শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গোলাপগঞ্জে এনসিপির গাড়িবহরে হামলা, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কঠোর গণপ্রতিরোধের হুঁশিয়ারি

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ৩০ জুলাই, ২০২৬, ০৪:৫৯ পিএম

গোলাপগঞ্জে এনসিপির গাড়িবহরে হামলা, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কঠোর গণপ্রতিরোধের হুঁশিয়ারি
ছবি : Collected

দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে সিলেটের গোলাপগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতৃবৃন্দের গাড়িবহরে অতর্কিত হামলার ঘটনা। বৃহস্পতিবার বিকেলে সংঘটিত এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও অনভিপ্রেত ঘটনার পর তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন দলটির আহ্বায়ক এবং জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম।

 

তিনি অত্যন্ত কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, সরকার যদি রাজনৈতিক শিষ্টাচার ভুলে সন্ত্রাসের পথ বেছে নেয়, তবে দেশের আপামর জনসাধারণও তাদের ন্যায্য অধিকার আদায়ে তীব্র প্রতিরোধের পথে হাঁটতে বাধ্য হবে।

 

পর পর দুটি জেলায় এমন প্রকাশ্য হামলার ঘটনা দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও রাজনৈতিক সহনশীলতার চরম অবনতিকেই নির্দেশ করছে বলে মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক ও সামাজিক বিশ্লেষকরা।

 

বৃহস্পতিবার শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবিপ্রবি) আয়োজিত এক বিশেষ স্মরণ ও আলোচনা সভা শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে নাহিদ ইসলাম এসব কথা বলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতীয় ছাত্রশক্তি শাখার উদ্যোগে ‘অগ্নিঝরা জুলাই: রক্তের ঋণ ও আগামীর বাংলাদেশ’ শীর্ষক এই তাৎপর্যপূর্ণ আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছিল।

 

সেখানে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক চেতনা এবং আগামী দিনের রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়। অনুষ্ঠান শেষে বের হওয়ার পরপরই গোলাপগঞ্জের হামলার খবর তার কাছে পৌঁছালে তিনি একটি তাৎক্ষণিক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে দলীয় অবস্থান ও ভবিষ্যৎ কর্মসূচির কথা অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরেন।

 

সংবাদ সম্মেলনে নাহিদ ইসলাম অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন যে, দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে সন্ত্রাস ও নৈরাজ্য মোকাবিলায় কেবল এগারো দলীয় জোটের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। তিনি বাংলাদেশের আপামর ছাত্র-জনতা থেকে শুরু করে সকল গণতান্ত্রিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তিকে দলমত নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানান।

 

গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, বুধবার হবিগঞ্জে এবং আজ গোলাপগঞ্জে যা ঘটল, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। দেশকে সুপরিকল্পিতভাবে আবারও সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে পরিণত করার অপচেষ্টা চলছে।

 

এই ধারাবাহিক হামলার মধ্য দিয়ে মূলত বর্তমান সরকারের অগণতান্ত্রিক ও সন্ত্রাসী চরিত্রই গোটা জাতির সামনে অত্যন্ত নগ্নভাবে উন্মোচিত হচ্ছে। তবে কোনো বাধাই তাদের গণতান্ত্রিক আন্দোলন থেকে দূরে সরাতে পারবে না বলে তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

 

হামলাকারীদের প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির এই শীর্ষ নেতা বলেন, সব ধরনের বাধা ও হুমকি থাকা সত্ত্বেও তারা গোলাপগঞ্জে যাবেন এবং রাজপথে বুক চিতিয়ে দাঁড়াবেন।

 

সরকারের মদদপুষ্ট ঠিক কতজন সন্ত্রাসী সেখানে উপস্থিত আছে এবং তারা একটি শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচিতে কতটুকু বাধা প্রদান করতে পারে, সেটি তারা সরাসরি মোকাবিলা করতে প্রস্তুত।

 

নাহিদ ইসলাম অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে, গণভোটের মাধ্যমে প্রাপ্ত গণরায়ের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে রাষ্ট্র সংস্কার, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের লুণ্ঠিত অধিকার আদায়ের পক্ষে তাদের পূর্বঘোষিত সকল কর্মসূচি যেকোনো মূল্যে অব্যাহত থাকবে। কোনো ধরনের ভয়ভীতি বা রক্তচক্ষু তাদের এই ন্যায়সঙ্গত পথ থেকে বিচ্যুত করতে পারবে না।

 

উল্লেখ্য, বৃহস্পতিবার দুপুর আড়াইটার দিকে সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার চৌমুহনীস্থ পৌরসভা কার্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনের ব্যস্ত রাস্তায় এনসিপির গাড়িবহর এই আকস্মিক হামলার শিকার হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, অতর্কিত এই হামলায় এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমের বহনকারী গাড়ির কাঁচ পুরোপুরি ভেঙে যায়।

 

তবে সৌভাগ্যবশত এই ঘটনায় গাড়িতে অবস্থানরত নেতৃবৃন্দের কেউ শারীরিকভাবে আহত হননি। অন্যদিকে, এই বহুল আলোচিত হামলার বিষয়ে সিলেট জেলার পুলিশ সুপার ড. চৌধুরী মো. যাবের সাদেক স্থানীয় গণমাধ্যমের কাছে কিছুটা ভিন্ন মত পোষণ করেছেন।

 

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এই শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, নেতৃবৃন্দের গাড়িগুলো রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় রাস্তার পাশ থেকে অজ্ঞাতনামা কেউ ইট বা ঢিল ছুঁড়ে মারে। এর ফলেই মূলত সারজিস আলমের গাড়ির কাঁচ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

 

পুলিশ সুপার এটিকে সুসংগঠিত বা পরিকল্পিত ‘গাড়িবহরে হামলা’ হিসেবে মানতে নারাজ। পাশাপাশি তিনি নিশ্চিত করেন যে, এই ঘটনায় কেউ আহত হয়েছেন এমন কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য পুলিশের কাছে পৌঁছায়নি।

 

গোলাপগঞ্জের এই ঘটনাটি কোনো আকস্মিক বা বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। এর ঠিক দুদিন আগে, গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় পার্শ্ববর্তী হবিগঞ্জ জেলায় এনসিপির পূর্বনির্ধারিত ‘জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচি শেষে ফেরার পথে দলটির গাড়িবহরে অনুরূপ এক ভয়াবহ হামলার ঘটনা ঘটেছিল।

 

সেই হামলায় জাতীয় নাগরিক পার্টির বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী গুরুতর আহত হন এবং বহরের একাধিক গাড়ি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দলের পক্ষ থেকে সেই হামলার জন্য সরাসরি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সহযোগী সংগঠন ছাত্রদল ও যুবদলের নেতাকর্মীদের দিকে অভিযোগের আঙুল তোলা হয়েছিল।

 

হবিগঞ্জের রেশ কাটতে না কাটতেই সিলেটে পুনরায় একই ধরনের হামলার ঘটনা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ভিন্নমতের প্রতি চরম অসহিষ্ণুতার প্রকাশ ঘটাচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের মনে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।