তাঁর এই মন্তব্য দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন করে ঐতিহাসিক বিতর্ক উসকে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা এই মন্তব্যে তিনি মূলত ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরুকে সরাসরি দায়ী করেছেন।
নিশিকান্ত দুবের অভিযোগ, দেশভাগের সময় পণ্ডিত নেহেরু অত্যন্ত উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরের মতো নোয়াখালী, চট্টগ্রাম এবং সিলেট অঞ্চল তৎকালীন পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) কাছে জোরপূর্বক হস্তান্তর করেছিলেন।
বিজেপির এই সংসদ সদস্য তাঁর দাবির সপক্ষে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট টেনে এনে উল্লেখ করেছেন যে, উল্লিখিত এই তিনটি অঞ্চল-নোয়াখালী, চট্টগ্রাম এবং সিলেট-একসময় স্বাধীন ত্রিপুরা রাজ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। ইতিহাস ঘেঁটে তিনি জানান, ত্রিপুরা অতীতে ‘টিপরা’ নামে সর্বজনবিদিত ছিল।
ভারতীয় সংবাদ সংস্থা এশিয়ান নিউজ ইন্টারন্যাশনালকে (এএনআই) দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে নিশিকান্ত দুবে বলেন, ভারতের এখন কেবল পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীর পুনরুদ্ধারের দিকে মনোযোগ দিলেই চলবে না; বরং পণ্ডিত নেহেরু যে অঞ্চলগুলোকে অবহেলা করে জোরপূর্বক অন্যের হাতে তুলে দিয়েছিলেন, সেগুলোকেও নিজ ভূখণ্ডে ফিরিয়ে আনতে হবে।
তিনি তৎকালীন ত্রিপুরার রাজা বীর বিক্রম সিংয়ের সঙ্গে ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রীর কথোপকথন এবং মতবিরোধের বিষয়টি সামনে নিয়ে আসেন। দুবের ভাষ্যমতে, রাজা বীর বিক্রম সিং তাঁর রাজ্যের সীমানা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে নেহেরুর সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে তর্ক করেছিলেন।
রাজা অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে প্রশ্ন তুলেছিলেন যে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী কীভাবে তাঁর নিজস্ব রাজ্য নিয়ে অন্য কোনো পক্ষের সঙ্গে আলোচনা বা চুক্তি করতে পারেন। রাজা বীর বিক্রম সিংয়ের সেই ঐতিহাসিক ক্ষোভের কথা স্মরণ করে দুবে বলেন, ত্রিপুরার রাজা নেহেরুকে সরাসরি জিজ্ঞেস করেছিলেন যে, তিনি কীভাবে নোয়াখালীর মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলকে পাকিস্তানের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
একইসঙ্গে সিলেটে এবং চট্টগ্রামে গণভোট আয়োজনের যৌক্তিকতা নিয়েও তিনি প্রবল আপত্তি জানিয়েছিলেন। রাজার সুস্পষ্ট অবস্থান ছিল যে, ত্রিপুরা তাঁর রাজ্য এবং এটি ভারতের অংশ হবে, পাকিস্তানের অধীনে যাবে, নাকি একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে নিজের অস্তিত্ব বজায় রাখবে-সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার একমাত্র আইনি ও নৈতিক অধিকার কেবল তাঁরই রয়েছে।
এই ঐতিহাসিক টানাপোড়েনের পর ভারতের তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি পরিবর্তিত হয়। দুবে উল্লেখ করেন, সর্দার প্যাটেল ত্রিপুরায় ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রেরণ করেছিলেন এবং পরবর্তীতে ১৯৪৮ সালের অক্টোবর মাসে ত্রিপুরা আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়।
তৎকালীন মহারানি কাঞ্চন প্রভা ১৯৪৮ সালের অক্টোবরে ‘ইনস্ট্রুমেন্ট অব অ্যাকসেশন’ বা ভারতভুক্তির ঐতিহাসিক দলিলে স্বাক্ষর করেন, যার মাধ্যমে ত্রিপুরার ভারতভুক্তি আইনগত বৈধতা লাভ করে। ইতিহাসের পাতা উল্টে নিশিকান্ত দুবে ১৯৪৬ সালে নোয়াখালীতে সংঘটিত ভয়াবহ হিন্দু নিধনের প্রসঙ্গটিও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছেন।
তাঁর অভিযোগ, সেই সময় নোয়াখালীতে হিন্দুদের ওপর যে বর্বরোচিত সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ড চালানো হয়েছিল, তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে পণ্ডিত নেহেরু মুসলিম লীগকে খুশি করতে এবং নিজের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে তাদের অন্তর্ভুক্ত করতেই বেশি ব্যস্ত ছিলেন।
দুবের দাবি অনুযায়ী, সেই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডে প্রায় দশ হাজার হিন্দু ধর্মাবলম্বী প্রাণ হারিয়েছিলেন। বিজেপি নেতার অভিযোগ, জওহরলাল নেহেরু ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য এতটাই মরিয়া ছিলেন যে, তিনি সাধারণ মানুষের জীবনের চেয়ে ক্ষমতার মসনদকে বেশি অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন।
১৯৪৭ সালে ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা লাভ করলেও, নেহেরু মূলত ১৯৪৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর থেকেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। আর ঠিক সেই সময়েই মুসলিম লীগ তাদের কুখ্যাত ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন’ বা প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবসের ডাক দেয়, যার ফলে সারা দেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার আগুন ছড়িয়ে পড়ে।
১৯৪৬ সালের ১৫ অক্টোবর হিন্দু অধ্যুষিত নোয়াখালীতে সংঘটিত গণহত্যার বর্ণনা দিতে গিয়ে নিশিকান্ত দুবে অত্যন্ত আবেগপূর্ণ ভাষায় বলেন, মাত্র এক দিনের ব্যবধানে সেখানে হাজার হাজার মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল।
কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা সত্ত্বেও পণ্ডিত নেহেরু সেই চরম বিপদের দিনে নোয়াখালীর অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে সেখানে যাননি। উল্টো তিনি সেই সময়ে মুসলিম লীগকে কীভাবে নিজের সরকারের অংশীদার করা যায়, সেই রাজনৈতিক সমীকরণ মেলাতেই বেশি মগ্ন ছিলেন।
দুবের মতে, নেহেরুর এই ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির কারণেই নোয়াখালী, চট্টগ্রাম ও সিলেটের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলো চিরতরে ভারতের হাতছাড়া হয়ে যায়, যা আজও ভারতের জন্য একটি বিশাল ঐতিহাসিক ক্ষতি হিসেবে বিবেচিত হয়।
কেবল ঐতিহাসিক নয়, অর্থনৈতিক এবং কৌশলগত দিক থেকেও চট্টগ্রাম বন্দর হাতছাড়া হওয়ার বিষয়টি ভারতের জন্য কতটা ক্ষতিকর হয়েছে, তা-ও স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন এই বিজেপি নেতা। তিনি অত্যন্ত জোরালোভাবে দাবি করেন যে, চট্টগ্রাম বন্দরটি ভারতের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার কারণেই মূলত ভারতের বিস্তীর্ণ উত্তর-পূর্বাঞ্চলের উন্নয়ন পুরোপুরি থমকে গেছে।
আজ যদি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া মনে হয়, সেখানে যদি যোগাযোগ ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা থেকে থাকে, এমনকি সেখানকার প্রাকৃতিক সম্পদ বিশেষ করে খনিজ পদার্থ ও গ্যাস যদি ভারত পুরোপুরি কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়-তবে তার একমাত্র প্রধান কারণ হলো চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর নিয়ন্ত্রণ না থাকা।
দুবের মতে, অঞ্চলটি আজও মূল ভূখণ্ড থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন বলে মনে হওয়ার মূল কারণ এই ভৌগোলিক ও কৌশলগত ত্রুটি। তাই তিনি মনে করেন, উত্তর-পূর্ব ভারতের সামগ্রিক উন্নয়ন ও নিরাপত্তার স্বার্থেই চট্টগ্রাম বন্দর, নোয়াখালী এবং সিলেটকে পুনরায় ভারতের অন্তর্ভুক্ত করার সময় এসে গেছে।
সিলেটের গণভোট এবং সেই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ভূমিকা নিয়েও নিশিকান্ত দুবে কংগ্রেস দলের তীব্র সমালোচনা করেছেন। সিলেটে গণভোট পরিচালনার দায়িত্বে থাকা বাহারুল ইসলামের রাজনৈতিক উত্থানের প্রসঙ্গ টেনে তিনি প্রশ্ন তোলেন যে, নেহেরু যেকোনো উপায়ে ক্ষমতার শীর্ষে থাকতে চেয়েছিলেন বলেই এমন ঐতিহাসিক ভুলগুলো সম্ভব হয়েছিল।
দুবের প্রশ্ন, ১৯৪৮ সালে ত্রিপুরার রাজপরিবার যখন ভারতের সঙ্গে থাকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল এবং এক দীর্ঘ সংগ্রামের পর ত্রিপুরা ভারতের অংশ হলো, তখন কীভাবে কংগ্রেস নেতৃত্ব নোয়াখালী, চট্টগ্রাম ও সিলেটের মতো তৎকালীন হিন্দু অধ্যুষিত এলাকাগুলোকে পাকিস্তানের (যা বর্তমানে স্বাধীন বাংলাদেশ) হাতে তুলে দিল?
