তিনি দেশের প্রতিটি নাগরিকের প্রতি গভীর সংবেদনশীলতা প্রকাশ করে আশ্বস্ত করেছেন যে, সংকট সমাধানের জন্য সরকার নিরন্তর ও নিবিড়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) বিকেলে রাজধানীর ফার্মগেটে অবস্থিত কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ মিলনায়তনে আয়োজিত এক বিশেষ স্মরণসভায় তিনি এসব কথা বলেন।
ঐতিহাসিক জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এই আলোচনা সভার আয়োজন করে। সভার মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘গণতন্ত্র আদায়ে ১৭ বছরের অনির্বার সংগ্রাম ও রক্তঝরা জুলাই জাগরণ’।
এই অনুষ্ঠানে তিনি সমসাময়িক জাতীয় সংকট, রাষ্ট্রের বর্তমান অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ রূপরেখা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের কষ্ট প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে বলেন, দেশের আপামর জনসাধারণ বর্তমানে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের কারণে যে একটি অত্যন্ত কঠিন এবং কষ্টকর পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করছেন, সে বিষয়ে সরকার পুরোপুরি অবগত।
এই সমস্যার রাতারাতি কোনো সমাধান না থাকলেও, সরকার বসে নেই। বাস্তব অভিজ্ঞতা, বিশেষজ্ঞ পরামর্শ এবং সর্বোচ্চ সাধ্যের সমন্বয় ঘটিয়ে সাধারণ মানুষকে এই দুর্ভোগের অবসান ঘটাতে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে প্রশাসন। জনগণের ভোগান্তি লাঘব করাই সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার।
জ্বালানি খাতের এই দুরবস্থার পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বিগত সরকারের কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ এবং গ্যাস নিয়ে মানুষ যে অবর্ণনীয় সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন, তার মূল শেকড় অনেক গভীরে প্রোথিত।
ক্ষমতাচ্যুত ফ্যাসিবাদী সরকার বিগত বছরগুলোতে দেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই খাতটিকে নিজেদের পকেট ভারী করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। বছরের পর বছর ধরে চলা লাগামহীন দুর্নীতি, অনিয়ম ও লুটপাটের কারণে দেশের পুরো জ্বালানি কাঠামো আজ সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত।
দীর্ঘদিনের দুর্নীতির শিকার হয়ে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া একটি খাতকে রাতারাতি পুনর্গঠন করা সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত সময় ও সুপরিকল্পিত দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার। সংকট উত্তরণে সরকার বসে নেই জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জ্বালানি ঘাটতি মেটাতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
প্রতিবেশী রাষ্ট্র মিয়ানমার থেকে গ্যাস আমদানি করে দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি চাহিদা মেটানোর একটি প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু করা হয়েছে। পাশাপাশি মালয়েশিয়াও বাংলাদেশের এই সংকট নিরসনে সহযোগিতার আশ্বাস প্রদান করেছে।
সরকারের এই উদ্যোগ আগামী দিনে অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে ও জনদুর্ভোগ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে। রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুদায়িত্ব নেওয়ার পর দেশের সার্বিক কাঠামোর ভয়াবহ চিত্র নিয়েও গভীরভাবে আলোকপাত করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তিনি আক্ষেপের সঙ্গে উল্লেখ করেন, নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর দেখেছে দেশের প্রতিটি খাত ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে অবস্থান করছে। সম্পূর্ণ ভঙ্গুর ও বিপর্যস্ত অর্থনীতি, চরম বিশৃঙ্খল স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং দলীয়করণে বিভক্ত এক প্রশাসন উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে বর্তমান সরকার।
একটি রাষ্ট্রের স্বাভাবিক পরিচালনার জন্য যতগুলো গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা থাকে, তার প্রায় প্রত্যেকটিই বিগত সরকারের দীর্ঘ শাসনে পদ্ধতিগতভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই ঐতিহাসিক আন্দোলন কোনো একক ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট কোনো দলের সম্পত্তি নয়।
এটি ছিল দেশের আপামর জনসাধারণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের এক সফল আন্দোলন। সাধারণ মানুষ নিজেদের অধিকার রক্ষায় ইতিবাচক পরিবর্তন চেয়েছিল বলেই এই গণআন্দোলন চূড়ান্ত সফলতা পেয়েছে। তাই এই অভাবনীয় সফলতার একমাত্র দাবিদার দেশের সর্বস্তরের মানুষ।
যখন দেশের সব শ্রেণির জনগণ সম্পূর্ণ সম্পৃক্ত হয়ে রাজপথে নেমে এসেছে, তখনই ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পতন নিশ্চিত হয়েছে। রাষ্ট্র মেরামতের ভবিষ্যৎ রূপরেখা হিসেবে বিএনপি ঘোষিত বহুল আলোচিত ৩১ দফা দাবির বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, বিগত নির্বাচনে দেশের সাধারণ জনগণ এই ৩১ দফা রূপরেখার প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে বিএনপির পক্ষে তাদের রায় প্রদান করেছে। জনগণের এই নিরঙ্কুশ ম্যান্ডেট পাওয়ার পর এই ৩১ দফা এখন আর কেবল রাজনৈতিক দলের ইশতেহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি এখন সমগ্র বাংলাদেশের আপামর জনগণের আকাঙ্ক্ষার, মুক্তির এবং রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফায় পরিণত হয়েছে।
পরিশেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দৃঢ়তার সঙ্গে পুনর্ব্যক্ত করেন যে, তাদের ঘোষিত এই ৩১ দফার মূল ও প্রধান লক্ষ্যই হলো দেশের প্রতিটি নাগরিকের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার পুনরায় প্রতিষ্ঠা করা।
একইসঙ্গে, দীর্ঘদিনের দুর্নীতি, দলীয়করণ ও অপশাসনে ধ্বংস হয়ে যাওয়া রাষ্ট্রকাঠামোকে একটি আধুনিক, জবাবদিহিমূলক এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে পুনর্গঠন করার ক্ষেত্রে এই ৩১ দফা ঐতিহাসিক পথনকশা হিসেবে কাজ করবে। সরকার সেই লক্ষ্য অর্জনেই অবিচল রয়েছে।