একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্য করে নেওয়া এই আকস্মিক সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় বাসিন্দারা অনির্দিষ্টকালের জন্য শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন।
গত ১৫ জুলাই রামপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানায় যে, বিশাল এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাত্র দুটি ভবনের বৈধ নির্মাণ অনুমোদন রয়েছে। বাকি ৩৮টি ভবন সম্পূর্ণ নিজ খরচে ৫ আগস্টের মধ্যে অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হয়।
অন্যথায় প্রশাসন নিজস্ব উদ্যোগে বুলডোজার চালিয়ে সেগুলো গুঁড়িয়ে দেবে এবং সেই উচ্ছেদ অভিযানের যাবতীয় খরচ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আইনি প্রক্রিয়ায় আদায় করবে বলে সতর্ক করে।
পরবর্তীতে রাজ্য প্রশাসন এই নির্দেশের ওপর একটি সাময়িক স্থগিতাদেশ জারি করলেও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মনে করছে, এটি চূড়ান্ত বাতিল নয়, বরং কেবল সময়সীমা পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য জহিরউদ্দিন জানিয়েছেন, তারা এই নির্দেশের বিরুদ্ধে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন।
তাঁর যুক্তি, বিশ্ববিদ্যালয়টি যখন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তখন ওই নির্দিষ্ট এলাকাটি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের আওতাভুক্ত ছিল না। তাই নতুন করে পুরোনো স্থাপনার ওপর এই বিধি প্রয়োগ করা কোনোভাবেই আইনসম্মত নয়।
ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামীর নামে প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয়টি মূলত মুসলিম শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর লক্ষ্যে নির্মিত হলেও এখানে ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সবাই অধ্যয়ন করেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের তথ্যমতে, এখানকার শিক্ষার্থীদের প্রায় অর্ধেকই নারী এবং এক-তৃতীয়াংশের বেশি শিক্ষার্থী হিন্দু ধর্মাবলম্বী।
পঞ্চম বর্ষের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী ইকরা জানান, বিশ্ববিদ্যালয়টি ভেঙে ফেলা হলে তার মতো অনেক মুসলিম মেয়ের উচ্চশিক্ষার পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে, কারণ নিরাপত্তার কথা ভেবে পরিবার তাদের অন্য কোথাও পড়তে পাঠাবে না।
অন্যদিকে প্রথম বর্ষের প্যারামেডিকেল শিক্ষার্থী চাঁদনি দিবাকরের মতে, এটি একটি সংখ্যালঘু প্রতিষ্ঠান হলেও সেখানে ধর্মের চেয়ে শিক্ষাই প্রধান পরিচয় হিসেবে বিবেচিত হয়। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, এমন একটি প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে হাজারো তরুণের ভবিষ্যৎ নিয়ে নির্মম খেলা হচ্ছে।
এই বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন প্রবীণ মুসলিম রাজনীতিক এবং সমাজবাদী পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা আজম খান। ২০০৩ সালে তিনি একটি ট্রাস্ট গঠন করেন এবং এর তিন বছর পর এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়।
আজীবন ক্ষমতাসীন দলের কঠোর সমালোচক আজম খান উত্তর ভারতের অন্যতম প্রভাবশালী মুসলিম নেতা। ২০১৭ সালে কট্টরপন্থি নেতা যোগী আদিত্যনাথের নেতৃত্বে উত্তর প্রদেশে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই আজম খানের বিরুদ্ধে জমি দখলসহ প্রায় একশটি মামলা দায়ের করা হয়, যার মধ্যে বেশ কয়েকটি সরাসরি এই বিশ্ববিদ্যালয় সংক্রান্ত।
সমাজবাদী পার্টির সাংসদ জাভেদ আলি খানের দাবি, এটি নিছক অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের ঘটনা নয়, বরং একটি সংখ্যালঘু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে পরিকল্পিতভাবে লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়েছে। এর পেছনে আজম খান ও বিরোধী নেতাদের সংশ্লিষ্টতা প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করছে বলে তিনি মনে করেন।
এদিকে, বিশ্ববিদ্যালয় রক্ষার এই শান্তিপূর্ণ আন্দোলন দমাতে প্রশাসন শিক্ষার্থীদের ওপর পরোক্ষ চাপ সৃষ্টি করছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। পুলিশ শিক্ষার্থীদের বাড়িতে গিয়ে আন্দোলন বন্ধ করার জন্য ভয়ভীতি দেখাচ্ছে বলেও দাবি করেছেন আন্দোলনকারীরা।
রামপুর জেলার শিক্ষাক্ষেত্রের চিত্র এমনিতেই বেশ নাজুক। সর্বশেষ আদমশুমারি অনুযায়ী, উত্তর প্রদেশের ৭৫টি জেলার মধ্যে সাক্ষরতার হারের দিক থেকে রামপুর একদম তলানির দিকে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে জেলার একমাত্র পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়টি বন্ধ হয়ে গেলে এই অঞ্চলের নারীদের শিক্ষা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতে সংখ্যালঘু বিশেষ করে মুসলিমদের সম্পত্তি ও ধর্মীয় স্থান ভেঙে ফেলার প্রবণতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক অপূর্বানন্দের মতে, এই ধরনের পদক্ষেপের পেছনে বহুমুখী রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে।
এটি একদিকে যেমন সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটারদের কাছে রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের একটি হাতিয়ার, অন্যদিকে সংখ্যালঘু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে চলমান ধারাবাহিক প্রচারণার অংশ। সর্বোপরি, শিক্ষাঙ্গনে হিন্দু ও মুসলিম শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে সম্প্রীতি ও সামাজিক মেলবন্ধনের সুযোগ তৈরি হয়, তা নষ্ট করার একটি সুপরিকল্পিত কৌশল হিসেবেই এই উচ্ছেদ অভিযানকে দেখছেন বিশ্লেষকরা।