শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

৫ আগস্ট স্বৈরাচারমুক্ত গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার দিন: প্রধানমন্ত্রী

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৪ আগস্ট, ২০২৬, ০৯:৫৬ পিএম

৫ আগস্ট স্বৈরাচারমুক্ত গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার দিন: প্রধানমন্ত্রী
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ৫ আগস্ট একটি অবিস্মরণীয় এবং ঐতিহাসিক দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। দুই বছর আগে সংঘটিত দেশের আপামর ছাত্র-জনতার নজিরবিহীন গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসনের অবসান ঘটেছিল।

 

সেই ঐতিহাসিক দিনটির দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে দেওয়া এক বিশেষ রাষ্ট্রীয় বাণীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ৫ আগস্টকে দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার এক গৌরবোজ্জ্বল দিন হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

 

তিনি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছেন সেইসব অকুতোভয় বীর শহীদদের, যাদের চরম আত্মত্যাগের বিনিময়ে বাংলাদেশ একটি ভয়াবহ ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থা থেকে চিরতরে মুক্তি লাভ করেছিল।

 

প্রধানমন্ত্রীর মতে, অগণিত মুক্তিকামী মানুষের পবিত্র রক্ত এবং নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগ কখনোই বৃথা যায়নি; বরং তাদের সেই ঐতিহাসিক আন্দোলনের পথ ধরেই এদেশের জনসাধারণ নিজেদের লুণ্ঠিত গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সুগম পথ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।

 

বুধবার, ৫ আগস্ট, জুলাই-আগস্টের সেই রক্তক্ষয়ী গণ-অভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশবাসীর প্রতি তার আবেগঘন ও দিকনির্দেশনামূলক বার্তা তুলে ধরেন।

 

বাণীতে তিনি গভীরভাবে উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতাপ্রিয়, দেশপ্রেমিক এবং গণতন্ত্রকামী প্রতিটি মানুষের জন্য ৫ আগস্ট কেবল একটি তারিখ নয়, এটি এক অপরিসীম আনন্দ, চূড়ান্ত বিজয় এবং দীর্ঘদিনের হারানো রাজনৈতিক অধিকার ফিরে পাওয়ার এক অবিস্মরণীয় দিন।

 

তিনি বলেন, দেশের সর্বস্তরের ছাত্র-জনতার প্রবল ও অপ্রতিরোধ্য গণ-অভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিস্ট সরকার ক্ষমতা ছেড়ে দেশ থেকে পালাতে বাধ্য হয়েছিল। আর সেই ঐতিহাসিক পলায়নের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশ দীর্ঘ দেড় দশকের দুঃশাসন থেকে মুক্ত হয়ে এক নতুন ভোরের দেখা পায়।

 

বিগত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে যে ভয়াবহ রাজনৈতিক নিপীড়ন ও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস চালানো হয়েছিল, প্রধানমন্ত্রী তার বাণীতে সেই অন্ধকার অধ্যায়ের কথা স্পষ্টভাবে স্মরণ করিয়ে দেন।

 

তিনি জানান, দেশে সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার ও প্রকৃত গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দীর্ঘস্থায়ী এবং আপসহীন আন্দোলনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সহ ফ্যাসিবাদবিরোধী সকল রাজনৈতিক দল এবং ভিন্নমতের অসংখ্য সাধারণ মানুষ অকথ্য নির্যাতন, গুম, খুন, অপহরণ, নির্বিচার হামলা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যা মামলার শিকার হয়েছেন।

 

গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের এই কণ্টকাকীর্ণ পথে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আপসহীন নেত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়াকে দীর্ঘ সময় ধরে অন্যায়ভাবে কারাবন্দি জীবনযাপন করতে হয়েছে, যা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে চিরদিন লিপিবদ্ধ থাকবে।

 

তৎকালীন স্বৈরাচারী সরকারের ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের নির্মম চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের গণতন্ত্রকামী মুক্ত মানুষের স্বাধীন কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করে দেওয়ার ঘৃণ্য উদ্দেশ্যে সারা দেশে গোপনে শত শত বন্দিশালা বা কুখ্যাত ‘আয়নাঘর’ গড়ে তোলা হয়েছিল।

 

রাষ্ট্রের সেই অন্ধকার প্রকোষ্ঠগুলোতে বিচারবহির্ভূতভাবে অসংখ্য নিরপরাধ মানুষকে বছরের পর বছর চরম অমানবিক অবস্থায় আটকে রাখা হয়েছিল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, তাদের মধ্যে অনেকেই আজ পর্যন্ত নিখোঁজ রয়েছেন।

 

তিনি গভীর উদ্বেগের সঙ্গে স্মরণ করেন যে, বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস আলী এবং কমিশনার চৌধুরী আলমসহ অসংখ্য রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও সাধারণ নাগরিকের আজও কোনো সন্ধান মেলেনি, যা একটি স্বাধীন দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির ভয়াবহ দৃষ্টান্ত।

