পুলিশের দেওয়া আকস্মিক সড়ক অবরোধের কারণে গাড়িবহর থেকে নেমে দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা প্রতিবাদ জানালে একপর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে তাদের তুমুল বাগ্বিতণ্ডা ও ধাক্কাধাক্কির সৃষ্টি হয়। দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিরোধী দলের শীর্ষ নেতাদের এভাবে পথরোধ করার ঘটনাটি স্থানীয় ও জাতীয় রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে।
দলীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, বুধবার বিকেল তিনটার দিকে মৌলভীবাজার সরকারি বিশ্রামাগার বা সার্কিট হাউজ থেকে হবিগঞ্জের উদ্দেশ্যে একটি বিশাল গাড়িবহর নিয়ে রওনা হন জাতীয় নাগরিক পার্টির কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ।
এই বহরে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় প্রধান হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, দলের সদস্য সচিব আখতার হোসেন, উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম, দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ, মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এবং সংসদ সদস্য চিকিৎসক মাহমুদা মিতুসহ আরও অনেক শীর্ষ নেতা।
তাদের যাত্রাপথটি ছিল অত্যন্ত স্বাভাবিক, কিন্তু বিকেল সাড়ে চারটার দিকে তাদের গাড়িবহরটি শ্রীমঙ্গল শহর অতিক্রম করে শায়েস্তাগঞ্জমুখী সড়কে প্রবেশ করতেই পুলিশি বাধার সম্মুখীন হয়। চা কন্যা ভাস্কর্য নামে সুপরিচিত এলাকাটিতে পৌঁছানোর পরপরই আগে থেকে অবস্থান নেওয়া পুলিশের একটি বিশাল দল রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে তাদের পথরোধ করে।
গাড়িবহর হঠাৎ আটকে দেওয়ার পর সৃষ্ট পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিকভাবে গাড়ি থেকে নেমে আসেন বিরোধীদলীয় প্রধান হুইপ নাহিদ ইসলামসহ অন্যান্য জ্যেষ্ঠ নেতারা। তারা সেখানে উপস্থিত জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেন এবং আকস্মিক এই পথরোধের আইনি কারণ জানতে চান।
এ সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে তাদের দীর্ঘ সময় ধরে তর্কবিতর্ক চলতে থাকে। একপর্যায়ে পরিস্থিতি কিছুটা উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং উপস্থিত পুলিশের সঙ্গে জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতাকর্মীদের সরাসরি ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে।
বিশেষ করে দলের দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ এবং মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর সঙ্গে পুলিশের বেশ কয়েকবার ধাক্কাধাক্কি হতে দেখা যায়। জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এমন আচরণে উপস্থিত দলীয় কর্মী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চা ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বাধা দেওয়ার এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সেখানে দীর্ঘ সময় ধরে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করতে থাকে। গুরুত্বপূর্ণ একটি মহাসড়কে আকস্মিকভাবে পুলিশের এই প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির ফলে ওই এলাকার সার্বিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
শ্রীমঙ্গল-শায়েস্তাগঞ্জ সড়কটি ওই অঞ্চলের অন্যতম প্রধান যাতায়াত মাধ্যম হওয়ায় মুহূর্তের মধ্যেই সড়কের দুই পাশে শত শত যানবাহন আটকা পড়ে যায়। এতে করে সাধারণ যাত্রীদের চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয়। দীর্ঘ সময় ধরে যানজট আটকে থাকায় বয়স্ক মানুষ, নারী ও শিশুরা নিদারুণ কষ্টের সম্মুখীন হন।
জরুরি সেবার যানবাহনগুলোকেও বিকল্প পথ খুঁজতে হিমশিম খেতে হয়। দীর্ঘক্ষণ ধরে মহাসড়ক অবরুদ্ধ থাকায় আঞ্চলিক বাণিজ্যের পণ্যবাহী ট্রাকগুলোও ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য হয়, যা সাধারণ মানুষের মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে।
এই অনাকাঙ্ক্ষিত বাধা প্রদান এবং ধাক্কাধাক্কির ঘটনার বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য প্রদান করা হয়েছে। মৌলভীবাজার জেলার সহকারী পুলিশ সুপার (শ্রীমঙ্গল সার্কেল) মো. ওয়াহিদুজ্জামান রাজু সংবাদমাধ্যমের কাছে এই ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এই পদক্ষেপের যৌক্তিকতা তুলে ধরে তিনি জানান যে, মূলত সার্বিক নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি বিবেচনা করেই বিরোধী দলের নেতাদের গাড়িবহরটি ওই এলাকায় সাময়িকভাবে আটকে দেওয়া হয়েছে। তবে ঠিক কী ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি ছিল, সে বিষয়ে পুলিশের তরফ থেকে বিস্তারিত আর কোনো তথ্য সরবরাহ করা হয়নি।
ঘটনার নেপথ্যের কারণ অনুসন্ধান করে জানা যায়, জাতীয় নাগরিক পার্টির এই যাত্রার মূল উদ্দেশ্য ছিল পূর্বনির্ধারিত একটি প্রতিবাদ সমাবেশে অংশগ্রহণ করা। আগের দিন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে দলের নেতাকর্মীদের ওপর যে হামলার ঘটনা ঘটেছিল, তার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাতেই আজ হবিগঞ্জে একটি সমাবেশের ডাক দিয়েছিল এনসিপি।
তবে এই সমাবেশকে কেন্দ্র করে হবিগঞ্জ শহরের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক উত্তেজনা ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সরকার ও স্থানীয় প্রশাসন হবিগঞ্জে সভা-সমাবেশের ওপর ১৪৪ ধারা জারি করে।
মূলত প্রশাসনের সেই কঠোর অবস্থানের কারণেই এনসিপির শীর্ষ নেতাদের গাড়িবহর আটকে দেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনে এমন প্রতিবন্ধকতা রাজনৈতিক অঙ্গনে আরও আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দেবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।