শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
যেভাবে গণ-অভ্যুত্থানে পতন হলো সরকারের

নিদ্রাহীন রাতের পর রাজপথে ছাত্র-জনতার ঢল!

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৫ আগস্ট, ২০২৬, ০২:০২ এএম

নিদ্রাহীন রাতের পর রাজপথে ছাত্র-জনতার ঢল!
ছবি: সংগৃহীত

অনিশ্চয়তা ও চরম উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে পার হওয়া একটি দীর্ঘ নিদ্রাহীন রাতের পর যখন সকাল হলো, তখন দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট অত্যন্ত দ্রুতগতিতে বদলাতে শুরু করে। একদিকে তৎকালীন সরকার ঘোষিত অনির্দিষ্টকালের জন্য জারি করা কঠোর সান্ধ্য আইন, আর অন্যদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সরকার পতনের এক দফা দাবিতে ‘ঢাকা অভিমুখে যাত্রা’ কর্মসূচি।

 

আগের কয়েক দিন ধরে চলা দেশব্যাপী রক্তপাত ও সংঘাতের কারণে সাধারণ মানুষের মনে একটাই প্রশ্ন ছিল, চলমান এই ভয়াবহ পরিস্থিতির কি অবসান ঘটবে, নাকি লাশের সারি আরও দীর্ঘ হবে। তবে ৫ আগস্টের সকাল হতেই সমস্ত ভয় ও শঙ্কাকে পেছনে ফেলে অগণিত ছাত্র-জনতা সান্ধ্য আইন অমান্য করে রাজপথে নেমে আসেন।

 

তাদের এই স্বতঃস্ফূর্ত ও বাঁধভাঙা গণ-আন্দোলনের মুখে শেষ পর্যন্ত তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছেড়ে দেশ থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন, যার মধ্য দিয়ে রচিত হয় ছাত্র-জনতার এক ঐতিহাসিক বিজয়।

 

এই চূড়ান্ত বিজয়ের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল আগের দিন অর্থাৎ ৪ আগস্ট সন্ধ্যায়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে পূর্বনির্ধারিত ৬ আগস্টের কর্মসূচিকে একদিন এগিয়ে এনে ৫ আগস্টেই চূড়ান্ত লড়াইয়ের ডাক দেন।

 

দেশবাসীকে ইতিহাসের অংশ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি যেকোনো উপায়ে ঢাকায় সমবেত হওয়ার অনুরোধ করেন। একই সঙ্গে শাহবাগে শ্রমিক সমাবেশ ও কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নারী সমাবেশসহ দেশব্যাপী গণ-অবস্থানের ঘোষণা দেওয়া হয়।

 

আরেক সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে জানিয়ে দেন যে, অন্তর্জাল বা ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হলেও কিংবা আন্দোলনের শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার করা হলেও সরকার পতনের চূড়ান্ত দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এই অহিংস সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে।

 

পরদিন ৫ আগস্ট ভোর থেকেই রাজধানী ঢাকা যেন এক অবরুদ্ধ ও বিচ্ছিন্ন নগরীতে পরিণত হয়। মোড়ে মোড়ে সেনাবাহিনী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ, র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন এবং পুলিশের সশস্ত্র ও কড়া অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও থমথমে করে তোলে।

 

মহাখালী, বনানী, গুলশান, কারওয়ান বাজার, শাহবাগ থেকে শুরু করে যাত্রাবাড়ী ও মোহাম্মদপুরসহ রাজধানীর প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও প্রবেশপথে কাঁটাতারের প্রতিবন্ধক স্থাপন করা হয়। বিশেষ করে যাত্রাবাড়ী, গাবতলী ও আব্দুল্লাহপুরের মতো প্রবেশমুখগুলোতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক তল্লাশিচৌকি বসানো হয়।

 

আবাসিক এলাকার অলিগলিতেও ছিল কড়া পাহারা এবং মাইকে বারবার ঘোষণা দিয়ে জনসাধারণকে নিজ নিজ ঘরে অবস্থানের নির্দেশ দেওয়া হচ্ছিল। এমনকি যাদের কাছে বিশেষ চলাচলের অনুমতিপত্র ছিল, তাদেরও পথে পথে ব্যাপক তল্লাশি ও জিজ্ঞাসাবাদের সম্মুখীন হতে হয়।

 

সকাল দশটা পর্যন্ত জরুরি প্রয়োজনে বের হওয়া গুটিকয়েক মানুষ ছাড়া ঢাকার রাজপথ ছিল একেবারেই জনশূন্য। তবে সকাল দশটার পর থেকে রাজধানীর অবরুদ্ধ চিত্র জাদুকরীভাবে বদলাতে শুরু করে। সান্ধ্য আইনের তোয়াক্কা না করে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে রাজপথে বেরিয়ে আসতে শুরু করেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

 