 

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ধ্বংসযজ্ঞের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী কঠোর ভাষায় অভিযোগ করেন যে, বিচার বিভাগ এবং নির্বাচন কমিশনসহ রাষ্ট্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সকল সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে সুপরিকল্পিতভাবে দলীয়করণের মাধ্যমে অকার্যকর করে দেওয়া হয়েছিল।

 

এর মূল উদ্দেশ্যই ছিল দেশের সাধারণ জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখা। নির্বাচনব্যবস্থাকে একটি প্রহসনে পরিণত করা হয়েছিল এবং এর ছত্রছায়ায় নজিরবিহীন দুর্নীতি, অবাধ লুটপাট এবং দেশ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করার মতো গুরুতর অপরাধগুলোকে রাষ্ট্রের স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত করা হয়েছিল বলে তিনি বাণীতে দৃঢ়ভাবে উল্লেখ করেন।

 

২০২৪ সালের জুলাই এবং আগস্ট মাসে সংঘটিত গণ-অভ্যুত্থানের বিশালতা ও সর্বব্যাপী ব্যাপ্তি তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, সেই ঐতিহাসিক আন্দোলনে কেবল ছাত্রসমাজই নয়, বরং দেশের সাধারণ কৃষক, শ্রমজীবী মানুষ, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, সংস্কৃতিকর্মী এবং নারীসমাজসহ সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ নিজেদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে নির্ভয়ে রাজপথে নেমে এসেছিলেন।

 

এই সর্বাত্মক ও শান্তিপূর্ণ গণ-আন্দোলন দমন করার জন্য তৎকালীন সরকারের নির্দেশে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা নির্বিচারে গুলি চালিয়ে অসংখ্য নিরীহ মানুষকে হত্যা ও মারাত্মকভাবে আহত করে।

 

রংপুরের বীর সন্তান আবু সাঈদ, চট্টগ্রামের অকুতোভয় তরুণ ওয়াসিম আকরাম এবং ঢাকার মেধাবী ছাত্র মুগ্ধসহ নাম না জানা অসংখ্য শহীদের নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগ সেই আন্দোলনে সমগ্র জাতির বুকে এক অভূতপূর্ব সাহসের সঞ্চার করেছিল।

 

এই রক্তক্ষয়ী আন্দোলনে হাজারো প্রাণ ঝরে গেছে এবং অন্তত ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষ গুরুতর আহত হয়েছেন, যাদের অনেকেই রাষ্ট্রের বুলেটের আঘাতে চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন অথবা দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে এক দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন।

 

গণতন্ত্রকামী জনগণের সেই সম্মিলিত ও দুর্বার গণ-আন্দোলনের মুখে ৫ আগস্টের নাটকীয় পটপরিবর্তনের কথা বর্ণনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফ্যাসিস্ট শাসক গণভবন ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।

 

একইসঙ্গে তথাকথিত ও অনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা জাতীয় সংসদ ভবন ছেড়ে, প্রধান বিচারপতি আদালত প্রাঙ্গণ ছেড়ে, এমনকি বায়তুল মোকাররমের প্রধান খতিব পর্যন্ত নিজ দায়িত্ব ফেলে পালিয়ে যান। তৎকালীন মন্ত্রিসভার সদস্যরা এবং ফ্যাসিবাদের সকল সুবিধাভোগী দোসররা প্রাণভয়ে আত্মগোপনে চলে যেতে বাধ্য হন।

 

৫ আগস্ট বাংলাদেশে যে যুগান্তকারী ঘটনাটি ঘটেছে, তা শুধু বাংলাদেশের গণ্ডিতে নয়, বরং সমগ্র বিশ্বের রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক ইতিহাসেও এক বিরল এবং নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

 

পরিশেষে, দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র এবং মানুষের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ ও রক্তঝরা সংগ্রামে আত্মত্যাগকারী সকল বীর শহীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন প্রধানমন্ত্রী।

 

তিনি ঘোষণা করেন যে, প্রতিটি শহীদ পরিবারের কাছে আজকের এই স্বাধীন বাংলাদেশ চিরঋণী এবং তাদের প্রতি সমগ্র জাতির এক বিশাল দায়বদ্ধতা রয়েছে। পাশাপাশি তিনি দেশবাসীর উদ্দেশে এই মর্মে সুস্পষ্ট হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন যে, ভবিষ্যৎ বাংলাদেশে আর কখনোই কোনো স্বৈরাচার, ফ্যাসিবাদ, চরমপন্থা বা উগ্রবাদের উত্থান হতে দেওয়া হবে না।

 

একটি বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিনির্মাণে জাতীয় ঐক্য অটুট রেখে জনগণের অধিকার রক্ষায় জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একসঙ্গে কাজ করার উদাত্ত আহ্বান জানান তিনি।