শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রাজধানী থেকে সাবেক মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকী গ্রেপ্তার

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৯ জুলাই, ২০২৬, ০৭:২৯ পিএম

রাজধানী থেকে সাবেক মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকী গ্রেপ্তার
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক উল্লেখযোগ্য ও চাঞ্চল্যকর ঘটনার জন্ম দিয়ে ঢাকার শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের ঐতিহাসিক সমাবেশে সংঘটিত ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে দায়ের করা একটি স্পর্শকাতর মামলায় সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

 

বুধবার, অর্থাৎ ২৯ জুলাই সন্ধ্যায় রাজধানীর অন্যতম অভিজাত, সুরক্ষিত ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকা গুলশান থেকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একটি বিশেষ, সুশিক্ষিত ও চৌকস দল অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে অভিযান পরিচালনা করে তাকে নিজেদের হেফাজতে নিতে সক্ষম হয়।

 

পরবর্তীতে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (ডিবি-উত্তর) মোহাম্মদ কামরুজ্জামান সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে এই গুরুত্বপূর্ণ গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। এই অতি গুরুত্বপূর্ণ গ্রেপ্তারের ফলে দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডল এবং আইনি অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা ও পর্যালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

 

এই আকস্মিক ও বহু প্রতীক্ষিত গ্রেপ্তারের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে, বুধবার সকালেই সাবেক এই মন্ত্রী সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি আইনি প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার জন্য স্বাভাবিকভাবেই আদালতে উপস্থিত হয়েছিলেন।

 

রাজধানীর শাহবাগ থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অধীনে দায়ের করা একটি পুরোনো ও চলমান মামলায় নিয়মিত হাজিরা দেওয়ার জন্যই তিনি মূলত আদালত প্রাঙ্গণে এসেছিলেন। জানা যায়, বিগত ২০২৫ সালে দায়ের হওয়া ওই সুনির্দিষ্ট ও আলোচিত মামলাটিতে তাকে এর আগেও একবার গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।

 

পরবর্তীতে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তিনি জামিনে মুক্ত থাকলেও, সেই মামলার আইনি বাধ্যবাধকতা ও আদালতের নির্দেশ মেনেই তাকে নিয়মিতভাবে আদালতে হাজিরা দিতে হয়। বুধবার সকালে সেই নির্ধারিত হাজিরা শেষে আদালত প্রাঙ্গণ থেকে বেরিয়ে আসার সময় তিনি সেখানে উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের মুখোমুখি হন এবং অত্যন্ত সাবলীল ও আত্মবিশ্বাসী ভাষায় নিজের বর্তমান আইনি পরিস্থিতি, মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেন।

 

সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে আবদুল লতিফ সিদ্দিকী নিজেই প্রথম তার বিরুদ্ধে জারি হওয়া নতুন গ্রেপ্তারি পরোয়ানার বিষয়টি জনসমক্ষে প্রকাশ্যে আনেন। তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের অত্যন্ত শান্তভাবে জানান যে, আজ সকালেই তিনি তার ব্যক্তিগত সূত্র মারফত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও গুরুতর আইনি তথ্য জানতে পেরেছেন।

 

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল থেকে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ ও হত্যাযজ্ঞের বহুল আলোচিত ওই মামলায় তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।

 

এই খবরটি জানার পরও তিনি কেন আদালতে এসেছেন, সে বিষয়েও তিনি নিজের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্টভাবে গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হওয়ার খবরটি শোনার পরও তিনি বিচলিত হননি, বরং কেবল দেশের প্রচলিত বিচারব্যবস্থা ও আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়েই আজ আদালতে উপস্থিত হওয়ার দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

 

নিজের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের বর্ণাঢ্য অভিজ্ঞতা ও ব্যক্তিগত আদর্শের কথা উল্লেখ করে সাবেক এই বর্ষীয়ান মন্ত্রী সাংবাদিকদের সামনে জোরালো দাবি করেন যে, তিনি কখনোই রাজনীতিতে বা ব্যক্তিগত জীবনে সংকটময় মুহূর্তে আত্মগোপন করার নীতিতে বিশ্বাসী নন।

 

তার মতে, আজ যদি তিনি আদালতে উপস্থিত না হতেন, তবে দেশের সাধারণ মানুষ, গণমাধ্যম এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মনে এমন একটি নেতিবাচক ও ভ্রান্ত ধারণার জন্ম হতে পারত যে, তিনি হয়তো আইনি জটিলতা ও সম্ভাব্য গ্রেপ্তার এড়াতে দেশত্যাগ করেছেন অথবা আত্মগোপনে চলে গেছেন।

 

তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে বলেন, "আমি সাধারণত কখনোই আত্মগোপন করি না; সব সময়ই জনসমক্ষে আত্মপ্রকাশ করতে চাই এবং যেকোনো উদ্ভূত পরিস্থিতির সরাসরি ও সাহসিকতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে চাই। মূলত মানুষের মনের সেই ভ্রান্তি দূর করার জন্যই আমি কোনো প্রকার দ্বিধা ছাড়াই আজকে আদালতে এসেছি।"

 

এরপর তিনি তার ভবিষ্যৎ আইনি পদক্ষেপ ও পরিকল্পনা সম্পর্কে সাংবাদিকদের একটি সুস্পষ্ট ধারণা প্রদান করেন। আবদুল লতিফ সিদ্দিকী জানান যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যদি তাকে এই মুহূর্তে গ্রেপ্তার না করে, তবে তিনি দেশের প্রচলিত আইনের প্রতি সম্পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল থেকে আগামী সপ্তাহের রোববার বা সোমবার স্বেচ্ছায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সশরীরে উপস্থিত হয়ে আত্মসমর্পণ করবেন।

 

তিনি যৌক্তিক কারণ প্রদর্শন করে বলেন, যেহেতু দেশের একটি সর্বোচ্চ পর্যায়ের আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে, তাই একজন আইন মান্যকারী নাগরিক হিসেবে তাকে অবশ্যই সেই আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।

 

তবে এর মাঝে যদি পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়, সেটি সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি বিষয় হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তার এই সুচিন্তিত বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি তার নিঃশর্ত সমর্পণের বিষয়টিই সুচারুভাবে ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছিলেন।

 

গ্রেপ্তারের এই প্রবল সম্ভাবনার বিষয়টি পুরোপুরি মাথায় রেখে তিনি যে এবার আগে থেকেই মানসিকভাবে ও শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ প্রস্তুত ছিলেন, সে কথাও তিনি অত্যন্ত খোলামেলাভাবে গণমাধ্যমের সামনে স্বীকার করেন।

 

অতীতের একটি নির্দিষ্ট তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে তিনি সাংবাদিকদের জানান যে, গত ২৮ তারিখের মতো এবার তিনি আর কোনোভাবেই অপ্রস্তুত অবস্থায় নেই। তিনি সম্ভাব্য সব ধরনের পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে সম্পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়েই আজ নিজের বাসা থেকে বের হয়েছেন।

 

তিনি সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেন যে, তার ব্যক্তিগত গাড়িতে কারাগারে ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের পোশাক ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র সযত্নে রাখা আছে। শুধু তাই নয়, কারাগারে তার অবসর সময় কাটানো এবং নিয়মিত লেখালেখি চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় খাতা ও কলমও তিনি সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন।

 

শেষ পর্যন্ত সাবেক এই মন্ত্রীর সেই দূরদর্শী আশঙ্কাই সম্পূর্ণ বাস্তবে রূপ নেয় এবং বুধবার সন্ধ্যায় গুলশান এলাকা থেকে তিনি মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার হন।