বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সেগুনবাগিচায় অবস্থিত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে এ কথা সুস্পষ্টভাবে জানিয়েছেন বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।
বহুপাক্ষিক এই আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক জোটে বাংলাদেশের উচ্চপর্যায়ের উপস্থিতি এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি নিয়ে দেশি ও বিদেশি কূটনৈতিক মহলে যে ব্যাপক আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছে, প্রতিমন্ত্রীর এই আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তার একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা ও সরকারের বর্তমান অবস্থান পরিষ্কারভাবে ফুটে উঠেছে।
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যকার আঞ্চলিক অর্থনৈতিক, সামাজিক ও কারিগরি সহযোগিতার অন্যতম বৃহৎ জোট ‘বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টি-সেক্টোরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কোঅপারেশন’ বা সংক্ষেপে বিমসটেক-এর বর্তমান সভাপতির দায়িত্ব অত্যন্ত নিষ্ঠা ও সফলতার সঙ্গে পালন করছে বাংলাদেশ।
সেই মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান থেকে বিমসটেকের বর্তমান সুযোগ্য সভাপতি হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন ব্রিকস সম্মেলনে যোগদানের বিষয়টি আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতে এবং আঞ্চলিক কূটনীতিতে বিশেষ মাত্রায় গুরুত্ব বহন করছে।
ব্রিকস মূলত ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন এবং দক্ষিণ আফ্রিকার মতো অগ্রসরমাণ অর্থনীতির দেশগুলোর সমন্বয়ে গঠিত একটি অত্যন্ত শক্তিশালী বৈশ্বিক জোট, যেখানে বিশ্বের অর্থনৈতিক পরাশক্তিগুলো তাদের ভবিষ্যৎ রূপরেখা, উন্নয়ন কৌশল এবং পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো নির্ধারণ করে থাকে।
বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবেই এ ধরনের উন্নয়নমুখী, সমতাভিত্তিক ও বহুপাক্ষিক আন্তর্জাতিক মঞ্চে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে সর্বদাই গভীর আগ্রহ প্রকাশ করে এসেছে। এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শীর্ষ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য অংশগ্রহণের বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে বিমসটেকের মতো সুবিশাল ও সম্ভাবনাময় একটি আঞ্চলিক জোটের নেতৃত্ব প্রদান করছে।
পাশাপাশি, বর্তমান পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে ব্রিকস একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী বহুপাক্ষিক সংস্থা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে, যার ভবিষ্যৎ কার্যক্রমে ও উন্নয়ন যাত্রায় সম্পৃক্ত হতে বাংলাদেশ স্বভাবতই প্রবলভাবে আগ্রহী।
তবে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, সরকারপ্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর দেশ পরিচালনায় অসংখ্য রাষ্ট্রীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা রয়েছে। তাই ভারতের এই সম্মানজনক আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে তিনি আগামী সেপ্টেম্বরে সেখানে সশরীরে উপস্থিত থাকতে পারবেন কি না, তা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করছে তাঁর নিজস্ব প্রাত্যহিক সময়সূচি এবং অন্যান্য রাষ্ট্রীয় জরুরি ব্যস্ততার ওপর।
প্রতিমন্ত্রী অত্যন্ত পেশাদারত্বের সঙ্গে এবং কূটনৈতিক শিষ্টাচার বজায় রেখে উল্লেখ করেন যে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর নিজের সময় ও সুযোগ সার্বিকভাবে বিবেচনা করে নিজেই এই বহুল কাঙ্ক্ষিত সফরের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন।
সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হওয়ার পর সেটি যথাসময়ে যথাযথ প্রক্রিয়ায় আনুষ্ঠানিকভাবে দেশবাসীকে ও আন্তর্জাতিক মহলকে অবহিত করা হবে। কূটনৈতিক অঙ্গনে এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতে বিগত বেশ কিছুদিন ধরেই এই আলোচনা জোরদারভাবে চলছিল যে, নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিতব্য ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের ‘আউটরিচ’ বা সম্প্রসারিত পর্বে অংশগ্রহণের জন্য বাংলাদেশের সরকারপ্রধানকে স্বাগতিক দেশ ভারতের পক্ষ থেকে অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
এই বহুপাক্ষিক সম্মেলনের পাশাপাশি, দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত বন্ধু ও প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে দুই দেশের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ দ্বিপাক্ষিক সফরের আমন্ত্রণও বেশ কিছুদিন ধরে শীর্ষ পর্যায়ের বিবেচনায় রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে যখন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর কাছে সুনির্দিষ্টভাবে জানতে চাওয়া হয় যে, ভারতের দিক থেকে আসা এই উভয় আমন্ত্রণ-অর্থাৎ বহুপাক্ষিক ব্রিকস সম্মেলনে যোগদান এবং সম্ভাব্য দ্বিপাক্ষিক রাষ্ট্রীয় সফর-এখনো বহাল রয়েছে কি না, তার জবাবে শামা ওবায়েদ ইসলাম অত্যন্ত ইতিবাচক ও সাবলীল ভাষায় নিশ্চিত করেন যে, ভারত সরকারের দেওয়া আমন্ত্রণের বিষয়টি অবশ্যই এখনো কার্যকর রয়েছে।
তবে এই জোড়া আমন্ত্রণের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকার ঠিক কোন ধরনের কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করবে এবং সফরের ব্যাপ্তি কতটুকু হবে, তা চূড়ান্তভাবে রাষ্ট্রের শীর্ষ নেতৃত্বের বিচক্ষণ সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভরশীল।
আন্তর্জাতিক স্বনামধন্য সংবাদ সংস্থা ও প্রবীণ কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আগামী সেপ্টেম্বরে ভারতের মাটিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনটি সমগ্র এশিয়া তো বটেই, এমনকি বৈশ্বিক অর্থনীতির একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ হিসেবে সর্বমহলে বিবেচিত হচ্ছে।
এই সম্মেলনের সম্প্রসারিত পর্বে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য আঞ্চলিক প্রভাবশালী দেশগুলোকে আমন্ত্রণ জানানোর মাধ্যমে মূলত জোটের পরিধি ও প্রভাব বিস্তারের একটি সুদূরপ্রসারী কৌশলগত রূপরেখা প্রতিফলিত হয়।
ঠিক সেই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের মতো একটি দ্রুত বর্ধনশীল ও সম্ভাবনাময় অর্থনীতির দেশের শীর্ষ নেতার এই সম্মেলনে সশরীরে উপস্থিতি দুই প্রতিবেশী দেশের পারস্পরিক আস্থার সম্পর্ক এবং সামগ্রিক আঞ্চলিক ভূরাজনীতির জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও সুদূরপ্রসারী ফলাফল বয়ে আনতে পারে।
তবে শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি, রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক ব্যস্ততা এবং সর্বোপরি কূটনৈতিক অগ্রাধিকারের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণের ভিত্তিতেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সফরের বিষয়ে তাঁর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন। আপাতত বাংলাদেশ সরকারের সেই কাঙ্ক্ষিত আনুষ্ঠানিক ঘোষণার দিকেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ও নিবিড় পর্যবেক্ষণ রাখছে দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যম, বিশ্লেষক এবং বৈশ্বিক কূটনৈতিক বলয়।