সংযুক্ত আরব আমিরাতে সম্প্রতি তার শর্তসাপেক্ষ জামিন মঞ্জুর হওয়ার পর, সেই জামিন বাতিলের জন্য বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে জোরদার আইনি প্রক্রিয়া শুরু করেছে। একই সঙ্গে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল তথ্য সামনে এসেছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গভীর সন্দেহ প্রকাশ করেছেন যে, পুলিশের সাবেক এই শীর্ষ কর্মকর্তার কাছে অন্য কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের পাসপোর্ট থাকতে পারে। সোমবার সচিবালয়ে নিজ দপ্তরের সামনে উপস্থিত সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের বিস্তারিত জবাব দিতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দেশি-বিদেশি নানামুখী তৎপরতা ও সমসাময়িক অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতির একটি বিস্তৃত চিত্র তুলে ধরেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি স্থানীয় আদালত সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে দেশত্যাগের নিষেধাজ্ঞাসহ বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট শর্তের বিনিময়ে জামিন প্রদান করেছেন।
তবে এই জামিনের বিষয়টি জানার পরপরই বাংলাদেশ সরকার বিন্দুমাত্র কালক্ষেপণ করেনি। তাৎক্ষণিকভাবে দেশটিতে নিয়োজিত বাংলাদেশের পক্ষের আইনি প্রতিষ্ঠানকে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যাতে তারা দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই জামিন আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করে এবং তা বাতিলের জন্য সংশ্লিষ্ট আদালতে আনুষ্ঠানিকভাবে পিটিশন দাখিল করে।
আন্তর্জাতিক পরিসরে এই ধরনের আইনি লড়াই অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় সরকার প্রতিটি পদক্ষেপ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে গ্রহণ করছে। শুধু আইনি পদক্ষেপই নয়, কূটনৈতিক পর্যায়েও জোরালো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিশ্চিত করেছেন।
তিনি জানান, সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে ইতোমধ্যে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। ঠিক কী কী আইনি শর্তের ভিত্তিতে এবং কোন প্রেক্ষাপটে বেনজীর আহমেদকে জামিন দেওয়া হয়েছে, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ জানতে আদালতের আদেশের সত্যায়িত কপি সংগ্রহের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
অভিযুক্ত এই সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি করতে বর্তমান সরকার আইনি ও কূটনৈতিক-উভয় প্রক্রিয়াকেই সমান্তরালভাবে সক্রিয় রেখেছে। তবে এর মধ্যেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যে শঙ্কার কথাটি উচ্চারণ করেছেন, তা পুরো পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
তিনি বলেন, বেনজীর আহমেদের কাছে অন্য কোনো দেশের পাসপোর্ট থাকার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে, যা তাকে দেশত্যাগের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ভিন্ন কোনো উপায়ে পালিয়ে যেতে সহায়তা করতে পারে। এই সন্দেহের কারণেই সরকার বিষয়টি নিয়ে আরও বেশি সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
আন্তর্জাতিক এই আইনি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং সাম্প্রতিক কিছু উদ্বেগজনক ঘটনা নিয়েও গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে বিস্তারিত কথা বলেন।
বিশেষ করে, রাজধানী ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে মেট্রোরেল এবং শহরতলির আশুলিয়ায় বোমা আতঙ্কের যে ঘটনাগুলো ঘটেছে, তা নিয়ে জনমনে সৃষ্ট ভীতির বিষয়ে তিনি সরকারের শক্ত অবস্থান পরিষ্কার করেন।
সাম্প্রতিক রথযাত্রার উৎসবমুখর দিনগুলোতে দেশজুড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার থাকা সত্ত্বেও একটি বিশেষ মহল পরিকল্পিতভাবে নাশকতার চেষ্টা চালিয়েছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।
মন্ত্রী বিস্তারিতভাবে জানান যে, রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত এলাকা মতিঝিলে মেট্রোরেলের একটি পিলারের নিচে এবং এর পরবর্তী সময়ে ঢাকার অদূরে আশুলিয়া এলাকায় পরিত্যক্ত অবস্থায় বোমা সদৃশ সন্দেহজনক বস্তু উদ্ধার করা হয়।
তবে খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাংলাদেশ পুলিশের চৌকস বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দল অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সঙ্গে এবং দ্রুততম সময়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে বস্তুগুলো সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় করতে সক্ষম হয়, যার ফলে বড় ধরনের কোনো ক্ষয়ক্ষতি বা দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মনে করেন, দেশের চলমান স্থিতিশীলতা এবং হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করার এক গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই কোনো স্বার্থান্বেষী মহল এই ধরনের কাজ করতে পারে।
মতিঝিল ও আশুলিয়ার এই দুটি ঘটনার নেপথ্যে অভিন্ন কোনো চক্র কাজ করছে কি না বা এই দুই ঘটনার মধ্যে কোনো গভীর যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা উদ্ঘাটন করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক ইউনিট বর্তমানে নিবিড়ভাবে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।
তবে সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করে মন্ত্রী অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছেন যে, বিচ্ছিন্ন এই ঘটনাগুলো নিয়ে বর্তমানে আতঙ্কিত হওয়ার বা ভয় পাওয়ার মতো কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিটি সদস্য সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছেন এবং যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশের বিশেষায়িত টিমগুলো সার্বক্ষণিক নজরদারি অব্যাহত রেখেছে।
সবশেষে, আসন্ন ৫ আগস্টের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে যে কানাঘুষা চলছে এবং বিশেষ করে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য রাজনৈতিক তৎপরতা নিয়ে সাংবাদিকদের করা এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অত্যন্ত কড়া ভাষায় সরকারের অবস্থান ব্যক্ত করেন।
তিনি সাম্প্রতিক সময়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে মাফিয়া শক্তি হিসেবে পরিচিত এই দলটির বর্তমান সাংগঠনিক অবস্থার সমালোচনা করেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, বড় ধরনের কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করার মতো সাংগঠনিক শক্তি বা সক্ষমতা এই দলটির বর্তমানে অবশিষ্ট নেই।
তা সত্ত্বেও, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার স্বার্থে এবং যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত বা অপ্রীতিকর পরিস্থিতি কঠোর হস্তে দমন করতে সরকার বদ্ধপরিকর। বিশেষ করে, মাঠে নিয়োজিত পুলিশ সদস্যদের ব্যক্তিগত ও পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুরো বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার জন্য সাধারণ ও সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে তার বক্তব্যের উপসংহারে বলেন যে, দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বর্তমানে সম্পূর্ণরূপে সরকারের কঠোর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং রাষ্ট্রের শান্তি-শৃঙ্খলা বিনষ্ট করতে পারে এমন সব ধরনের উগ্রবাদী ও নাশকতামূলক তৎপরতা অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে প্রতিনিয়ত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।