এই অধিকার তাদের কে দিয়েছিল? বাহারুল ইসলাম সম্পর্কে তিনি আরও জানান যে, এই ব্যক্তি পরবর্তীতে কংগ্রেসের টিকিটে রাজ্যসভার সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। রাজ্যসভার মেয়াদ শেষে তিনি হাইকোর্টের বিচারক নিযুক্ত হন এবং পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক হিসেবেও পদোন্নতি পান।
সুপ্রিম কোর্ট থেকে অবসরের পর কংগ্রেস তাঁকে আবারও রাজ্যসভার সদস্য করে পুরস্কৃত করেছিল। দুবের দাবি, বাহারুল ইসলাম ছিলেন ‘মুসলিম লিগ রেড আর্মি’-এর একজন সক্রিয় সদস্য, যে বাহিনী নোয়াখালীর হত্যাকাণ্ড, চট্টগ্রাম দখল এবং সিলেটে গণভোট পরিচালনার ক্ষেত্রে নেপথ্যে থেকে বড় ধরনের ভূমিকা পালন করেছিল।
নিশিকান্ত দুবের এই চাঞ্চল্যকর মন্তব্য এমন এক সময়ে প্রকাশ্যে এল, যখন ত্রিপুরার স্থানীয় রাজনৈতিক দল ‘টিপরা মোথা’-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং রাজপরিবারের বংশধর প্রদ্যোত বিক্রম মাণিক্য দেববর্মাও প্রায় কাছাকাছি ধরনের একটি অভিযোগ উত্থাপন করেছেন।
প্রদ্যোত বিক্রম সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন যে, দেশভাগের সময় তাঁর ঠাকুমাকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে তৎকালীন ত্রিপুরা রাজ্যের একটি বিশাল ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। তাঁর মতে, এটি ভারতের জাতীয় ইতিহাসের অন্যতম অন্ধকার ও কলঙ্কজনক একটি অধ্যায়।
ত্রিপুরার রাজপরিবারের বর্তমান প্রধান ও আলংকারিক রাজা প্রদ্যোত মাণিক্য আক্ষেপ করে বলেন, আজ যদি ত্রিপুরা বা উত্তর-পূর্ব ভারতের সমুদ্রপথে সরাসরি প্রবেশের কোনো সুযোগ থাকত, তবে শিলিগুড়ি করিডোর বা ‘চিকেনস নেক’ নিয়ে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তায় এত দুশ্চিন্তা বা কৌশলগত দুর্বলতা থাকত না।
তাঁর মতে, তৎকালীন ভারত সরকারের এই মারাত্মক কৌশলগত ভুল শুধু ত্রিপুরা বা উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জন্যই নয়, বরং সমগ্র ভারতীয় জাতির জন্যই এক অপূরণীয় ক্ষতি ডেকে এনেছে। প্রদ্যোত মাণিক্য আরও স্পষ্ট করে জানান যে, তাঁদের পরিচালিত ‘গ্রেটার টিপরাল্যান্ড’ আন্দোলনকে প্রায়শই রাজনৈতিকভাবে ভুল ব্যাখ্যা করা হয়ে থাকে।
তবে এই আন্দোলনের প্রকৃত উদ্দেশ্য কখনোই বিচ্ছিন্নতাবাদ ছিল না; বরং এর মূল লক্ষ্য হলো অতীতের সেই ঐতিহাসিক ও কৌশলগত ভুলের কারণে যে অঞ্চলগুলো ভারতের মূল ভূখণ্ড বা ত্রিপুরা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল, সেগুলোকে পুনরায় একত্রিত করা।
সামগ্রিকভাবে, নিশিকান্ত দুবে এবং প্রদ্যোত বিক্রম মাণিক্য দেববর্মার এই বক্তব্যগুলো দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে পুরোনো বিতর্ককে নতুন করে উসকে দিয়েছে। ইতিহাস, রাজনীতি এবং ভৌগোলিক কৌশলগত অবস্থানের এই জটিল সমীকরণ ভবিষ্যতে প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্কে কোনো ধরনের প্রভাব ফেলে কি না, তা এখন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি আন্তর্জাতিক সংবাদ বিশ্লেষণের দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, এই ধরনের মন্তব্য দেশভাগের ক্ষত এবং তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের বিষয়টিকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।