শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রতিবন্ধ তিন অদম্য মেধাবীর হাতে নিয়োগপত্র তুলে দিলেন প্রধানমন্ত্রী

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ৩০ জুলাই, ২০২৬, ১২:২৩ পিএম

প্রতিবন্ধ তিন অদম্য মেধাবীর হাতে নিয়োগপত্র তুলে দিলেন প্রধানমন্ত্রী
ছবি: সংগৃহীত

শারীরিক ও দৃষ্টিগত প্রতিবন্ধকতা যে মানুষের মেধা, যোগ্যতা ও স্বপ্ন পূরণের পথে কোনো স্থায়ী বাধা হতে পারে না, তার এক অনন্য ও উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপিত হলো বাংলাদেশ সচিবালয়ে। সমাজের পিছিয়ে পড়া ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন জনগোষ্ঠীকে মূলধারায় সম্পৃক্ত করার এক মানবিক ও অনুপ্রেরণাদায়ী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বর্তমান সরকার।

 

এরই ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার সকালে নিজ কার্যালয়ে দিনের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি শুরু করার আগেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তিনজন অদম্য মেধাবী প্রতিবন্ধী ব্যক্তির হাতে সরাসরি নিয়োগপত্র তুলে দেন।

 

এই যুগান্তকারী পদক্ষেপ কেবল ওই তিনজনের জীবনেই নয়, বরং সারা দেশের অসংখ্য বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের মনে এক নতুন আশার সঞ্চার করেছে। প্রধানমন্ত্রীর ডেপুটি প্রেস সচিব জুলফিকার হাসান শিপলু গণমাধ্যমকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

 

তিনি জানান, বৃহস্পতিবার সকালে বাংলাদেশ সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নিজ কার্যালয়ে প্রবেশের সময় প্রধানমন্ত্রী এই নিয়োগপত্রগুলো হস্তান্তর করেন। সরকারি চাকরিতে কর্মসংস্থানের মাধ্যমে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের আর্থিকভাবে আত্মনির্ভরশীল করে তোলা এবং রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের মূলধারায় তাদের মেধা ও যোগ্যতাকে কাজে লাগানোর সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য থেকেই এই বিশেষ নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে।

 

প্রধানমন্ত্রীর নিজস্ব উদ্যোগে নেওয়া এই পদক্ষেপটি রাষ্ট্র পরিচালনায় মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির একটি অনন্য নিদর্শন হিসেবে ইতোমধ্যে সর্বমহলে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। নিয়োগপ্রাপ্ত এই তিন লড়াকু ও আত্মপ্রত্যয়ী তরুণ-তরুণী হলেন-গাইবান্ধা জেলার সাঘাটা উপজেলার বাসিন্দা আয়শা আক্তার, সিরাজগঞ্জ জেলার কামারখন্দ উপজেলার নীলা খাতুন এবং নড়াইল সদর উপজেলার মো. হাসমত আলী।

 

নিয়োগপত্র হাতে পাওয়ার পর এই তিনজনের চোখেই ছিল আনন্দ ও কৃতজ্ঞতার অশ্রু। দেশের সরকারপ্রধানের কাছ থেকে সরাসরি এমন স্বীকৃতি ও নিয়োগপত্র লাভ তাদের জীবনে এক অবর্ণনীয় উচ্ছ্বাসের জন্ম দিয়েছে।

 

দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, সামাজিক প্রতিবন্ধকতা ও শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে জয় করে এই দিনটি তাদের জন্য কেবল একটি নতুন কর্মজীবনের সূচনাই নয়, বরং আজন্ম লালিত স্বপ্নের এক সোনালি বাস্তবায়ন।

 

এই তিনজনের জীবনসংগ্রামের গল্প যেকোনো সুস্থ ও স্বাভাবিক মানুষের জন্যই চরম শিক্ষণীয়। আয়শা আক্তার ও নীলা খাতুন দুজনই গুরুতর শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছেন। জন্ম থেকেই তাদের দুজনেরই দুটি হাত নেই।

 

কিন্তু এই অভাব তাদের ইচ্ছাশক্তিকে বিন্দুমাত্র অবদমিত করতে পারেনি। অদম্য মনোবলের অধিকারী নীলা খাতুন দুই হাত না থাকা সত্ত্বেও কেবল পায়ের সাহায্যে লিখে অত্যন্ত কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতকোত্তর বা মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করেছেন।

 

মেধা ও যোগ্যতার মূল্যায়নে তাকে রাজধানী ঢাকার মিরপুরে অবস্থিত জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনে ‘শিক্ষক’ পদে নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে। এখন থেকে তিনি তার মতো আরও অসংখ্য পিছিয়ে পড়া মানুষের জীবনে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেবেন।

 

একইভাবে জীবনযুদ্ধে হার না মানা আরেক যোদ্ধা হলেন আয়শা আক্তার। তিনিও পায়ের আঙুলের ফাঁকে কলম আটকে নিরলস অনুশীলন ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। বৃহস্পতিবার যখন তিনি প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে নিয়োগপত্র গ্রহণ করেন, তখন এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।

 

হাত না থাকায় অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে তিনি মুখ দিয়ে নিজের স্বপ্নের নিয়োগপত্রটি গ্রহণ করেন, যা সেখানে উপস্থিত সকলের হৃদয়কে গভীরভাবে স্পর্শ করে। এই অসামান্য যোগ্যতার স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে গাইবান্ধার বিয়াম ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজে ‘ক্লাস সুপারভাইজার’ হিসেবে সম্মানজনক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

 

অন্যদিকে, এই নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে তৃতীয় জন হলেন নড়াইল সদর উপজেলার অদম্য তরুণ মো. হাসমত আলী। তিনি একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। চোখের আলো না থাকলেও অন্তরের আলো ও প্রখর মেধার মাধ্যমে তিনি নিজেকে যোগ্য হিসেবে গড়ে তুলেছেন।

 

সরকারিভাবে তাকে সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীন ‘ইউনিয়ন সমাজকর্মী’ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এখন থেকে তিনি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কল্যাণে সরাসরি সরকারি সেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন।

 

এই আবেগঘন ও সম্মানজনক নিয়োগ প্রদান অনুষ্ঠানে সরকারের বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ও শীর্ষ কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন-সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন পুতুল, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ আবু ইউছুফ, বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. তরিকুল আলম এবং সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহ মোহাম্মদ মাহবুব।

 

তারা সকলেই প্রধানমন্ত্রীর এই উদ্যোগকে স্বাগত জানান এবং নবনিযুক্ত এই তিন সরকারি কর্মচারীর উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ ও সর্বাঙ্গীন সাফল্য কামনা করেন। সরকারপ্রধানের এই মানবিক উদ্যোগের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী কল্যাণ সমিতির প্রতিষ্ঠাতা আবদুস সাত্তার দুলাল গভীর সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

 

নিয়োগপত্র হস্তান্তরের পরপরই তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ করে তাকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন। তিনি উল্লেখ করেন, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতি এমন সংবেদনশীল ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ দেশের সামগ্রিক প্রতিবন্ধী সমাজের জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণা। এর ফলে আগামী দিনে সরকারি ও বেসরকারি সব ক্ষেত্রেই বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের কর্মসংস্থানের সুযোগ আরও প্রসারিত হবে বলে সংশ্লিষ্টরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন।