শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হবিগঞ্জে মামলা দায়েরের সিদ্ধান্তে অনড় নাহিদ ইসলাম

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৯ জুলাই, ২০২৬, ০৮:০৯ পিএম

হবিগঞ্জে মামলা দায়েরের সিদ্ধান্তে অনড় নাহিদ ইসলাম
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি অত্যন্ত উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রথম দফার বাধা অতিক্রম করার পর, হবিগঞ্জ জেলার মিরপুর এলাকায় পুনরায় প্রবল পুলিশি বাধার সম্মুখীন হয়েছেন বিরোধীদলীয় রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ।

 

বুধবার, ২৯ জুলাই বিকেলে ঘটা এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ওই অঞ্চল জুড়ে ব্যাপক রাজনৈতিক উত্তেজনা ও সাধারণ মানুষের মাঝে উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ে। দীর্ঘ সময় ধরে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা, দরকষাকষি ও যুক্তিতর্ক চলার পরও, নিছক নিরাপত্তাজনিত কারণ ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে নেতৃবৃন্দের গাড়িবহরকে মহাসড়কের ওপর আটকে রাখা হয়।

 

প্রশাসনের এই অপ্রত্যাশিত ও কঠোর বাধার কারণে একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে মহাসড়কেই অবস্থান নেন বিরোধী দলের শীর্ষ নেতারা, যা পরিস্থিতিকে আরও অনেক বেশি জটিল করে তোলে। প্রাপ্ত নির্ভরযোগ্য তথ্য ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, বুধবার বিকেল পাঁচটার দিকে হবিগঞ্জ জেলার মিরপুর এলাকায় জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতাকর্মীদের বহনকারী বিশাল গাড়িবহরটি পৌঁছালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি বড় দল সেখানে আগে থেকেই প্রস্তুত রাখা ব্যারিকেড দিয়ে তাদের পথরোধ করে।

 

দীর্ঘক্ষণ আলোচনার পরও যখন গন্তব্যে যাওয়ার কোনো যৌক্তিক আইনি সমাধান বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সবুজ সংকেত পাওয়া যায়নি, তখন প্রতিবাদস্বরূপ এনসিপির আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় প্রধান হুইপ নাহিদ ইসলামের নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ সরাসরি রাজপথে বসে পড়েন।

 

গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় একটি বৈধ রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের এভাবে বারবার পথরোধ করার ঘটনাটি সচেতন নাগরিক সমাজ এবং মানবাধিকার কর্মীদের মধ্যে তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

 

ঘটনাস্থলে উপস্থিত দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যমের কর্মীদের কাছে দেওয়া এক তাৎক্ষণিক সাক্ষাৎকারে জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সামগ্রিক পরিস্থিতির একটি স্পষ্ট ও বস্তুনিষ্ঠ চিত্র তুলে ধরেন।

 

তিনি অত্যন্ত ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে জানান যে, আগের দিন তাদের দলের নিরপরাধ নেতাকর্মীদের ওপর যে বর্বরোচিত ও অমানবিক হামলা চালানো হয়েছিল, মূলত তার তীব্র প্রতিবাদ জানাতে এবং আইনি পদক্ষেপ হিসেবে একটি আনুষ্ঠানিক মামলা দায়ের করতেই তারা পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী হবিগঞ্জের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন।

 

কিন্তু যাত্রাপথে তাদের বারবার উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সরকারি বাহিনীর মাধ্যমে বাধা দেওয়া হচ্ছে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, শুরুতে মৌলভীবাজারে তাদের পথরোধ করা হয়, এরপর মহাসড়কের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বালুবাহী ট্রাক ও ট্রাক্টর ফেলে রেখে অত্যন্ত সুকৌশলে কৃত্রিম প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়।

 

সবশেষে মিরপুর এলাকায় পুলিশ তাদের সম্পূর্ণভাবে অবরুদ্ধ করে রেখেছে। তিনি আরও একটি অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর ও গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করেন যে, তাদের গাড়িবহরের পেছনে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের ছাত্রদলের সশস্ত্র ও উচ্ছৃঙ্খল কর্মীরা ভীতিকরভাবে অবস্থান নিয়েছে, যা তাদের চরম নিরাপত্তাহীনতা ও প্রাণনাশের ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে।

 

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জারি করা ১৪৪ ধারার প্রতি নিজেদের পূর্ণ সম্মান ও আনুগত্য প্রদর্শনের কথা উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, প্রশাসন হবিগঞ্জে ১৪৪ ধারা জারি করেছে এবং তারা দেশের আইন মান্যকারী নাগরিক হিসেবে সেই বিধিনিষেধ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রতি সম্পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল।

 

তারা পুলিশ প্রশাসনকে সুস্পষ্টভাবে আশ্বস্ত করেছিলেন যে, আইন অমান্য করে কোনো ধরনের রাজনৈতিক সমাবেশ, মিছিল বা বিশাল জমায়েত তারা সেখানে করবেন না। তাদের এই সফরের একমাত্র উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য হলো হামলায় আহত দলীয় কর্মীদের হাসপাতালে দেখতে যাওয়া, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ করে সমবেদনা জানানো এবং স্থানীয় থানায় গিয়ে একটি আইনি মামলা দায়ের করা।

 

পরিস্থিতি বিবেচনায় পুলিশ যদি নিরাপত্তাজনিত কারণে মাত্র কয়েকজন নির্দিষ্ট প্রতিনিধি নিয়ে যাওয়ার শর্ত দেয়, তাতেও তারা পুরোপুরি সম্মত আছেন বলে তিনি প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন। এতসব যৌক্তিক ও নমনীয় প্রস্তাব দেওয়ার পরও, যে মিরপুর এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি নেই, সেখানে পুলিশি ব্যারিকেড দিয়ে তাদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে রাখার বিষয়টিকে তিনি সম্পূর্ণ বেআইনি, অগণতান্ত্রিক ও মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন বলে আখ্যায়িত করেন।

 

তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন যে, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা হবিগঞ্জে গিয়ে আইনি প্রক্রিয়ায় মামলা দায়ের করতে না পারছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত তারা রাজপথের সেই স্থানেই অনড় অবস্থানে থাকবেন।

 

মিরপুরের এই চরম উত্তেজনাকর ঘটনার ঠিক কিছুক্ষণ আগে, বিকেল সাড়ে চারটার দিকে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলাধীন শায়েস্তাগঞ্জ-শ্রীমঙ্গল সড়কের বিখ্যাত ‘চা কন্যা ভাস্কর্য’ সংলগ্ন এলাকায় এই গাড়িবহরটি প্রথম দফা পুলিশি বাধার মুখে পড়েছিল।

 

সে সময় মহাসড়কে আকস্মিক যানজট ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করে। গাড়ি থেকে নেমে পুলিশের সঙ্গে সরাসরি তর্কে ও বাগ্‌বিতণ্ডায় জড়াতে দেখা যায় এনসিপির জ্যেষ্ঠ নেতাদের। সেই প্রতিবাদী দলে উপস্থিত ছিলেন দলের উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম, দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ, মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এবং সংসদ সদস্য চিকিৎসক মাহমুদা মিতু।

 

একপর্যায়ে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় ও উত্তেজনার জেরে পুলিশের সঙ্গে জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতাকর্মীদের অনাকাঙ্ক্ষিত ধাক্কাধাক্কি ও হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে, যা পুরো পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটায়।

 

একাধিকবার বাধা প্রদানের এই সরকারি পদক্ষেপের আনুষ্ঠানিক আইনি ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে মৌলভীবাজার জেলার সহকারী পুলিশ সুপার (শ্রীমঙ্গল সার্কেল) মো. ওয়াহিদুজ্জামান রাজু সংবাদমাধ্যমের কাছে দাবি করেছেন যে, মূলত জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতৃবৃন্দের নিজস্ব নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই সার্বিক দিক বিবেচনা করে তাদের গাড়িবহর সাময়িকভাবে ওই এলাকায় আটকে দেওয়া হয়েছে।

 

তবে বিরোধী শিবিরের নেতারা ও বিশ্লেষকরা পুলিশের এই দাবিকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, এটি মূলত বিরোধী দলের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অধিকার খর্ব করা, তাদের কণ্ঠরোধ করা এবং আইনি প্রতিকার পাওয়ার পথ সুকৌশলে রুদ্ধ করার একটি সুপরিকল্পিত সরকারি কৌশল ছাড়া আর কিছুই নয়।