ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েছেন সেখানে উপস্থিত বহু ক্রেতা ও দর্শনার্থী। এই আকস্মিক প্রাকৃতিক দুর্যোগে সারা দেশে এখন পর্যন্ত অসংখ্য মানুষের আহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছে স্থানীয় প্রশাসন। গুরুতর অবস্থায় অন্তত পঞ্চাশজন ব্যক্তিকে উদ্ধার করে বিভিন্ন হাসপাতালে নিবিড় চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয়েছে।
উদ্ধারকারী দলগুলো চরম উৎকণ্ঠার মাঝেও ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া মানুষদের নিরাপদে বের করে আনতে অত্যন্ত সাবধানে ও নিরলসভাবে তাদের অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। জাপানের আবহাওয়া দপ্তরের প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মঙ্গলবার স্থানীয় সময় ঠিক বিকেল ৪টা ২৭ মিনিটে এই শক্তিশালী ভূমিকম্পটি আঘাত হানে, যার কেন্দ্রস্থল ছিল তুলনামূলকভাবে অগভীর।
জাপানি আবহাওয়া সংস্থা ভূকম্পনের মাত্রা ৭ দশমিক ১ বলে উল্লেখ করলেও, যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) তাদের নিজস্ব পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে যে ভূমিকম্পটির প্রকৃত মাত্রা ছিল ৬ দশমিক ৮। কম্পনের তীব্রতা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, মুহূর্তের মধ্যেই পুরো অঞ্চলে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
ভূমিকম্পের পরপরই সম্ভাব্য সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস বা সুনামির আশঙ্কায় উপকূলীয় এলাকাগুলোতে জরুরিভিত্তিতে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছিল। তবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ শেষে সমুদ্রপৃষ্ঠের অবস্থা স্বাভাবিক ও বিপদমুক্ত মনে হওয়ায় কয়েক ঘণ্টা পর কর্তৃপক্ষ সেই সুনামি সতর্কতা আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে নেয়, যা উপকূলবর্তী এলাকার আতঙ্কিত বাসিন্দাদের মনে কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়।
এই তীব্র ভূকম্পনের ফলে জাপানের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক ভৌত ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়েছে, যার প্রভাব জনজীবনে গভীরভাবে দৃশ্যমান হচ্ছে। জাপানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম এনএইচকের মাধ্যমে সম্প্রচারিত বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণে দেখা গেছে, দেশের অন্যতম প্রধান দ্বীপ কায়ুসুসহ একাধিক স্থানে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।
শক্তিশালী কম্পনের জেরে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা যোগাযোগ ব্যবস্থাকে ব্যাহত করেছে। এছাড়া রেললাইনের ব্যাপক ক্ষতির কারণে একটি চলন্ত মালবাহী ট্রেন ভয়াবহভাবে লাইনচ্যুত হয়ে পড়ে থাকতে দেখা গেছে।
বিভিন্ন প্রধান মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কে গভীর ফাটল সৃষ্টি হওয়ায় যান চলাচল কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত অন্তত ১২টি আবাসিক ভবন সম্পূর্ণভাবে ধসে পড়ার মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে।
বিশেষ করে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের একটি বহুতল ভবনে ভূমিকম্পের পরপরই যে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়, তা পরিস্থিতিকে আরও বেশি জটিল ও ভীতিকর করে তুলেছে। সার্বিক ক্ষয়ক্ষতি ও দেশব্যাপী চলমান উদ্ধার তৎপরতা নিয়ে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাচি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জাতির উদ্দেশে এক গুরুত্বপূর্ণ বিবৃতি প্রদান করেছেন।
তিনি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে জানিয়েছেন, সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে আহতদের বর্তমান অবস্থা ও দেশব্যাপী অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ নিরূপণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তাঁর বার্তায় বলেন, ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজন নাগরিকের আহত হওয়ার প্রাথমিক ও সুনির্দিষ্ট তথ্য সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কাছে পৌঁছেছে।
ভূকম্পনের প্রভাবে কিছু নির্দিষ্ট অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে এবং একাধিক স্থানে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে বলেও তিনি নিশ্চিত করেন। সড়ক, সেতু এবং ভবন ধসে পড়ার কারণে উদ্ধারকাজে যে সাময়িক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে, তা দ্রুত নিরসনে সরকারি সকল বাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
যেকোনো মূল্যে আটকে পড়া মানুষদের জীবন রক্ষা করতে সরকার তাদের সর্বোচ্চ সক্ষমতা নিয়ে কাজ করছে বলে তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। এদিকে এই দুর্যোগের সবচেয়ে মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক দৃশ্যটি পরিলক্ষিত হয়েছে কাশিমা শহরের কেন্দ্রস্থলে।
সেখানে 'ইওন' নামের একটি সুপরিচিত ও ব্যস্ত বহুতল শপিং মলের দ্বিতীয় তলার বিশাল অংশ অত্যন্ত আকস্মিকভাবে ধসে পড়ে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের শীর্ষ কর্মকর্তারা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ভবনটির একাংশ বিকট শব্দে ধসে পড়ার কারণে এর ভেতরে অবস্থানরত বহু সাধারণ মানুষ চরম বিপদের মুখে আটকা পড়েছেন।
স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন জানিয়েছে, ভূমিকম্পের মূল আঘাত হানার ঠিক পরপরই ওই শপিং মলের ভেতর থেকে তীব্র বিস্ফোরণের মতো বিকট শব্দ শোনা যাওয়ার তথ্য তাদের কাছে এসেছিল। প্রথমদিকে ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান তাদের কাছে পৌঁছায়নি, তবে সময় গড়ানোর সাথে সাথে আটকে পড়াদের স্বজনদের আর্তনাদে এলাকার পরিবেশ ভারী হয়ে উঠেছে।
আধুনিক প্রযুক্তি ও ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে আটকা পড়া মানুষদের জীবিত উদ্ধারে দমকল বাহিনী, পুলিশ ও জরুরি উদ্ধারকর্মীরা একযোগে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। পুরো জাপানসহ বিশ্ববাসী এখন উদ্ধারকাজের এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির দিকে চরম উৎকণ্ঠা নিয়ে তাকিয়ে আছে, সকলের একটাই প্রার্থনা-যেন ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে প্রতিটি প্রাণ নিরাপদে ফিরে আসে।