মঙ্গলবার, জুলাই ২৮, ২০২৬
১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ভারতীয় সংসদে বিরোধীদের তোপ

শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে সরিয়ে প্রধানমন্ত্রীকেই বাঁচিয়েছে বিজেপি

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৮ জুলাই, ২০২৬, ০৫:৪৯ পিএম

শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে সরিয়ে প্রধানমন্ত্রীকেই বাঁচিয়েছে বিজেপি
ছবি : File Photo

ভারতের শিক্ষাব্যবস্থায় সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় কলঙ্ক হিসেবে বিবেচিত প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। সর্বভারতীয় স্তরের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগুলোর প্রশ্নপত্র ফাঁসের জেরে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া তীব্র ছাত্র আন্দোলনের মুখে চলতি সপ্তাহের শুরুতে বাধ্য হয়ে পদত্যাগ করেছেন ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান।

 

দীর্ঘ প্রায় দুই মাস ধরে রাজধানী দিল্লির যন্তর মন্তরে দেশের লাখ লাখ তরুণ ও শিক্ষার্থী নিজেদের মেধার প্রতি সুবিচার এবং স্বচ্ছতার দাবিতে যে লাগাতার ও আপসহীন আন্দোলন চালিয়ে আসছিলেন, শিক্ষামন্ত্রীর এই পদত্যাগ তারই একটি প্রাথমিক বিজয় বলে মনে করা হচ্ছে।

 

তবে এই পদত্যাগের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারতীয় লোকসভায় ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানিয়েছেন বিরোধী দলের শীর্ষ নেতারা। তাদের দাবি, সার্বিক ব্যর্থতার দায়ভার থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে সুরক্ষিত রাখতেই সুকৌশলে শিক্ষামন্ত্রীকে বলির পাঁঠা বানানো হয়েছে।

 

মঙ্গলবার ভারতীয় পার্লামেন্টের অধিবেশনে প্রশ্নপত্র ফাঁসের নজিরবিহীন কেলেঙ্কারি এবং শিক্ষামন্ত্রীর আকস্মিক পদত্যাগের বিষয়টি নিয়ে এক উত্তপ্ত বিতর্কের সৃষ্টি হয়। এই বিতর্কে অংশ নিয়ে উত্তরপ্রদেশের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও সমাজবাদী পার্টির শীর্ষ নেতা অখিলেশ যাদব ক্ষমতাসীন জোটের চরম সমালোচনা করেন।

 

লোকসভার এই প্রভাবশালী সদস্য অত্যন্ত শ্লেষাত্মক ভাষায় মন্তব্য করেন যে, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে তার পদ থেকে সরিয়ে দিয়ে বিজেপি সরকার মূলত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকেই আসন্ন রাজনৈতিক বিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে।

 

তিনি লোকসভায় দাঁড়িয়ে জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করে বলেন, যদি ক্রমবর্ধমান ছাত্র বিক্ষোভের মুখে ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগে বাধ্য না করা হতো, তবে এই তীব্র গণঅসন্তোষের চূড়ান্ত দায়ভার সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর ওপরেই বর্তাতো এবং পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারত যেখানে স্বয়ং নরেন্দ্র মোদিকেই হয়তো পদত্যাগ করতে হতো।

 

পার্লামেন্টে নিজের বক্তব্যের সপক্ষে যুক্তি তুলে ধরে অখিলেশ যাদব আরও বলেন যে, বর্তমান সরকারের অন্তত এই ভেবে স্বস্তি পাওয়া উচিত যে তারা একজন মন্ত্রীকে সরিয়ে নিজেদের সর্বোচ্চ নেতাকে রক্ষা করতে পেরেছে।

 

একই সাথে তিনি রাজপথে আন্দোলনরত তরুণ প্রজন্মের প্রতি গভীর সম্মান প্রদর্শন করে বলেন, এই দেশের তরুণ সমাজ যে ন্যায়ের দাবিতে রাস্তায় নেমেছে, সরকারের উচিত অবিলম্বে তাদের উত্থাপিত প্রতিটি যৌক্তিক দাবি সম্পূর্ণভাবে মেনে নেওয়া।

 

তার মতে, একটি গণতান্ত্রিক সরকার সবসময়ই জনগণের শক্তির কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়, তবে সেই নতি স্বীকার করানোর জন্য রাজপথে এমন অদম্য শক্তির উত্থান একান্ত প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের এই ইস্পাতকঠিন আন্দোলন প্রমাণ করেছে যে, ঐক্যবদ্ধ জনতার চাপের মুখে যেকোনো স্বৈরতান্ত্রিক সিদ্ধান্তই মাথা নত করতে বাধ্য।

 

অখিলেশ যাদবের এই তীক্ষ্ণ সমালোচনার পাশাপাশি লোকসভার সদস্য অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও পার্লামেন্টে সরকারের দমন-পীড়ন নীতির বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই ভ্রাতুষ্পুত্র তার অত্যন্ত সারগর্ভ ও প্রতিবাদী বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে, মোদি সরকারের একটি বড় রাজনৈতিক দুর্বলতা হলো তারা যেকোনো স্বতঃস্ফূর্ত গণতান্ত্রিক আন্দোলনকেই রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র হিসেবে বিবেচনা করার চেষ্টা করে।

 

সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার ও ন্যায়সংগত দাবির কথা শোনার বা বোঝার ন্যূনতম সদিচ্ছা এই সরকারের নেই বলেও তিনি অভিযোগ করেন। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় পার্লামেন্টের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, গত দুই মাস ধরে ভারতের ভবিষ্যৎ হিসেবে পরিচিত লাখ লাখ তরুণ ও মেধাবী শিক্ষার্থী দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এবং রাজপথে দিনের পর দিন তীব্র রোদ ও বৃষ্টি উপেক্ষা করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছে।

 

তারা তাদের চুরি যাওয়া ভবিষ্যৎ ও মেধার অবমূল্যায়নের বিরুদ্ধে সরকারের কাছে বেশ কিছু যৌক্তিক ও সরাসরি প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছিল। কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার পরিবর্তে সরকার সেই নিরস্ত্র ও নিরীহ শিক্ষার্থীদের পুলিশি লাঠিচার্জ এবং ব্যারিকেড দিয়ে দমন করার চেষ্টা করেছে।

 

সরকারের এই ধরনের অসহিষ্ণু আচরণের তীব্র নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেন, যখনই দেশের আপামর জনসাধারণ তাদের অধিকার আদায়ের জন্য রাজপথে নেমে আসে, তখনই বর্তমান প্রশাসন সেই আন্দোলনকে দমন করার জন্য ষড়যন্ত্রের কাল্পনিক তত্ত্ব দাঁড় করায়।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর বিশ্লেষণেও এটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো সংবেদনশীল ঘটনা ভারতের শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতাকে চরমভাবে উন্মোচিত করেছে।

 

শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের মাধ্যমে সরকার আপাতত পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলেও বিরোধী দলগুলোর ধারাবাহিক চাপ এবং তরুণ সমাজের ক্ষোভ প্রশমনে মোদি সরকারকে আগামী দিনে আরও কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি তাদের এক বিশেষ প্রতিবেদনে লোকসভার এই উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় ও রাজনৈতিক সমীকরণের চিত্রটি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তুলে ধরেছে।

 

- এনডিটিভি