বিগত সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বের সাম্প্রতিক ভূমিকা এবং রাজনৈতিক তৎপরতার কঠোর সমালোচনা করে তিনি এই মন্তব্য করেন। শুক্রবার দুপুরে কক্সবাজারের একটি চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় ও হাসপাতালের নতুন একটি ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে দেশের সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং উন্নয়নমূলক নানা দিক নিয়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন।
বিগত সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ইঙ্গিত করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রাজনৈতিক অঙ্গনে তাঁর কোনো শারীরিক উপস্থিতি নেই, কেবল মাঝে মাঝে কিছু শব্দ বা আওয়াজ শোনা যায়। মূলত এসবের মাধ্যমে দেশে নতুন করে কোনো ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা যায় কি না, সেই অপচেষ্টাই চালানো হচ্ছে।
তবে দেশের সচেতন নাগরিকরা তাদের এই ষড়যন্ত্রমূলক রাজনীতি আর কখনোই মেনে নেবে না বলে তিনি সুস্পষ্টভাবে আশ্বস্ত করেন। এই আনুষ্ঠানিকতার পূর্বে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে গৃহীত একটি নবনির্মিত আবাসন প্রকল্পের শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করেন।
দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের এই উপকূলীয় জেলার সার্বিক উন্নয়ন এবং জাতীয় অর্থনীতিতে এর অপরিসীম গুরুত্বের কথা তুলে ধরে তিনি তাঁর বক্তব্যে সামুদ্রিক অর্থনীতি বা নীল অর্থনীতির ওপর বিশেষ জোর দেন।
তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ সমুদ্রসম্পদ এবং সমুদ্রবন্দরগুলোকে যদি সঠিক ও পরিকল্পিত উপায়ে কাজে লাগানো যায়, তবে তা দেশের জন্য বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয়ের একটি অন্যতম প্রধান উৎসে পরিণত হবে।
বর্তমান সরকার এই বিশাল সামুদ্রিক সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে বহুমুখী ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে সামনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে বলেও তিনি উপস্থিত সবাইকে অবহিত করেন।
দেশের পর্যটন খাতের টেকসই বিকাশ এবং পরিবেশ সংরক্ষণের সুনির্দিষ্ট ভারসাম্য বজায় রাখার বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিগত স্বৈরাচারী সরকারের গৃহীত কিছু অদূরদর্শী নীতির কড়া সমালোচনা করেন।
তিনি জানান, পূর্ববর্তী সরকারের শাসনামলে কোনো ধরনের যথাযথ বৈজ্ঞানিক বা পরিবেশগত গবেষণা ছাড়াই নিজেদের রাজনৈতিক ও ব্যক্তিস্বার্থে ইচ্ছেমতো বিভিন্ন এলাকাকে প্রতিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল।
এর ফলে পর্যটন শিল্পের স্বাভাবিক বিকাশ দারুণভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তাই বর্তমান সরকার এসব এলাকা নতুন করে জরিপ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আধুনিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক জরিপকার্য পরিচালনার মাধ্যমে পর্যটনের সুস্থ বিকাশের স্বার্থে এসব এলাকার বিষয়ে পূর্বের সিদ্ধান্তগুলো পুনর্বিবেচনা করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ইতোমধ্যে সুস্পষ্ট নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।
পর্যটন শিল্পকে কীভাবে আরও আধুনিক ও বিশ্বমানের করা যায়, সে বিষয়ে দিকনির্দেশনা দিয়ে মন্ত্রী বলেন, প্রকৃতি ও পরিবেশকে সম্পূর্ণভাবে সংরক্ষণ করেই পর্যটন খাতের উন্নয়নের জন্য যাবতীয় পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। যত্রতত্র কেবল সুউচ্চ কংক্রিটের ইমারত নির্মাণ করলেই সেটিকে প্রকৃত পর্যটন বলা যায় না।
কক্সবাজারের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতের সৌন্দর্য রক্ষার্থে সৈকতসংলগ্ন সব এলাকাজুড়েই পরিকল্পিত ও পরিবেশবান্ধব পর্যটনকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে হবে। এই এলাকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে বিশ্বদরবারে এমনভাবে তুলে ধরতে হবে, যাতে সারা বিশ্বের ভ্রমণপিপাসু মানুষ এখানে ছুটে আসতে ব্যাপকভাবে আকৃষ্ট হয়।
তাই শুধু বিশাল অবকাঠামো নির্মাণের দিকে মনোযোগ না দিয়ে, বরং পরিবেশগত ভারসাম্য নিশ্চিত করে কীভাবে টেকসই পর্যটনের সম্প্রসারণ করা যায়, সেদিকেই সরকারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করতে হবে।
কক্সবাজারের ভৌগোলিক অবস্থান এবং সামুদ্রিক সম্পদের প্রাচুর্যের কথা বিবেচনায় রেখে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রেও যুগান্তকারী উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন, কক্সবাজারকে ঘিরে সামুদ্রিক গবেষণার সুযোগ আরও সম্প্রসারিত করার লক্ষ্যে সরকার এখানে একটি পূর্ণাঙ্গ সামুদ্রিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার নীতিগত পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
সরকারের এই সময়োপযোগী উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে সামুদ্রিক বিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষা, উন্নত স্তরের গবেষণা এবং সমুদ্র অর্থনীতি পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ক্ষেত্রে দেশে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় অর্থনীতিকে স্বাবলম্বী ও আরও শক্তিশালী করে তুলবে।
কক্সবাজার চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় ও হাসপাতালে আয়োজিত পাঁচশো শয্যাবিশিষ্ট নতুন ভবনের এই ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পাশাপাশি আরও উপস্থিত ছিলেন উখিয়া-টেকনাফ আসনের সংসদ সদস্য শাহাজাহান চৌধুরী, মহেশখালী-কুতুবদিয়া আসনের সংসদ সদস্য আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ এবং সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য শামীম আরা স্বপ্না প্রমুখ।
এছাড়াও স্থানীয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এই অনুষ্ঠানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন। উল্লেখ্য, দুই দিনের এক সরকারি সফরে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কক্সবাজারে এসে পৌঁছান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। শুক্রবার দিনব্যাপী বিভিন্ন সরকারি ও উন্নয়নমূলক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের পর এদিন সন্ধ্যায় আকাশপথে তাঁর পুনরায় রাজধানী ঢাকায় ফিরে যাওয়ার কথা রয়েছে।