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের এই মিছিলে স্বতঃস্ফূর্তভাবে যোগ দেন শিক্ষক, চাকরিজীবী, শ্রমজীবী মানুষ, উদ্বিগ্ন অভিভাবকসহ সব শ্রেণি-পেশার ও নানা বয়সের হাজারো সাধারণ নাগরিক। বেলা এগারোটার দিকে সারা দেশে মুঠোফোন ও তারযুক্ত ইন্টারনেট সেবা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়।

 

কিন্তু এই যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা আন্দোলনকারীদের অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রাকে বিন্দুমাত্র স্তিমিত করতে পারেনি। বরং ঢাকার চারপাশ থেকে মানুষের ঢল ক্রমাগত শাহবাগমুখী হতে থাকে। সকাল সাড়ে দশটার দিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের বহির্বিভাগের পাশের গলিতে হাতে বহনযোগ্য শব্দযন্ত্র নিয়ে শত শত মানুষ এক দফার স্লোগান দিতে জড়ো হন।

 

ওই সময় শাহবাগ মোড়ে সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া যানসহ বিপুলসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য পুরো এলাকাটি কড়া নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন। হাসপাতালগামী রোগী ও চিকিৎসকদেরও ব্যাপক তল্লাশির মুখে পড়তে হচ্ছিল।

 

বেলা সাড়ে এগারোটার পর চাঁনখাঁরপুলের দিক থেকে মুহুর্মুহু গুলির শব্দ ও বড় ধরনের বিস্ফোরণের আওয়াজ ভেসে এলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। তবে দুপুর বারোটার কিছুক্ষণ পর মৎস্য ভবনের দিক থেকে প্রায় পাঁচশ মানুষের একটি বিশাল মিছিল স্লোগান দিতে দিতে শাহবাগের দিকে অগ্রসর হয়, যার সামনের সারিতে ছিলেন অসংখ্য সাহসী নারী।

 

মিছিলটি যখন শাহবাগের পাদচারী-সেতুর কাছে পৌঁছায়, তখন সেনাবাহিনী তাদের থামানোর চেষ্টা করে। ঠিক সেই মুহূর্তে প্রথম সারিতে থাকা আন্দোলনকারীরা অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে সেনাসদস্যদের হাতে ফুল তুলে দেন। এই অভাবনীয় ও আবেগঘন দৃশ্য উপস্থিত সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং মুহূর্তে পুরো পরিস্থিতি বদলে দেয়।

 

এরপর আর কোনো বাধাই আন্দোলনকারীদের আটকে রাখতে পারেনি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর স্থাপন করা সমস্ত প্রতিবন্ধকতা ভেঙে সাধারণ মানুষ শাহবাগ চত্বরে শক্ত অবস্থান গ্রহণ করেন। চারদিক প্রকম্পিত হতে থাকে সরকার পতনের এক দফার স্লোগানে।

 

বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীসহ পার্শ্ববর্তী জেলা গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ থেকে লাখো মানুষ এসে এই গণসমুদ্রে যুক্ত হন। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শাহবাগ ও এর আশপাশের রাজপথ এক বিশাল জনসমুদ্রে পরিণত হয়।

 

ঠিক এমন একটি শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে খবর ছড়িয়ে পড়ে যে, সেনাপ্রধান জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন। এর কিছুক্ষণ পরই দাবানলের মতো খবর ছড়িয়ে পড়ে যে, ছাত্র-জনতার তুমুল আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে চলে গেছেন।

 

এই খবর নিশ্চিত হওয়ার পর পরই শাহবাগসহ পুরো দেশ আনন্দে ফেটে পড়ে। কেউ বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসে কাঁদছিলেন, কেউ সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে রাস্তায় সিজদায় লুটিয়ে পড়েন, আবার কেউ একে অপরকে জড়িয়ে ধরে বিজয়ের আনন্দ ভাগাভাগি করছিলেন।

 

অনেক সাধারণ মানুষকে আনন্দে সেনাসদস্যদের সঙ্গে করমর্দন ও আলিঙ্গন করতেও দেখা যায়। পরবর্তীতে যোগাযোগ ব্যবস্থা স্বাভাবিক হলে এই বিজয়ের বার্তা সারা দেশে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বিজয়ের উল্লাসে মত্ত হাজার হাজার মানুষ এরপর গণভবনের দিকে আনন্দমিছিল নিয়ে ছুটে যান।

 

শাহবাগ থেকে শুরু করে কাকরাইল, মৎস্য ভবন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে। দিনভর কঠোর সান্ধ্য আইন, বন্দুকের নল, যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সর্বোচ্চ প্রহরার মধ্যেও ৫ আগস্ট রাজপথে সাধারণ মানুষের যে অভূতপূর্ব গণজাগরণ তৈরি হয়েছিল, তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় মাইলফলক হয়ে থাকবে।