মঙ্গলবার, জুলাই ২১, ২০২৬
৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামানের ফ্ল্যাটে দুদকের অভিযান

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০ জুলাই, ২০২৬, ০৬:২৬ পিএম

সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামানের ফ্ল্যাটে দুদকের অভিযান
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বহুল আলোচিত সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের রাজধানীর গুলশানস্থ দুটি বিলাসবহুল আবাসিক ফ্ল্যাটে টানা দুদিনব্যাপী ব্যাপক তল্লাশি ও অভিযান সফলভাবে সম্পন্ন করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

 

রাষ্ট্রের বিচারিক আদালতের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার ভিত্তিতে পরিচালিত এই নিবিড় অভিযানে বিপুল পরিমাণ জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেছে। রাজধানীর অন্যতম অভিজাত ও সুরক্ষিত এলাকা গুলশানের ৬৬ নম্বর সড়কের নর্থওয়েস্ট বি-ব্লকের ১১ নম্বর প্লটের ওই জোড়া ফ্ল্যাট থেকে প্রায় দেড় সহস্রাধিক মহামূল্যবান ও বিলাসবহুল সামগ্রী উদ্ধার করেছেন দুদকের তদন্তকারী কর্মকর্তারা।

 

আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে অত্যন্ত স্বচ্ছতার সঙ্গে পরিচালিত এই অভিযানে উদ্ধারকৃত সম্পদের বিশালতা ও বৈচিত্র্য দেশের সচেতন নাগরিক সমাজকে গভীরভাবে বিস্মিত করেছে। দুদকের উচ্চপদস্থ তদন্তকারী কর্মকর্তাদের দেওয়া আনুষ্ঠানিক তথ্যমতে, ফ্ল্যাট দুটির প্রতিটি কক্ষেই ছিল সীমাহীন আভিজাত্য ও বিলাসবহুল জীবনযাপনের সুস্পষ্ট প্রমাণ।

 

অত্যন্ত সতর্কতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে মালামাল তালিকাভুক্তকরণের পর দেখা যায়, সেখানে ২৬৯টি ভিন্ন ভিন্ন ধরনের পণ্য মজুত রয়েছে, যার সর্বমোট সংখ্যা এক হাজার পাঁচশ ছাড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে কেবল ‘এ-৭’ নম্বর ফ্ল্যাট থেকেই এক হাজার ১৩৫টি এবং ‘বি-৭’ নম্বর ফ্ল্যাট থেকে প্রায় ৪০০টি মূল্যবান সামগ্রী জব্দ করা হয়েছে।

 

উদ্ধারকৃত এসব বিলাসবহুল সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে তিন শতাধিক বিদেশি কোট, পাঁচ শতাধিক দামি টাই এবং আটটি অতি মূল্যবান ঘড়ির বাক্স। এই ঘড়িগুলোর মধ্যে বিশ্বখ্যাত ‘রোলেক্স’ ব্র্যান্ডের চারটি ঘড়িও রয়েছে।

 

বাসা থেকে উদ্ধার হওয়া প্রকৃত ক্রয় রসিদ যাচাই করে তদন্তকারী কর্মকর্তারা ধারণা করছেন, প্রতিটি রোলেক্স ঘড়ির আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য ১৪ হাজার থেকে সাড়ে ১৭ হাজার মার্কিন ডলারের সমতুল্য।

 

এছাড়া ওই জোড়া ফ্ল্যাটে পাওয়া গেছে প্রায় একশটি দামি নারী পোশাক, দুষ্প্রাপ্য মুক্তার গহনা, দৃষ্টিনন্দন ও ব্যয়বহুল ঝাড়বাতি, অত্যাধুনিক শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র, ব্যায়ামের আধুনিক সরঞ্জাম, মূল্যবান আসবাবপত্র, রেফ্রিজারেটর এবং দামি সুটকেসসহ আরও অসংখ্য গৃহস্থালি পণ্য।

 

সোমবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় অবস্থিত দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির জনসংযোগ শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী পরিচালক তানজির আহমেদ গণমাধ্যমের কাছে এই মেগা অভিযানের আনুষ্ঠানিক সত্যতা নিশ্চিত করেন।

 

তিনি সাংবাদিকদের জানান, দুদকের উপপরিচালক মো. মশিউর রহমানের যোগ্য নেতৃত্বে একটি চৌকস দল অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সঙ্গে এই স্পর্শকাতর অভিযানটি পরিচালনা করে। আদালতের সুস্পষ্ট আদেশের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখে রোববার ও সোমবার-টানা দুদিন ধরে মালামাল তালিকাভুক্তকরণ বা আইনি পরিভাষায় ইনভেন্টরির এই জটিল আইনি কাজটি সম্পন্ন করা হয়।

 

সম্পূর্ণ আইনানুগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে এবং মালামালের সঠিক তদারকির জন্য গুলশান রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. নিলয় রহমানকে সরকার কর্তৃক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।

 

এর আগে গত ২ জুলাই আদালতের এক বিশেষ আদেশে সাইফুজ্জামান চৌধুরীর তিন হাজার ৭৪৭ বর্গফুট আয়তনের ‘এ-৭’ এবং তিন হাজার ৮৩২ বর্গফুট আয়তনের ‘বি-৭’ নম্বর ফ্ল্যাট দুটির সার্বিক নিয়ন্ত্রণ, ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দুদকের সম্পদ ব্যবস্থাপনা ইউনিটের পরিচালককে তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে আইনি দায়িত্ব প্রদান করা হয়।

 

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই সাবেক এই প্রভাবশালী মন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির বিশাল জাল উন্মোচনে অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে কাজ শুরু করে দুর্নীতি দমন কমিশন। ব্যাপক মাত্রার অর্থপাচার ও দুর্নীতির অনুসন্ধানের প্রাথমিক পর্যায়ে দুদক, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী সাত সদস্যের বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছিল।

 

পরবর্তীতে তদন্ত কাজের ধারাবাহিকতা রক্ষায় এবং পূর্ববর্তী দলনেতার বদলিজনিত কারণে গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর উপপরিচালক মশিউর রহমানের নেতৃত্বে নয় সদস্যের একটি নতুন ও সুদক্ষ দল পুনর্গঠন করা হয়, যারা বর্তমানে এই বিশাল অনুসন্ধান প্রক্রিয়ার নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

 

ইতোমধ্যে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার, বিপুল পরিমাণ অর্থপাচার এবং প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়মের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে সাইফুজ্জামান চৌধুরী, তার স্ত্রী এবং একটি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান রুকমীলা জামানসহ ব্যাংকটির প্রায় অর্ধশত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও কর্মচারীর বিরুদ্ধে একাধিক দুর্নীতি মামলা দায়ের করেছে দুদক।

 

নিজ দেশে থাকা অবৈধ সম্পদের পাহাড়ের পাশাপাশি বিদেশে পাচারকৃত এই সাবেক মন্ত্রীর সুবিশাল বৈশ্বিক সাম্রাজ্যের খবরও ইতিমধ্যে দেশের বিচার বিভাগের নজরে এসেছে। জানা গেছে, গত ২৬ ফেব্রুয়ারি এক ঐতিহাসিক আদেশে যুক্তরাজ্যের মাটিতে সাইফুজ্জামান চৌধুরীর নামে থাকা ৫১৮টি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্ট ক্রোক করার কঠোর নির্দেশ দেন বাংলাদেশের আদালত।

 

তারও আগে, ১৩ জানুয়ারি সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিশ্বের আটটি দেশে তার নামে থাকা অসংখ্য বাড়ি, ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্ট জব্দের আদেশ দেওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে দুটি কোম্পানিতে তার নামে থাকা বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগ অবরুদ্ধ করার সুস্পষ্ট নির্দেশনাও আসে আদালত থেকে।

 

রাষ্ট্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলোর প্রাথমিক হিসাব মতে, জব্দকৃত এসব বৈশ্বিক সম্পদ ও বিনিয়োগের আনুমানিক সর্বমোট আর্থিক মূল্য প্রায় দুই হাজার ৩২০ কোটি ৯২ লাখ টাকার সমতুল্য।

 

উল্লেখ্য, রাজনৈতিক জীবনের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ ২০১৪ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং পরবর্তীতে ২০১৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত একই মন্ত্রণালয়ের পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনকালে এই বিপুল সম্পদের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন বলে আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর নথিপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।