জেন-জি (Gen-Z) বা নতুন প্রজন্মের এই স্বতঃস্ফূর্ত ও ধারাবাহিক বিক্ষোভ যখন পুরো দেশের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে, ঠিক তখনই এই আন্দোলনকারীদের চরম কটাক্ষ করে এক বড়সড় রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন ভারতের ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য এবং জনপ্রিয় বলিউড অভিনেত্রী কঙ্গনা রানাউত।
তরুণ আন্দোলনকারীদের অত্যন্ত অবমাননাকর ভাষায় ‘নর্দমার জেনারেশন’ বা ‘জেনারেশন গাটার’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তিনি ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে তীব্র সমালোচনার ঝড় তুলেছেন।
হিমাচল প্রদেশের মান্ডি লোকসভা কেন্দ্র থেকে নির্বাচিত বিজেপি সাংসদ কঙ্গনা রানাউত সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে এই চলমান ছাত্র আন্দোলন এবং এর সঙ্গে যুক্ত তরুণ-তরুণীদের নিয়ে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ও তির্যক মন্তব্য করেন।
আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন প্রতিবাদী কর্মসূচির যেসব ছোট ভিডিও বা রিলস সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ভাইরাল হয়েছে, সেগুলোকে তিনি সরাসরি ‘বমি উদ্রেককারী’ বলে অভিহিত করেছেন। তার মতে, তরুণ প্রজন্মের এই প্রতিবাদের ভাষা অত্যন্ত কর্কশ, দৃষ্টিকটু এবং সম্পূর্ণরূপে অশোভন।
এখানেই থেমে না থেকে তিনি রাজপথে নেমে আসা এই তরুণ শিক্ষার্থীদের পারিবারিক শিক্ষা এবং লালনপালন নিয়েও চরম আপত্তিকর প্রশ্ন তুলেছেন। নিজের তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘কারা এদের জন্ম দিচ্ছে এবং কারা এদের বড় করছে?’
বিশেষ করে, রাজধানী দিল্লির যন্তর মন্তরে চলমান এই বিক্ষোভে অংশ নেওয়া তরুণীদের উদ্দেশ করে কঙ্গনা রানাউতের মন্তব্যগুলো রাজনৈতিক ও নাগরিক মহলে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি করেছে।
তিনি এই প্রতিবাদী তরুণীদের উদ্দেশ্য করে ‘জেনারেশন গাটার’ বা ‘নর্দমার জেনারেশন’ শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করেছেন, যা একটি গণতান্ত্রিক দেশে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের প্রতি একজন জনপ্রতিনিধির চরম অসহিষ্ণুতার নগ্ন বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।
কঙ্গনার এই ধরনের কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যের জেরে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকদের মধ্যেও তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। ভারতের চিকিৎসা বিজ্ঞানে অধ্যয়নের স্বপ্ন দেখা লাখ লাখ মেধাবী শিক্ষার্থীর কাছে নিট পরীক্ষা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
কিন্তু চলতি বছরে এই পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং উত্তরপত্র মূল্যায়নে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর দেশজুড়ে শিক্ষাব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে এক বিশাল প্রশ্নচিহ্ন দেখা দেয়। ভবিষ্যৎ অন্ধকারে নিমজ্জিত হওয়ার আশঙ্কায় লাখ লাখ তরুণ শিক্ষার্থী বাধ্য হয়ে রাজপথে নেমে আসে।
কিন্তু এই ধরনের একটি স্পর্শকাতর ও যৌক্তিক আন্দোলনের প্রতি ন্যূনতম সহানুভূতিশীল না হয়ে কঙ্গনা রানাউত যেভাবে প্রকাশ্যে তাদের ব্যক্তিগত আক্রমণ করেছেন, তা সচেতন মহলকে গভীরভাবে হতাশ করেছে। আন্দোলনকারীদের রাজনৈতিক ও কাঠামোগত পরিবর্তনের দাবিগুলোকেও তিনি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
তার মতে, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সাধারণ নাগরিকরা কখনোই একটি বৈধ ও নির্বাচিত সরকারকে কোনো নির্দিষ্ট কর্মকর্তাকে বরখাস্ত বা বহাল রাখার বিষয়ে জোরজুলুম করতে পারে না।
তিনি আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের একপ্রকার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেন, বিক্ষোভকারীরা যদি দেশের প্রচলিত শাসনব্যবস্থায় কোনো সত্যিকারের পরিবর্তন আনতে চায়, তবে যন্তর মন্তরের মতো জায়গায় বসে সরকারের ওপর অযৌক্তিক শর্ত আরোপ করার কোনো অধিকার তাদের নেই।
এর বদলে তাদের উচিত সরাসরি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করা এবং ‘নিজেরাই নির্বাচনে দাঁড়ানো’। শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনকে ঘিরে সম্ভাব্য সহিংসতার আশঙ্কার কথাও নিজের বক্তব্যে অত্যন্ত জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন মান্ডির এই বিজেপি সাংসদ।
তিনি দাবি করেন, বিক্ষোভ চলাকালীন সংসদ বা সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ভবনের ভেতরে অবস্থানরত সংসদ সদস্যরা চরম আতঙ্কের মধ্যে সময় পার করছিলেন। তাদের ভেতরে এক ধরনের ভীতি কাজ করছিল যে, যেকোনো মুহূর্তে বিক্ষুব্ধ জনতার এই ভিড় সহিংস রূপ ধারণ করে ভবনের ভেতরে থাকা জনপ্রতিনিধিদের ওপর প্রাণঘাতী হামলা চালাতে পারে।
এই চরম উত্তেজনাকর ও ভীতিকর পরিস্থিতিতে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও কার্যকর প্রতিরক্ষামূলক ঢাল হিসেবে কাজ করার জন্য তিনি দিল্লি পুলিশের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পেশাদারিত্ব ও কঠোর অবস্থানের কারণেই জনপ্রতিনিধিরা সুরক্ষিত ছিলেন এবং যেকোনো বড় ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত সহিংসতা এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
কঙ্গনা রানাউতের এই বিতর্কিত মন্তব্যের পর ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গন নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। একদিকে যেমন নিট কেলেঙ্কারির কারণে লাখ লাখ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে, অন্যদিকে ক্ষমতাসীন দলের একজন জনপ্রতিনিধির মুখে শিক্ষার্থীদের প্রতি এমন সংবেদনশীলতাহীন ও অবমাননাকর মন্তব্য সরকারের অস্বস্তি আরও বাড়াবে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
একটি গণতান্ত্রিক সমাজে প্রতিবাদের অধিকার যেখানে সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত, সেখানে জনপ্রতিনিধিদের ভাষা ও আচরণ কতটা পরিশীলিত ও সংযত হওয়া উচিত, এই ঘটনার পর সেই প্রশ্নটিই এখন ভারতের সর্বত্র ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে।