মঙ্গলবার, জুলাই ২১, ২০২৬
৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতে প্রধানমন্ত্রীর কঠোর বার্তা

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০ জুলাই, ২০২৬, ০৮:৫৬ পিএম

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতে প্রধানমন্ত্রীর কঠোর বার্তা
ছবি : File Photo

দেশের প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবাকে আরও উন্নত, আধুনিক এবং সহজলভ্য করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

 

একই সঙ্গে সরকারি হাসপাতালগুলোতে সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের আরও বেশি আন্তরিক, দায়িত্বশীল ও রোগীবান্ধব হওয়ার প্রতিও তিনি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন। সোমবার, ২০ জুলাই বিকেলে বাংলাদেশ সচিবালয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আয়োজিত এক বিশেষ বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী এই যুগান্তকারী নির্দেশনা প্রদান করেন।

 

দেশের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো প্রধানমন্ত্রী সরাসরি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অডিটোরিয়ামে উপস্থিত হয়ে এমন গুরুত্বপূর্ণ পর্যালোচনা বৈঠকে অংশগ্রহণ করলেন, যা দেশের স্বাস্থ্য খাতের সার্বিক সংস্কারে বর্তমান সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের বিষয়টিই অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে।

 

উচ্চপর্যায়ের এই প্রশাসনিক বৈঠকের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে গত পাঁচ মাসে স্বাস্থ্য খাতে অর্জিত সাফল্য ও গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সচিবসহ উপস্থিত শীর্ষ কর্মকর্তাদের কাছে বিস্তারিত জানতে চান।

 

মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা এ সময় একটি সামগ্রিক চিত্র প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরেন। তারা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, বিগত সরকারগুলোর চরম অবহেলা, অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির কারণে দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্য খাত একেবারে খাদের কিনারায় গিয়ে পৌঁছেছিল।

 

বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের প্রান্তিক মানুষের জন্য ন্যূনতম চিকিৎসাসেবা পাওয়াও অত্যন্ত কঠিন ও ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তবে সেই বিপর্যস্ত ও ভগ্ন অবস্থা থেকে খাতটিকে টেনে তুলতে এবং সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে বর্তমান প্রশাসন নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে বলে কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রীকে আশ্বস্ত করেন।

 

বৈঠকে দেশের উপজেলা ও গ্রাম পর্যায়ের চিকিৎসাব্যবস্থা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং মূলধারার গণমাধ্যমগুলোতে প্রায়শই এমন অভিযোগ দেখা যায় যে, উপজেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত চিকিৎসক নিযুক্ত থাকলেও সাধারণ রোগীরা তাদের কাছ থেকে সন্তোষজনক চিকিৎসাসেবা পান না।

 

অনেক ক্ষেত্রেই কর্মস্থলে চিকিৎসকদের অনুপস্থিতি এবং দায়িত্ব পালনে চরম অবহেলার বিষয়গুলো জনসমক্ষে উঠে আসে। এই বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্দেশ দিয়েছেন যে, চিকিৎসকদের যেকোনো ধরনের অবহেলা বা দায়িত্বহীনতার ক্ষেত্রে অবিলম্বে দৃষ্টান্তমূলক ও কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

 

তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়েছেন, যেকোনো উপায়েই হোক, গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবাকে সহজ ও বাধামুক্ত করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে আরও জোর দিয়ে বলেন, সরকারি হাসপাতালগুলোতে আগত রোগীদের জন্য সন্তোষজনক ও মানসম্মত চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি পর্যাপ্ত প্রয়োজনীয় ওষুধের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহও নিশ্চিত করতে হবে।

 

সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নিতে গিয়ে কোনো সাধারণ নাগরিক যেন বিন্দুমাত্র ভোগান্তি বা হয়রানির শিকার না হন, সেদিকে হাসপাতাল প্রশাসনকে কড়া নজর রাখতে হবে। চিকিৎসা নেওয়ার জন্য গ্রামের সাধারণ মানুষকে যেন বাধ্য হয়ে দূরবর্তী কোনো বড় শহর বা ব্যয়বহুল বেসরকারি ক্লিনিকে ছুটতে না হয়।

 

সেই লক্ষ্যে সরকারি হাসপাতালগুলোকেই সাধারণ মানুষের শেষ ও একমাত্র আস্থার জায়গায় পরিণত করার উদাত্ত আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। দেশের ক্রমবর্ধমান কিডনি রোগীদের সুচিকিৎসা ও তাদের অবর্ণনীয় দুর্ভোগ লাঘবের বিষয়েও প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত সংবেদনশীল ও আন্তরিক মনোভাব পোষণ করেন।

 

বৈঠকে তিনি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ডায়ালাইসিস সুবিধার ব্যাপক সম্প্রসারণের সুস্পষ্ট রূপরেখা তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দেন, সারা দেশের জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে যেখানে বর্তমানে মাত্র দশ শয্যার ডায়ালাইসিস সেন্টার রয়েছে, সেগুলোকে অনতিবিলম্বে আধুনিক সুবিধাসংবলিত পঞ্চাশ শয্যার ডায়ালাইসিস সেন্টারে উন্নীত করা হবে।

 

শুধু তাই নয়, আগামী তিন বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে দেশের প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও ডায়ালাইসিস সেন্টার স্থাপন করা হবে। এই বৃহৎ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য এখনই প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল গড়ে তোলা এবং পর্যাপ্ত চিকিৎসাসরঞ্জাম ও লজিস্টিক সাপোর্ট নিশ্চিত করার জন্য তিনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে জরুরি নির্দেশনা প্রদান করেন।

 

এছাড়াও দেশের গ্রামীণ স্বাস্থ্য অবকাঠামোর আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্যে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে বিদ্যমান একান্ন শয্যা থেকে একশত এক শয্যায় উন্নীত করার একটি বৃহৎ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বর্তমান সরকার।

 

বৈঠকে এই বর্ধিত শয্যার জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য জনবল নিয়োগ এবং আনুষঙ্গিক ভৌত অবকাঠামো স্থাপনের বিষয়ে বিস্তারিত ও ফলপ্রসূ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় সরকারের গণপূর্ত অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীরা নতুন হাসপাতাল ভবন ও আনুষঙ্গিক অবকাঠামোর আধুনিক নকশাসহ কারিগরি ও প্রযুক্তিগত খুঁটিনাটি বিভিন্ন বিষয় সবিস্তারে প্রধানমন্ত্রীর সামনে উপস্থাপন করেন।

 

স্বাস্থ্য খাতের এই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও নীতিনির্ধারণী বৈঠকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী এবং মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন নীতিনির্ধারক ও সচিবদের পাশাপাশি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়সহ রাজধানী ঢাকার অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় সরকারি হাসপাতালের পরিচালকরা এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি দুর্নীতিমুক্ত, আধুনিক ও সর্বজনীন চিকিৎসাব্যবস্থা গড়ে তোলার দৃঢ় প্রত্যয়ের মধ্য দিয়ে এই ঐতিহাসিক বৈঠকের সমাপ্তি ঘটে।