দেশজুড়ে শিক্ষাব্যবস্থায় সংস্কারের দাবিতে চলমান তীব্র ছাত্র বিক্ষোভের মুখে চলতি সপ্তাহের শুরুতেই পদত্যাগ করতে বাধ্য হন সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রহ্লাদ যোশীকে এই গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের নতুন দায়িত্ব প্রদান করে বিজেপি সরকার।
তবে এই নিয়োগ রাজনৈতিক পরিস্থিতি শান্ত করার বদলে নতুন করে এক বিশাল বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই এক সংবাদ বিবৃতিতে রাহুল গান্ধী অভিযোগ করেন যে, বিজেপি সরকার এমন এক ব্যক্তির ওপর দেশের শিক্ষাব্যবস্থার মতো সংবেদনশীল খাতের দায়িত্ব অর্পণ করেছে, যার অতীত অবস্থান চরম বিতর্কিত এবং নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।
রাহুল গান্ধীর এই কঠোর সমালোচনার মূল ভিত্তি হলো ভারতের ইতিহাসের অন্যতম কলঙ্কজনক একটি অধ্যায় এবং সেই ঘটনায় প্রহ্লাদ যোশীর বিতর্কিত অবস্থান। ২০০২ সালে গুজরাট দাঙ্গার সময় সংঘটিত ভয়াবহ সহিংসতায় বিলকিস বানু নামক এক অন্তঃসত্ত্বা নারীকে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করা হয় এবং তার পরিবারের একাধিক সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
এই পৈশাচিক অপরাধের দায়ে আদালত ১১ জন উগ্রবাদীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করেন। কিন্তু দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর ২০২২ সালে গুজরাট রাজ্য সরকারের এক বিশেষ নির্দেশনায় অপরাধীদের মেয়াদ শেষের আগেই কারাগার থেকে আগাম মুক্তি দেওয়া হয়। মূলত ২০১৮ সাল থেকেই এই অপরাধীদের মুক্তির আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল।
বিলকিস বানু মামলার আসামিদের এই আগাম মুক্তির সময় প্রহ্লাদ যোশী যে মন্তব্য করেছিলেন, সেটিই বর্তমান বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ওই সময়ে তিনি দণ্ডিত ধর্ষকদের মুক্তির পক্ষে সাফাই গেয়েছিলেন।
তিনি প্রকাশ্যে মন্তব্য করেছিলেন যে, গুজরাটের ওই অপরাধীরা দীর্ঘ সময় ধরে কারাবাস সম্পন্ন করেছে এবং ভারতীয় আইনে তাদের মুক্তির বিষয়ে একটি সুনির্দিষ্ট বিধান রয়েছে। সুতরাং আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তারা কারাগার থেকে ছাড়া পেলে তাতে তিনি কোনো সমস্যা দেখেন না বলে উল্লেখ করেছিলেন।
২০২২ সালে গুজরাট সরকারের ওই মুক্তির সিদ্ধান্ত ভারতজুড়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। পরবর্তীতে এই আইনি লড়াই ভারতের সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়ায়। অবশেষে ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এক ঐতিহাসিক রায়ে গুজরাট সরকারের সেই আগাম মুক্তির নির্দেশিকাকে সম্পূর্ণ অবৈধ ঘোষণা করেন এবং মুক্তিপ্রাপ্ত ১১ জন অপরাধীকে পুনরায় কারাগারে প্রেরণের কঠোর নির্দেশ দেন।
এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে রাহুল গান্ধী নতুন শিক্ষামন্ত্রীর তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, দেশের তরুণ প্রজন্ম যখন শিক্ষাব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও সংস্কারের দাবিতে রাজপথে নেমে লাগাতার আন্দোলন করছে, ঠিক সেই মুহূর্তে বিজেপি সরকার এমন একজনকে এই পবিত্র দায়িত্ব প্রদান করেছে, যিনি প্রকাশ্যে ধর্ষকদের সুরক্ষা ও মুক্তির পক্ষে কথা বলেছেন।
রাহুল গান্ধী অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, যারা ধর্ষকদের রক্ষাকর্তা হিসেবে কাজ করেন, সমাজের দৃষ্টিতে তারাই সবচেয়ে কলুষিত মানসিকতার অধিকারী। যে ব্যক্তি মনে করেন ধর্ষকদেরও নিরাপত্তার প্রয়োজন রয়েছে, তার চেয়ে নিম্ন মানসিকতার আর কেউ হতে পারেন না বলে তিনি মন্তব্য করেন।
আর এমন চরম বিতর্কিত মানসিকতার একজন ব্যক্তিকেই ভারতের মতো একটি বিশাল গণতান্ত্রিক দেশের শিক্ষামন্ত্রীর পদে বসানো হয়েছে, যা দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি অত্যন্ত ভুল ও বিপজ্জনক বার্তা বহন করে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়ে গভীর বিস্ময় প্রকাশ করে কংগ্রেস নেতা আরও বলেন, এটি সম্পূর্ণ অকল্পনীয় একটি পদক্ষেপ। বিশাল কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় অনেক যোগ্য ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির নেতা থাকা সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী কেন এমন একজন ব্যক্তিকে বেছে নিলেন, যিনি নারী নির্যাতনকারীদের প্রতি সহানুভূতিশীল, তা সত্যিই বোধগম্য নয়।
দেশের শিক্ষাব্যবস্থার নেতৃত্ব এমন একজনের হাতে তুলে দেওয়া, যার অতীত মানবাধিকার লঙ্ঘনের পক্ষের বয়ানে কলঙ্কিত, তা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও নৈতিকতার পরিপন্থী বলে মনে করেন বিরোধীরা। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারতের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে সরকার ও বিরোধীদের মধ্যে উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে, যা আগামী দিনে দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে।