বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশনে আয়োজিত এক বিশেষ ও জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও আশাব্যঞ্জক ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন।
এই যুগান্তকারী ঘোষণাকালে তাঁর সঙ্গে সেখানে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান বিষয়ক মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানির এই নতুন অধ্যায় বাংলাদেশের অর্থনীতি ও রেমিট্যান্স প্রবাহে এক বিশাল ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে হওয়া সাম্প্রতিক ফলপ্রসূ আলোচনার বিস্তারিত দিক তুলে ধরেন।
তিনি অত্যন্ত আশাবাদের সঙ্গে জানান যে, বাংলাদেশ এবং মালয়েশিয়া উভয় দেশের সরকারই অত্যন্ত দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই শ্রমবাজার পুনরায় পুরোদমে চালুর বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত পোষণ করেছে।
একটি অত্যন্ত সুষ্ঠু, কাঠামোগত এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে যত দ্রুত সম্ভব বাংলাদেশের সাধারণ ও দক্ষ জনশক্তির জন্য মালয়েশিয়ার কর্মসংস্থানের বিশাল বাজার উন্মুক্ত করার লক্ষ্যে উভয় দেশের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
তিনি আরও নিশ্চিত করেন যে, নতুন এই চুক্তির আওতায় মালয়েশিয়ার অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি খাত এবং উপখাতেই বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য কাজের অবারিত সুযোগ তৈরি হবে, যা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত ও সম্ভাবনাময়।
প্রবাসী কল্যাণ খাতের অন্যতম প্রধান সমস্যা হিসেবে বিবেচিত জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর দৌরাত্ম্য এবং সিন্ডিকেট প্রথা বাতিলের বিষয়ে সরকার এবার অত্যন্ত কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে।
মাহদী আমিন দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেন যে, অতীতে যে সমস্ত প্রতিষ্ঠান সিন্ডিকেট তৈরি করে সাধারণ কর্মীদের জিম্মি করেছিল এবং নানাবিধ অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েছিল, তাদেরকে কোনোভাবেই নতুন অনুমোদিত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে না।
বিগত সময়ের অরাজকতা ও ফ্যাসিবাদী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যাদের বিন্দুমাত্র সম্পৃক্ততা রয়েছে, দেশের সাধারণ মানুষের স্বার্থে তাদেরকে জনশক্তি রপ্তানির এই নতুন ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া থেকে সম্পূর্ণভাবে বয়কট করা হবে।
তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে উল্লেখ করেন যে, মালয়েশিয়ার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তারা সিন্ডিকেটমুক্ত নতুন ও স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠানের তালিকা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করবে।
এর ফলে সাধারণ কর্মীরা আগের মতো আর প্রতারণা বা অতিরিক্ত আর্থিক শোষণের শিকার হবেন না বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। আগামী আগস্ট মাসের শেষ সপ্তাহ নাগাদ বাংলাদেশি কর্মীদের প্রথম দলটিকে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর যে চূড়ান্ত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা বাস্তবায়নে সরকার একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সংবাদ সম্মেলনে জানান যে, সম্পূর্ণ প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবং অভিবাসন ব্যয় সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখতে প্রথম ধাপে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ‘বোয়েসেল’ বা বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডের মাধ্যমে কর্মী পাঠানোর বিষয়ে মালয়েশিয়া সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব ও অনুরোধ জানানো হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় এই সংস্থার মাধ্যমে কর্মী প্রেরণের ফলে একদিকে যেমন মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমবে এবং কর্মীদের আনুষঙ্গিক অভিবাসন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে, অন্যদিকে তেমনি কর্মীদের দক্ষতা যাচাই এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করাও অনেক বেশি সহজতর হবে।
এই নতুন ও সম্পূর্ণ স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক শ্রম-কূটনীতি এক নতুন যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে, যা দেশের বেকারত্ব দূরীকরণ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধিতে অনন্য সাধারণ ভূমিকা পালন করবে।
দীর্ঘদিন ধরে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নানা কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল। বিশেষ করে অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়, ভিসা প্রক্রিয়াকরণে দীর্ঘসূত্রতা এবং শ্রমিকদের অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগগুলো বারবার সামনে আসছিল।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোও এ বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। তবে বর্তমান সরকারের ঐকান্তিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এবং মালয়েশিয়া সরকারের সদিচ্ছার ফলেই দীর্ঘদিনের এই অচলাবস্থার অবসান ঘটতে যাচ্ছে।
কুয়ালালামপুরে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশনও এ ব্যাপারে একটি অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। হাইকমিশনের নিবিড় পর্যবেক্ষণে এবং দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে অনুষ্ঠিত ধারাবাহিক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের মাধ্যমে শ্রমিকদের নিরাপত্তা, ন্যায্য মজুরি এবং উন্নত কর্মপরিবেশের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়গুলোতে একটি স্থায়ী ও গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে। এই উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের শ্রমবাজারের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল করবে।