বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত জানিয়েছেন, সরকারি নানামুখী পদক্ষেপে আগামী বছর হজের খরচ জনপ্রতি অন্তত ৪০ থেকে ৪২ হাজার টাকা পর্যন্ত কমানোর একটি প্রবল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
মূলত বিমান ভাড়া যৌক্তিকীকরণ এবং সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন কর ও মাশুল হ্রাসের মাধ্যমেই এই ব্যয় সংকোচন সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬ তারিখে, রাজধানী ঢাকার চীন মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে তিন দিনব্যাপী আয়োজিত ‘জাতীয় পর্যায়ে হজ ও ওমরাহ মেলা ২০২৬’-এর জমকালো উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী এসব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরেন।
ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সার্বিক সহযোগিতা ও তত্ত্বাবধানে হজ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন ‘হজ এজেন্সিস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’ (হাব) অত্যন্ত সুচারুভাবে এই বৃহৎ মেলার আয়োজন করেছে।
হজ ব্যবস্থাপনাকে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও জনবান্ধব করার লক্ষ্যেই সংশ্লিষ্ট সকল মহলের উপস্থিতিতে এই মেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যেখানে পৃষ্ঠপোষক হিসেবে শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসি, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, সাউদিয়া এবং সাউথইস্ট ব্যাংক পিএলসিসহ দেশের স্বনামধন্য একাধিক আর্থিক ও বিমান পরিবহন সংস্থা যুক্ত রয়েছে।
হজের ব্যয় কমানোর রূপরেখা সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত জানান, প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় ইতোমধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত উড়োজাহাজ সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মুনাফার হার পূর্বের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা হয়েছে।
এর ফলে হজ যাত্রীদের জন্য বিমান ভাড়া এক লাখ ত্রিশ হাজার টাকায় নির্ধারণ করা সম্ভব হয়েছে। এর পাশাপাশি, সৌদি আরবের মাটিতে বিমানবন্দর কর এবং গাকা (সৌদি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ) মাশুল বাবদ প্রত্যেক হজযাত্রীর যে অতিরিক্ত দশ থেকে এগারো হাজার টাকা ব্যয় হয়, সেটি মওকুফ বা কমানোর জন্য সৌদি সরকারের সাথে জোর কূটনৈতিক আলোচনা শুরু হয়েছে।
ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূতের সাথে এ বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে এবং তিনি এই মাশুল কমানোর বিষয়ে ইতিবাচক আশ্বাস প্রদান করেছেন। আগামী সেপ্টেম্বর মাসে একটি বিশেষজ্ঞ কারিগরি দল চূড়ান্ত পর্যালোচনার মাধ্যমে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।
বিমান ভাড়ার প্রশাসনিক ব্যয় হ্রাস এবং সৌদি আরবের এই করগুলো কমানো সম্ভব হলে কেবল উড়োজাহাজ খাত থেকেই অন্তত চল্লিশ থেকে বিয়াল্লিশ হাজার টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব হবে। তবে সরকারের এই উদ্যোগের পাশাপাশি হজ প্যাকেজের সামগ্রিক মূল্য সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আনতে হজ ব্যবস্থাপনার সাথে জড়িত বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা এজেন্সিগুলোর প্রতিও বিশেষ আহ্বান জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, বিমান ভাড়া কমানোর পর হজ প্যাকেজের মূল্য আরও কমিয়ে আনার প্রধান ও নৈতিক দায়িত্ব নিতে হবে হজ এজেন্সিগুলোকে। বিশেষ করে সৌদি আরবে অবস্থানকালে হজযাত্রীদের জন্য যে আবাসন বা ঘরভাড়ার ব্যবস্থা করা হয়, তার ব্যয় যৌক্তিকভাবে কমিয়ে আনতে হবে।
এক্ষেত্রে এজেন্সিগুলোর আন্তরিক ও দায়িত্বশীল ভূমিকা অত্যন্ত অপরিহার্য। তবে তিনি কঠোরভাবে সতর্ক করে দেন যে, খরচ কমাতে গিয়ে কোনোভাবেই যেন পবিত্র হজ পালনে যাওয়া অতিথিদের সেবার মান বা স্বাচ্ছন্দ্য ক্ষুণ্ন না হয়, সেদিকে সর্বোচ্চ নজর রাখতে হবে।
হজ এজেন্সিগুলো যাতে হজযাত্রীদের সর্বোত্তম ও নির্বিঘ্ন সেবা প্রদান করতে পারে এবং সৌদি আরবে ঘরভাড়া সংক্রান্ত যেকোনো আর্থিক জটিলতা দ্রুত কাটিয়ে উঠতে পারে, সেজন্য সরকার অত্যন্ত সংবেদনশীল কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
হাব সদস্যদের দীর্ঘদিনের বকেয়া প্রায় বাষট্টি কোটি টাকা দ্রুততম সময়ের মধ্যে পরিশোধ করার জন্য ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে হজ ব্যবস্থাপনার সাথে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের প্রয়োজনীয় আর্থিক সক্ষমতা ফিরে পাবে এবং সুষ্ঠুভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে।
তাছাড়া ছোট কিংবা বড়-সব ধরনের এজেন্সি যেন সমান সুযোগ নিয়ে হজ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতার সাথে অংশগ্রহণ করতে পারে এবং কোনো প্রতিষ্ঠান যেন অন্যায্যভাবে বঞ্চিত না হয়, সে বিষয়ে সরকারের তদারকি ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হবে বলে অনুষ্ঠানে নিশ্চিত করা হয়।
সাধারণ হজযাত্রীদের কল্যাণে সরকারের নেওয়া অন্যান্য পদক্ষেপের কথাও অনুষ্ঠানে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তুলে ধরা হয়। প্রতিমন্ত্রী জানান, হজ ক্যাম্পে অবস্থানকালে হজযাত্রীদের খাবারের খরচ সম্পূর্ণ লাভবিহীন পর্যায়ে বা ক্রয়মূল্যে রাখার জন্য প্রধানমন্ত্রী সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন।
সেই নির্দেশনার আলোকে পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে খাবারের উচ্চমান বজায় রেখেই দাম কমানো হয়েছে, যা আগামী বছরগুলোতেও অব্যাহত থাকবে। এর বাইরে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে ‘নুসুক কার্ড’ এবং ‘রোড টু মক্কা’ প্রকল্পের মাধ্যমে হজযাত্রীদের যাতায়াত, ইমিগ্রেশন এবং পরিচয়পত্র সংক্রান্ত যেকোনো ধরনের হয়রানি শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা হয়েছে।
সমাজের আর্থিকভাবে অসচ্ছল কিন্তু ধর্মপ্রাণ মানুষদের হজ পালনের স্বপ্ন পূরণে সরকার আরও একটি যুগান্তকারী পরিকল্পনার কথা বিবেচনা করছে। দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের জন্য পবিত্র হজ পালন সহজতর করতে রাষ্ট্রীয়ভাবে যাকাত তহবিলের একটি অংশ ব্যবহার করা অথবা সরাসরি সরকারি ভর্তুকি প্রদানের মতো মানবিক চিন্তাভাবনা সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে চলছে।
এই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে হজ প্যাকেজের ব্যয় দেশের আপামর সাধারণ মানুষের সম্পূর্ণ নাগালের মধ্যে চলে আসবে। হাব সভাপতি সৈয়দ গোলাম সরওয়ারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই তাৎপর্যপূর্ণ অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিব মুন্সি আলাউদ্দিন আল আজাদ, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কাইজার সোহেল আহমেদ এবং ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি দূতাবাসের ডেপুটি হেড অব মিশন খালেদ সাঈদ আল হাদালসহ অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ।