তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন, বাংলাদেশ হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ সব ধর্ম, বর্ণ ও জাতিগোষ্ঠীর মানুষের সমান আইনি অধিকার ও পূর্ণ সামাজিক মর্যাদার একটি স্বাধীন ভূখণ্ড। কোনো স্বার্থান্বেষী মহল যেন ধর্মকে কেন্দ্র করে কোনো প্রকার কৃত্রিম রাজনৈতিক বা সামাজিক বিভেদ সৃষ্টি করে সমাজের শান্তিশৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করতে না পারে, সে বিষয়ে বর্তমান সরকার সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বলে তিনি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেছেন।
গত শুক্রবার (৩১ জুলাই) রাজধানীর কাকরাইলে অবস্থিত ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে এক গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভা ও প্রতিনিধি সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই সুদৃঢ় ও নীতিগত অবস্থান ব্যক্ত করেন।
‘সম্মিলিত সনাতন পরিষদ’-এর উদ্যোগে আয়োজিত ‘সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা বিধান’ শীর্ষক এই বিশেষ অনুষ্ঠানে দেশের বর্তমান আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।
বক্তব্যের শুরুতেই মন্ত্রী দেশের দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, হাজার বছর ধরে এই ভূখণ্ডে বিভিন্ন ধর্ম ও বর্ণের মানুষ অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ ও নিবিড় সম্প্রীতির সঙ্গে বসবাস করে আসছে। এটিই আমাদের বাঙালি জাতির প্রকৃত পরিচয় ও অহংকার।
তাই নতুন করে হীন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বা ধর্মের ভিত্তিতে এ দেশের সাধারণ মানুষকে বিভক্ত করার কোনো অপচেষ্টা কখনো সফল হবে না। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রতি গভীর সম্মান ও একাত্মতা প্রকাশ করে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে বা রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিকোণ থেকে কখনোই তাঁদের ‘সংখ্যালঘু’ হিসেবে বিবেচনা করেন না।
বরং তাঁরা প্রত্যেকেই এ দেশের সমান অধিকারপ্রাপ্ত সন্তান এবং গর্বিত নাগরিক। রাষ্ট্রের চোখে প্রতিটি নাগরিকের আইনি ও সাংবিধানিক অবস্থান সম্পূর্ণ সমান এবং এখানে ধর্ম বা সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে কাউকে আলাদা করে দেখার বা বঞ্চনার শিকার করার কোনো সুযোগ নেই বলে তিনি জোরালোভাবে উল্লেখ করেন।
মহান মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, ১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক মুক্তিযুদ্ধ ছিল এ দেশের সব স্তরের মানুষের স্বাধীনতা, আত্মমর্যাদা ও সার্বিক অর্থনৈতিক মুক্তির এক অবিস্মরণীয় মহাকাব্যিক সংগ্রাম।
সেই অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে গভীরভাবে ধারণ করেই একটি গণতান্ত্রিক, মানবিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য বর্তমান সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি কোনোভাবেই কেবল ধর্মীয় পরিচয় হতে পারে না, বরং একমাত্র ‘নাগরিক পরিচয়’ই হবে এই রাষ্ট্রের মূল চালিকাশক্তি ও ঐক্যের প্রতীক।
তিনি অভিযোগ করেন, একটি নির্দিষ্ট অপকৃষ্ট মহল নিজেদের হীন রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য সুকৌশলে ধর্মের নামে বিভেদ সৃষ্টি করে দেশের আবহমানকালের সম্প্রীতি নষ্ট করার নিরন্তর অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
এ ধরনের যেকোনো অপতৎপরতা, উসকানি ও দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে দেশের সব ধর্ম ও বর্ণের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ থাকার উদাত্ত আহ্বান জানান তিনি। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, আধুনিক ও প্রগতিশীল বাংলাদেশে উগ্রবাদ, জঙ্গিবাদ ও অন্ধ মৌলবাদের কোনো স্থান হতে পারে না।
সরকারের মূল লক্ষ্য ও ভিশন হলো একটি উদার, গণতান্ত্রিক, নিরাপদ ও সম্প্রীতিপূর্ণ উন্নত বাংলাদেশ গঠন করা। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে সব ধর্মাবলম্বীর জানমাল এবং উপাসনালয়ের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কী ধরনের কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, তা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী।
তিনি জানান, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা এবং রথযাত্রাসহ অন্যান্য সব ধর্মীয় অনুষ্ঠানে সরকার দেশজুড়ে সর্বাত্মক প্রশাসনিক সহযোগিতা ও নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে।
কোনো দুর্বৃত্ত, সুযোগসন্ধানী বা সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী যেন কোনোভাবেই এই উৎসবমুখর ও সম্প্রীতির পরিবেশকে কলুষিত বা নষ্ট করতে না পারে, সে জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সর্বদাই সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
পাশাপাশি তিনি সনাতন সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানিয়ে বলেন, তাঁদের যেকোনো সমস্যা, অভিযোগ ও যৌক্তিক দাবিদাওয়া যেন সুসংগঠিতভাবে ও নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে তুলে ধরা হয়।
বর্তমান সরকার পারস্পরিক আলোচনা, বোঝাপড়া ও গঠনমূলক সংলাপের মাধ্যমে অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে সেসব যৌক্তিক দাবির দ্রুত ও ইতিবাচক সমাধানে কাজ করতে সর্বদা প্রস্তুত রয়েছে।
পরিশেষে, বাংলাদেশের গৌরবময় ইতিহাস ও ধারাবাহিক গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে আরও বেগবান করার লক্ষ্যে সবাইকে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনা অন্তরে ধারণ করার আহ্বান জানান মির্জা ফখরুল।
একই সঙ্গে তিনি গভীরভাবে স্মরণ করিয়ে দেন যে, দেশে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য যে দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী গণ-আন্দোলন হয়েছে এবং যে অগণিত সাধারণ মানুষ হাসিমুখে আত্মত্যাগ করেছেন, সেই ত্যাগের ইতিহাসও আমাদের সর্বদা মনে রাখতে হবে।
ধর্মের ভিত্তিতে কোনো সামাজিক বিভাজন বা বৈষম্য নয়, বরং পারস্পরিক গভীর শ্রদ্ধা, সামাজিক সম্প্রীতি এবং সমঅধিকারের সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই আগামী দিনের বাংলাদেশ বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে সগৌরবে এগিয়ে যাবে বলে তিনি প্রবল আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
উল্লেখ্য, অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এই মতবিনিময় সভা ও প্রতিনিধি সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন বর্তমান সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। অনুষ্ঠানে অন্যান্য বিশিষ্ট অতিথিদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকার এবং ময়মনসিংহ-৮ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুল্লাহেল মাজেদসহ সনাতন সম্প্রদায়ের বিভিন্ন পর্যায়ের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ।