করে।

 

বিহার ও আসামের এই দ্রুতগতির প্রশাসনিক পদক্ষেপের পর প্রবল চাপের মুখে পড়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকারও শেষ পর্যন্ত একই ধরনের নমনীয় নীতি গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। প্রশাসনিক ও পুলিশি সূত্রগুলোর মতে, প্রকৃত ছাত্র আন্দোলনকারী যারা কেবল মেধার মূল্যায়নের দাবিতে রাস্তায় নেমেছিলেন, তাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বা হয়রানিমূলক মামলাগুলো প্রত্যাহারের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে।

 

তবে সরকার একটি বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর ও অনড় অবস্থান ব্যক্ত করেছে। আর তা হলো, আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে দায়িত্ব পালনরত সাংবাদিকদের ওপর যেসব ন্যাক্কারজনক হামলার ঘটনা ঘটেছে, ভুক্তভোগী সাংবাদিকদের সুস্পষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে দায়ের হওয়া সেই মামলাগুলোর তদন্ত এবং বিচারিক কার্যক্রম নিজস্ব গতিতেই চলতে থাকবে।

 

যদিও একটি নমনীয় পদক্ষেপ হিসেবে সরকার ইঙ্গিত দিয়েছে যে, ওই নির্দিষ্ট মামলাগুলোর সাথে সংশ্লিষ্ট অভিযুক্ত ব্যক্তিদের আপাতত আর পুলিশি হেফাজতে বা আটকে রাখা হবে না, তবে তাদের দীর্ঘমেয়াদী আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।

 

উল্লেখ্য, গত শুক্রবার পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতার প্রাণকেন্দ্র ধর্মতলায় নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের নজিরবিহীন দুর্নীতির প্রতিবাদে এক বিশাল বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছিল। শান্তিপূর্ণভাবে শুরু হওয়া সেই সমাবেশকে কেন্দ্র করে একপর্যায়ে ব্যাপক উত্তেজনা ও চরম বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়।

 

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার উপক্রম হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সেখানে ব্যাপক অভিযান পরিচালনা করে এবং সোমবার পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকা থেকে মোট ১৬ জনকে গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে যায়।

 

এই শ্বাসরুদ্ধকর ও উত্তেজনাময় পরিস্থিতি কভার করার সময় চরম দুর্ভাগ্যজনকভাবে কয়েকজন সংবাদকর্মীও উচ্ছৃঙ্খল জনতার হামলার শিকার হন, যা পুরো আন্দোলনকে কিছুটা হলেও কালিমালিপ্ত করে।

 

সহিংস ঘটনার পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেন যে, ধর্মতলার ওই স্বতঃস্ফূর্ত ছাত্র বিক্ষোভে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে বাইরে থেকে ভাড়াটে লোক এনে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অশান্তি ও নৈরাজ্যের পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল।

 

তিনি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, পুলিশি তদন্তে ইতোমধ্যে অন্তত ৭০ জন বহিরাগত দুষ্কৃতিকারীকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। সরকারি ভাষ্যমতে, এই শনাক্তকৃত ব্যক্তিদের সাথে প্রকৃত ছাত্র আন্দোলন কিংবা ককরোচ জনতা পার্টির কোনো ধরনের আদর্শিক বা সাংগঠনিক সম্পর্ক নেই; বরং তারা নিছকই রাজনৈতিক ফায়দা লোটার জন্য সেখানে অনুপ্রবেশ করেছিল।

 

রাজ্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে বারবার এই বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে যে, সরকার অত্যন্ত সতর্কতার সাথে প্রকৃত আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী দুষ্কৃতিকারীদের সম্পূর্ণ আলাদা দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করছে।

 

আর ঠিক সেই কারণেই কেবল ছাত্র আন্দোলনে অংশ নেওয়া সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ রক্ষার্থে তাদের বিরুদ্ধে নেওয়া আইনি পদক্ষেপ প্রত্যাহারের এই বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে, যেন তাদের শিক্ষাজীবন কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।

 

তবে সহিংসতা ছড়ানো এবং গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলে পরিচিত গণমাধ্যমের কর্মীদের ওপর হামলার মতো গুরুতর ফৌজদারি অপরাধের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের আপস করা হবে না এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে।

 

- আরএনএস